গ্যালারি ওল্ডহ্যামে বাংলাদেশী শিল্পীদের সংগ্রহ
২০০০ সালের শুরু থেকে যুক্তরাজ্যের গ্যালারি ওল্ডহ্যাম বাংলাদেশী শিল্পীদের শিল্পকর্ম সংগ্রহ করে আসছে। এ উদ্যোগের পেছনে রয়েছে ওল্ডহ্যাম শহরের সঙ্গে বাংলাদেশের গভীর সাংস্কৃতিক ও অভিবাসী সম্পর্কের স্বীকৃতি।
এ সংগ্রহে স্থান পেয়েছেন বাংলাদেশের ছয়জন বিশিষ্ট শিল্পী—কনকচাঁপা চাকমা (জন্ম ১৯৬৩), আতিয়া ইসলাম এ্যানি (জন্ম ১৯৬২), আব্দুস শাকুর শাহ (জন্ম ১৯৪৬), ফারেহা জেবা (জন্ম ১৯৬১), শিশির ভট্টাচার্য (জন্ম ১৯৬০) ও ফারুক আহমেদ (জন্ম ১৯৬৭)।
তাদের শিল্পকর্মে উঠে এসেছে আত্মপরিচয়, নারীর অভিজ্ঞতা, লোককাহিনী এবং অভিবাসীজীবনের নানা স্তর। এ সংগ্রহ শুধু শিল্প নয়; এটি একটি সাংস্কৃতিক সংলাপ, যা বাংলাদেশী অভিজ্ঞতাকে যুক্তরাজ্যের শিল্পজগতে তুলে ধরেছে। মর্যাদাপূর্ণ এ গ্যালারিতে জায়গা করে নেয়া শিল্পীদের মধ্যে বাংলাদেশের প্রথিতযশা দুজন চিত্রকর—শিল্পী আব্দুস শাকুর শাহ ও শিল্পী আতিয়া ইসলাম এ্যানির ‘গ্যালারি ওল্ডহ্যাম’- এর অভিজ্ঞতার গল্প ‘নভেরা’র আয়োজনে থাকছে।

আব্দুস শাকুর শাহ
২০০২ সালে ইংল্যান্ডের ম্যানচেস্টার শহর যখন কমনওয়েলথ গেমসের আয়োজক, তখন শহরের চারটি গ্যালারিতে চারটি দেশের শিল্পীদের কাজ প্রদর্শিত হয়। এর মধ্যে গ্যালারি ওল্ডহ্যাম এক অনন্য উদ্যোগ নেয়—বাংলাদেশী শিল্পীদের কাজ সংগ্রহের পর প্রদর্শনীর আয়োজন করে। এ সংগ্রহের উদ্দেশ্য ছিল লন্ডনের বাঙালি কমিউনিটিকে তাদের শেকড়ের শিল্পচর্চা, ঐতিহ্য ও ইতিহাসের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়া।
শিল্পী জানান, ২০০২ সালের সেই সময়টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সৈয়দ মঞ্জুরুল ইসলামের কিউরেশনে বাংলাদেশে একটি প্রদর্শনী হয়। সেখানে ২২ জন শিল্পীর কাজ প্রদর্শিত হয়। সে সময়েই গ্যালারি ওল্ডহ্যামের কিউরেটর বাংলাদেশে এসে প্রায় ৫০টি ছবি সংগ্রহ করেন। এগুলোর মধ্যে ৪০টির মতো ছবিই এ প্রদর্শনী থেকে নেয়া হয়। শাকুর শাহ বলেন, ‘ওরা বলেছিল, লন্ডনের বাঙালি কমিউনিটির জন্য শিক্ষামূলক কিছু করার জন্যই এ সংগ্রহ। যেন তারা নিজের দেশের শিল্পীদের কাজ দেখে, নিজের দেশের ইতিহাস-ঐতিহ্য বুঝতে পারে।’

শাকুর শাহর কাজের মধ্যে যে লোকজ গল্প, রঙের ছন্দ ও ঐতিহ্যের আবহ আছে তা শুধু শিল্প নয়, একধরনের সাংস্কৃতিক দলিল। তার ‘মহুয়া’ সিরিজ, ‘বাংলাদেশি নারী-পুরুষ’ সিরিজ—সবই এ সংগ্রহে জায়গা পেয়েছে।
শিল্পী বলেন, ‘তারা আমার মৈমনসিংহ গীতিকা সিরিজের ছবি নিয়েছে দেশের ‘‘লোকজ ঐতিহ্য’’কে তুলে ধরতে।’
শুধু এ প্রদর্শনী নয়, পরবর্তীকালে তার একটি একক প্রদর্শনীও হয় ইংল্যান্ডে। যদিও সালটা তার স্পষ্ট মনে নেই। তবে তিনি বলেন, ‘এখনো ওদের ওয়েবসাইটে গেলে আমার ছবিগুলো দেখা যায়। এটা আমার কাজের জন্য একধরনের ঐতিহাসিক স্বীকৃতি।’
আতিয়া ইসলাম এ্যানি
গ্যালারি ওল্ডহ্যামে থাকা তার দুটি ছবি হলো ‘ইনসুলিন’ ও ‘ক্যান্সার’। দুটি ছবিই তার ক্যারিয়ারের একদম শুরুর দিকে আঁকা। তখন এ ছবিগুলোর প্রদর্শনী হয়েছিল ব্রিটিশ কাউন্সিলের সহযোগিতায়।

শিল্পীর নিজের কথায়, ‘ওল্ডহ্যামে আমার ছবি যাবার আগেই প্রাথমিক পর্যায়ের প্রদর্শনীগুলো ব্রিটিশ কাউন্সিলেই হয়। এমনকি এটাকে আমার জীবনেরও একদম শুরুর দিকের এক্সিবিশন বলা যায়। তো সেখানে ওদের (গ্যালারি ওল্ডহ্যাম) একটা কমিটি এসেছিল। আমি জানি না এর পেছনে কোনো সিনিয়র শিল্পী, চিত্র-সমালোচকের রেকমেন্ডেশন বা আমন্ত্রণ ছিল কিনা! হয়তো থাকারই কথা; ফলত সেই কমিটির সদস্যেরা বেশ কিছু আর্টিস্টের স্টুডিওতে গিয়েছিল। বিশেষ করে যে বাংলাদেশীরা সে সময়ে কনটেম্পোরারি আর্ট নিয়ে কাজ করছিল তাদের স্টুডিওগুলোতেই ওনারা যান। আমার সাথেও এভাবেই যোগাযোগ হয়।’
এ সময়ের অভিজ্ঞতা নিয়ে তিনি আরো বলেন, ‘এর মাঝে আমার সঙ্গে টেলিফোনে যোগাযোগ হয়। আমার চারটা বা পাঁচটা কাজ ছিল, যেটা দেখতে তারা স্টুডিওতে আসে। ওনাদের উদ্যোগেই তখন ‘‘শিকড় ও ফুল’’ বলে দেশেই একটা প্রদর্শনী হয়। এরপরে সেখান থেকে দুটো কাজ ‘‘ইনসুলিন’’ ও ‘‘ক্যান্সার’’ ওরা একদম কিনে নিয়ে যায় ওদের ওল্ডহ্যাম গ্যালারিতে প্রদর্শন করার জন্য।’
যখন ওখানে প্রদর্শনীটি চলছিল তখন এ শিল্পী সশরীরে উপস্থিত থাকতে না পারলেও অনেকের কাছ থেকে সে গল্প শুনেছেন, এমনকি প্রশংসাও পেয়েছেন।
শিল্পীর নিজের কথায়, ‘ক্যারিয়ারের একদম শুরুর দিকে যখন এমন মর্যাদাপূর্ণ প্লাটফর্মে স্থায়ী জায়গা পাই, সেটা একটা আলাদা গর্বেরই বিষয়; যা একই সাথে উৎসাহের বিষয়ও ছিল। কেননা শুধু ছবিবোদ্ধা বা আর্টে মনোযোগী দর্শক শ্রেণী-সমালোচক, বড় বড় শিল্পীর পাশাপাশি তখন এটা সাধারণ জনগণের মধ্যে পৌঁছায়।’

শিল্পীর মতে, যখন কোনো আর্টিস্টের বক্তব্য বা স্টাইল সবকিছুর মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয় যে কাজগুলো মানুষকে প্রভাবিত করছে তখনই শিল্পীসত্তার সার্থকতা আসে। এর মাধ্যমে প্রতীয়মান হয় যে ‘কাজগুলো আর তাহলে আমার একার নয়, অনেকেরই অনুভূতির প্রকাশ।’
আতিয়া ইসলাম এ্যানির প্রাথমিক কাজগুলো ছিল নব্বই দশকে। তখন দেশে সবে দীর্ঘ সামরিক শাসনের জাঁতাকল ভেঙেছে, আর এর মধ্যেই সমাজ, রাজনীতিতে আসছে নানা ধরনের পরিবর্তন। সে সময় নারী পিছিয়ে পড়ছিল। সে কারণে নারীকে কেন্দ্রে রেখে চিত্রকর্ম তৈরি করেন আতিয়া। তবে ক্যারিয়ারের শুরুতে ‘নারীকেন্দ্রিক’ চিত্রকর্ম করলেও পরবর্তীকালে তিনি অন্য ধারায়ও কিছু কাজ করেছেন।
গ্যালারি ওল্ডহ্যামে দেশী-বিদেশী নানা শিল্পী ও শিল্পকর্ম কিউরেশনের এ উদ্যোগই প্রমাণ করে, শিল্পের কোনো ভাষা নেই, শিল্পীর স্থান সীমান্ত মেনে হয় না। আর তাই বাংলাদেশী শিল্প এখন শুধু ঢাকায় নয়, জায়গা করে নিচ্ছে আন্তর্জাতিক প্রদর্শনীতে।










