(গত সংখ্যার পর)

এসএম সুলতান বাংলার সাধারণ মানুষকে অসাধারণ করে তুলে ধরেছিলেন তার চিত্রকর্মে। পেশিবহুল কৃষক ও খেতেখামারে কাজ করা মানুষকে তিনি দেখেছিলেন নিজের দর্শনে এবং সেভাবেই প্রকাশ করেছেন। কিন্তু তার এ দর্শন তৈরি হওয়ার পেছনে কাজ করেছে দীর্ঘ ভ্রমণ। মূলত তার ভ্রমণ ও কোল্ড ওয়ারের সময়কার পরিস্থিতি তার চিত্রকর্মে প্রভাব পড়েছিল। তবে এক্ষেত্রে সুলতানের নড়াইলবাস ও ভ্রমণ থেকে ফিরে এসে গ্রামে জীবনযাপনও প্রভাব রেখেছিল।

মার্কিন সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের সহায়তায় পঞ্চাশের দশকে সুলতান যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ ভ্রমণ করেছিলেন। সেটি শেষ করে দ্রুতই তিনি চলে আসেন তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের গ্রামে। পঞ্চাশের দশকের মধ্যভাগ থেকে শুরু করে ১৯৯৪ সালে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি গ্রামেই বসবাস করেছেন। সেখানে বসেই কাজ করেছেন। সুলতানের চিত্রকর্ম দেখলেই বোঝা যায় গ্রাম ও গ্রামের মানুষকে চিত্রকর্মে উপস্থাপন করার ক্ষেত্রে নিজের সঙ্গেই নিজের প্রতিজ্ঞা ছিল তার। সুলতান নিজেও এ কথা বলেছেন।

সুলতানের কাজ নিয়ে—বিশেষত তার কাজের সঙ্গে মডার্নিজমের সম্পর্ক—আলোচনা হলে তার এ আন্তর্জাতিক ভ্রমণকে প্রায়ই গুরুত্ব দিয়ে উপস্থাপন করা হয়। এ সময় লন্ডনে তার চিত্রকর্মের প্রদর্শনীও হয়েছিল। এ ভ্রমণকে তার একান্ত ‘বাংলাদেশী’ ধারণার সঙ্গে ভারসাম্য রচনার একটি উপায় হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে, যাতে তাকে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত আধুনিক শিল্পীদের সমকক্ষ মর্যাদা দেয়া যায়।

১৯৪৭ সালে ব্রিটিশদের কাছ থেকে স্বাধীনতা পাওয়ার পর সুলতানের প্রথম চিত্রকর্ম প্রদর্শনী থেকে আরম্ভ করে সুলতানের যাত্রা নিয়ে আলাপ করা হলে ১৯৫০ সালের এ কালপর্ব তার রূপান্তরের সময় বলে মনে করা হয়। রূপান্তরটি ছিল মূলত চিত্রভিত্তিক কাজ—বিশেষ করে প্রকৃতিচিত্র—থেকে তার তথাকথিত বিমূর্ত শিল্পে পদার্পণের দিকে।

15

১৯৫০-এর দশকে সুলতানের বিকাশের বিশ্লেষণে এ রূপান্তরের মানচিত্র আঁকা যায়। ১৯৫২ সালে সৈয়দ আমজাদ আলী লেখেন, ‘পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর থেকে তিনি [সুলতান] মূলত বাংলা ও কাশ্মীরের দৃশ্যপট এঁকেই সময় কাটাচ্ছেন।’

‘আদম সুরত’ সিরিজের একটি ছবির ওপর ভিত্তি করে ১৯৫৪ সালের মে মাসে দ্য স্টুডিও পত্রিকায় জালাল উদ্দিন আহমদ লেখেন: ‘এস. এম. সুলতান... এখন মনে হচ্ছে পুরোপুরি বিমূর্ত শিল্পে চলে গেছেন।’

১৯৫৮ সালে জালাল উদ্দিন আহমদ তার Contemporary Painters of Pakistan গ্রন্থে সুলতানকে নিয়ে মাত্র একটি সংক্ষিপ্ত অনুচ্ছেদ লেখেন এবং উল্লেখ করেন: ‘তিনি এখন যশোর জেলার একটি ছোট গ্রামে নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছেন...যুক্তরাষ্ট্র থেকে ফেরার পর তিনি আর কোনো প্রদর্শনীতে অংশ নেননি, এবং তাঁর সাম্প্রতিক কাজ এখনো প্রকাশ পায়নি।’

এরপর সুলতান মূলত পাকিস্তানি শিল্পের কথন থেকে বিলীন হয়ে যান। পরে ১৯৭০-এর দশকে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সুলতান আবার একজন প্রধান শিল্পী হিসেবে আবির্ভূত হন এবং জয়নুল আবেদিনের মতো তিনিও আত্মপ্রকাশ করেন একজন স্বতন্ত্র বাংলাদেশী শিল্পী হিসেবে; যিনি দেশের মাটি, মানুষ ও সংস্কৃতির প্রতি গভীরভাবে অঙ্গীকারবদ্ধ, যা প্রতিফলিত হয় তার চিত্রভিত্তিক তৈলচিত্রে।

মূলত ভারত ভাগ হয়ে পাকিস্তানের সৃষ্টি এবং যশোরে গিয়ে থিতু হওয়া সুলতানের মধ্যবর্তী সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ ভ্রমণকে গুরুত্ব দিয়ে দেখেন শিল্প সমালোচকরা। তারা মনে করেন, এ সময়েই সুলতান তার অঙ্কন পদ্ধতি ও স্টাইল পরিবর্তন করেন। কেননা এ ভ্রমণের মধ্য দিয়েই তিনি আন্তর্জাতিক নানা চিত্রকর্ম ও ধারার সঙ্গে পরিচিত হন। ফলে নিজের কাজের সঙ্গে তিনি এসবের তুলনা করেছিলেন এবং নিজের কাজে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন এনেছিলেন।

জয়নুল আবেদিনের ভ্রমণ নিয়ে যে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায় সুলতান সম্পর্কে ততটা নেই। কেননা সুলতান যখন যুক্তরাষ্ট্রে যান, তখন তিনি একজন প্রতিষ্ঠিত শিল্পী ছিলেন না।

catalogue

১৯৫২ সালের জানুয়ারিতে সৈয়দ আমজাদ আলী তাকে ‘পূর্ব বাংলার এক তরুণ শিল্পী’ হিসেবে বর্ণনা করেন, যিনি ‘আন্তর্জাতিক শিক্ষা বিনিময় কর্মসূচির আওতায় আমেরিকা সফরে’ রয়েছেন। সে বছর ‘ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল এডুকেশন (IIE) এক প্রকল্প পরিচালনা করে, যার উদ্দেশ্য ছিল বিদেশী তরুণ শিল্পীদের যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে আসা। প্রকল্পটি ফোর্ড ও রকফেলার ফাউন্ডেশনের সহায়তায় পরিচালিত হয়।’

এ সফরের সময় সুলতান নিউইয়র্ক ও অ্যান আরবার পরিদর্শন করেন। তিনি ভারমন্টেও কয়েক সপ্তাহ কাটান। সুলতানের লন্ডন পর্বটি কৌতূহলজাগানিয়া। ভ্রমণ ও অবস্থান পূর্বনির্ধারিত বা পরিকল্পিত ছিল না। কিন্তু পরবর্তীকালে এটি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হয়েছে। ঢাকার গ্যেটে ইনস্টিটিউটে ১৯৮৭ সালে অনুষ্ঠিত তার শিল্পকর্মের একটি প্রদর্শনীর সহপ্রকাশনায় উল্লেখ করা হয়েছে, লন্ডনে চারটি প্রদর্শনীতে তার চিত্রকর্মগুলো প্রদর্শিত হয়েছিল আধুনিক শিল্পের মহান মাস্টারদের—পিকাসো, দালি, ব্রাক, ক্লি—সঙ্গে।

এসএম সুলতানকে নিয়ে তারেক মাসুদ ১৯৮৯ সালে একটি প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণ করেন। এর সঙ্গে প্রামাণ্যচিত্রের একটি সহপ্রকাশনা রয়েছে। সৈয়দ মুনীরুল ইসলামের সম্পাদনায় আসা এ পুস্তিকায় সুলতানের প্রদর্শনীগুলোর তালিকা আছে। এতে দেখা যায় ১৯৫০ সালে লন্ডনের ভিক্টোরিয়া এমব্যাংকমেন্ট, হ্যাম্পস্টেডে একটি প্রদর্শনী হয়েছিল। এটি ছিল সে সময়কার শিল্পীদের একটি সম্মিলিত প্রদর্শনী। তাদের মধ্যে সবচেয়ে খ্যাতিমান ছিলেন পাবলো পিকাসো, সালভাদর দালি, জর্জ ব্রাক ও পল ক্লি।

একইভাবে ২০১৫ সালের আর্ট নিউজের ‘টপ টু হানড্রেড কালেক্টরস’ তালিকায় প্রভাবশালী বাংলাদেশী সংগ্রাহক নাদিয়া ও রাজীব সামদানীর নাম রয়েছে। সেখানে ‘ফান ফ্যাক্ট’ শিরোনামে উল্লেখ করা হয়েছে, ‘নাদিয়া সামদানী প্রথম যে শিল্পকর্ম সংগ্রহ করেন তা ছিল একজন বোহেমিয়ান বাংলাদেশী আধুনিকতাবাদী, এসএম সুলতানের জলরঙের চিত্রকর্ম। তিনিই একমাত্র বাংলাদেশী শিল্পী যিনি ১৯৫০ সালে লন্ডনের ভিক্টোরিয়া এমব্যাংকমেন্ট গার্ডেনস, হ্যাম্পস্টেডে পিকাসো, দালি ও ব্র্যাকের সঙ্গে একসঙ্গে প্রদর্শনীতে অংশ নেন।’

তবে সুলতানের প্রদর্শনী নিয়ে কিছু ভুল ধারণা আছে। ১৯৫২ সালের আগে সুলতান যুক্তরাজ্যে যাননি বলেই মনে হয়। অন্যদিকে হ্যাম্পস্টেড ও ভিক্টোরিয়া এমব্যাংকমেন্ট দুটো আলাদা জায়গা। এ দুই স্থানে প্রদর্শনীর কোনো শক্ত প্রমাণ মেলে না বা সে সময়ের মাস্টাররা অংশ নিয়েছিলেন এমন প্রমাণও মেলে না। তবে হাসনাত আব্দুল হাইয়ের লেখা থেকে এ ধারণা তৈরি হয়ে থাকতে পারে। তিনি ‘সুলতান’ বইয়ে লিখেছেন, হ্যাম্পস্টেড ও ভিক্টোরিয়া এমব্যাংকমেন্টে সানডে আর্টিস্টদের সঙ্গে তার চিত্রকর্ম প্রদর্শিত হয়।

তবে এ দুটি স্থান আসলে আলাদা। একটি এমব্যাংকমেন্ট গার্ডেনস এবং অন্যটি হ্যাম্পস্টেড। তবে উভয়ই একধরনের প্রদর্শনী পরিচালনা করত: একটি অনানুষ্ঠানিক, ‘যার যা খুশি’ ধরনের উন্মুক্ত প্রদর্শনী, যেখানে অংশ নিতেন তথাকথিত ‘সানডে আর্টিস্ট’রা—যারা চিত্রাঙ্কন করতেন শখের বশে অথবা পুরোপুরি বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে। হ্যাম্পস্টেডে হ্যাম্পস্টেড আর্টিস্ট কাউন্সিল প্রতি সপ্তাহান্তে এ ধরনের প্রদর্শনীর আয়োজন করত, যেখানে যেকোনো ব্যক্তি এসে তার চিত্রকর্ম প্রদর্শন করতে পারতেন।

তবে লোটে হোয়েক একটি সূত্র পেয়েছেন। লিস্টার গ্যালারির ক্যাটালগে দেখা যায়, ১৯৫২ সালের আর্টিস্টস অব ফেম অ্যান্ড প্রমিসেজ পার্ট ওয়ানে অংশ নিয়েছিলেন এসএম সুলতান। এটি মূলত লিস্টার গ্যালারির গ্রীষ্মকালীন প্রদর্শনী। এতে চিত্রকর্ম, ভাস্কর্য, স্কেচ নিয়ে শিল্পীরা অংশ নিতেন। মূলত বিশ শতকের প্রতিশ্রুতিশীল শিল্পীদের কাজ প্রদর্শনের সুযোগ দিত তারা। দালি বা ক্লির সঙ্গে প্রদর্শনীতে অংশ না নিলেও সুলতান তার ভ্রমণের মধ্য দিয়ে তাদের কাজ দেখেছিলেন এবং যুক্ত হয়েছিলেন সমসাময়িক আধুনিক চিন্তার সঙ্গে।

মূলত জয়নুল আবেদিন ও এসএম সুলতান উভয়েই তাদের যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ ভ্রমণের মধ্য দিয়ে লক্ষ করেছিলেন মডার্নিস্টদের কাজ। সেই সঙ্গে তাদের চিন্তার সঙ্গেও যুক্ত হয়েছিলেন। তারা এ সময়ের মধ্যে বুঝেছিলেন আধুনিক মাস্টারদের পাশাপাশি তাদের নিজেদের কাজের ধারা কী হওয়া উচিত। সেই যাত্রায় নিজেরা ঠিক করে নিয়েছিলেন নিজেদের পথ। জয়নুল আবেদিন ও এসএম সুলতান দেশে ফিরে এসে দেশের মানুষকে নিয়েই কাজ শুরু করেন। তারা নিজেদের স্বতন্ত্র স্টাইল তৈরি করেছিলেন।

[লোটে হোয়েক ও সংযুক্তা সুন্দরেসনের গবেষণাপত্র Journeying through Modernism: Travels and Transits of East Pakistani Artists in Post-Imperial London অবলম্বনে রচিত]

(সমাপ্ত)