এ প্রসঙ্গে কথা বলার আগে একটি প্রশ্নের উত্তর দেয়া আবশ্যক—কী থেকে মুক্তি? দুঃখ থেকে মুক্তি। আর মুক্তির জন্য প্রয়োজন ছিল জীবনের সমুদয় যাতনার কারণ অনুসন্ধান। অনুসন্ধানে বেরিয়ে অনেকে আখ্যায়িত হয়েছেন দার্শনিক হিসেবে, কেউবা সমাজবিজ্ঞানী। কালক্রমে তাদের জীবনদর্শন পাঠ্য, তত্ত্ব আকারে রূপ নিয়েছে। একজনের পথচলা ও উপলব্ধি রূপ নিয়েছে মানবধর্মে। এ ধর্ম কোনো ধর্মীয় আচার-আচরণ ঘিরে না। এ ধর্ম জ্ঞান, উপলব্ধি ও চর্চার প্রতি বিশ্বাস। এ ধর্ম মানবমনের যাপন, যা দুঃখ নির্বাণে সহায়ক হতে পারে। কে সেই ব্যক্তি? তিনি গৌতম বুদ্ধ।
আড়াই হাজার বছরেরও বেশি আগে, খ্রিস্টপূর্ব ৬২৩ অব্দে বৈশাখী পূর্ণিমা তিথিতে জন্মেছিলেন শাক্য রাজকুমার সিদ্ধার্থ গৌতম। দীর্ঘ সাধনায় দুঃখ নিবৃত্তির পূর্ণজ্ঞান লাভ করে তিনি হয়েছেন জ্ঞানী তথা বুদ্ধ, গৌতম বুদ্ধ। মানুষের মুক্তির বাণী হিসেবে তিনি প্রচার করেছিলেন, ‘জগতের সকল প্রাণী সুখী হোক’। তার এ জীবনচক্রের দৃশ্যায়ন হয়ে দাঁড়িয়েছে ধানমন্ডি, ঢাকার আলিয়ঁস ফ্রঁসেজে চলমান প্রদর্শনী ‘বাংলার বুদ্ধ: আমাদের পবিত্র সংঘ’।
আলিয়ঁস ফ্রঁসেজের লা গ্যালারি। একটা ছোট্ট করিডোর পেরিয়ে সেখানে যেতে হয়। করিডোরে দুই পাশের দেয়ালে সাজানো বুদ্ধের জীবনঘেরা বিভিন্ন চিত্র। শুরুতেই হাতের ডানে চোখে পড়ে ক্যানভাসে অ্যাক্রিলিক কালারে ফুটিয়ে তোলা ‘বজ্রযান বুড্ডিজম’। করিডোরের দেয়ালে টাঙানো প্রদর্শনীর চিত্রগুলো দেখতে দেখতে বুঁদ হয়ে যেতে হয় ভাবনায়, যেন বুদ্ধের জীবনের বিভিন্ন পর্ব অতিক্রম করে যাচ্ছি আরো গভীরে কোথাও। তবে তার জীবনের পূর্ণ দর্শনের আগে নিজেকে আবিষ্কার করতে হয় করিডোর শেষে লা গ্যালারি-সংলগ্ন আবছা আলোময় ছোট্ট আঙিনায়। তখন মনে পড়ে যায় বুদ্ধের সেই বাণী—
‘জীবন এক টুকরা মায়া
একপ্রস্থ খোয়াব
একখানা বুদবুদ
একফালি ছায়া।
চিরস্থায়ী কিছু নাই
রাগ করিবার কিছু নাই
বিবাদ করিবার কিছু নাই
কিছুই নাই।’
(বুদ্ধের হৃদয়)
পৃথিবীতে সবকিছুই নশ্বর। মানবজীবনও তারই অংশ। তবে মানুষের জীবন নানা ঘটনার সমাহার এবং এর অধিকাংশই দুঃখের জন্ম দেয়। অর্থাৎ মানবজীবন মূলত দুঃখময়। এ গভীর সত্য উপলব্ধি করেছিলেন নগর পরিভ্রমণরত রাজকুমার সিদ্ধার্থ গৌতম। জীবন, জরা, ব্যাধি ও মৃত্যু তিনি দেখেছিলেন নগরের বিভিন্ন আনাচে-কানাচে। সেসব দৃশ্য সিদ্ধার্থকে ভাবিয়ে তুলেছিল, যে ভাবনার পরিণতি ছিল গৃহত্যাগ। এরপর নানা ঘটনা খ্রিস্টপূর্ব ৫৮৮ অব্দে ৩৫ বছর বয়সে বুদ্ধগয়ায় বোধিবৃক্ষের নিচে বৈশাখী পূর্ণিমা তিথিতে গৌতম বোধিপ্রাপ্ত হন। তিনি উপলব্ধি করেন মানবজীবনের চার সত্য—দুঃখ, দুঃখ সমুদয়, দুঃখ নিরোধ ও দুঃখ নিরোধ মার্গ। আর এ দুঃখের বড় কারণ মানুষ নিজেই। তিনি উপলব্ধি করেন, মানুষ তার চিন্তা দিয়েই দুনিয়া গড়ে থাকে। তিনি বললেন, ‘যুদ্ধের অভাব শান্তি নহে। শান্তি একপ্রস্থ গুণ/মনের অবস্থাবিশেষ/ভালোবাসা, সততা আর বিশ্বাসযোগ্যতা চর্চার ব্যবস্থা।’ এভাবে বুদ্ধ শান্তির বাণী ছড়ালেন। জীবদ্দশায় প্রচার করলেন সম্প্রীতি, সহমর্মিতার বাণী, যা সম্প্রদায় বা সংঘ গঠনের গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক। বুদ্ধের ত্রিরত্নের একটি হলো ‘সংঘ’ বা পবিত্র সম্প্রদায়।
চলমান প্রদর্শনীর শিল্পকর্মে সেই পবিত্র সম্প্রদায় তথা মানুষের পারস্পরিক সম্পর্ক, প্রকৃতিসহ বুদ্ধের অবয়ব, বাণী ও জীবনদর্শনকে ফুটিয়ে তুলেছেন বিভিন্ন অঙ্গনের ৮০ শিল্পী। তেলরঙ, জলরঙ, গোয়াশ, টেম্পোরা, ভাস্কর্য, মিনিয়েচার, বাটিক, সুই-সুতা, অ্যাপ্লিক, উডকাট, নকশিকাঁথা, সিরামিক, প্রিন্টমেকিং ও ধাতু শিল্পের মতো বিভিন্ন মাধ্যমে তৈরি ৯১টি শিল্পকর্ম স্থান পেয়েছে প্রদর্শনীতে।
এসব শিল্পকর্ম যেন বুদ্ধের বাণীকে আবারো সামনে এনেছে। প্রাণীর দিকে প্রীতি নিয়ে চেয়ে থাকা চিত্রকলার মাধ্যমে ছড়িয়ে দিচ্ছে করুণার আলো। বুদ্ধের হৃদয় থেকে ছড়িয়ে পড়ছে জ্ঞানের আলো। সব মিলিয়ে বাংলায় বুদ্ধের ধ্যানধারণার অনন্য মাধ্যম হয়ে উঠেছে প্রাচ্য-চিত্রকলা অনুশীলন সংঘ ও লার্নিং ডিজাইন স্টুডিওর উদ্যোগে আয়োজিত বাংলার বুদ্ধ প্রদর্শনীর চতুর্থ আসর।
তবে দর্শক হিসেবে প্রদর্শনীর চিত্রকর্মের পাশে শিল্পী ও শিল্পের নাম দেখতে না পাওয়াটা কিছুটা অস্বস্তি জাগায়। এ নিয়ে আয়োজকদের নিজস্ব যুক্তি থাকতে পারে। তবে দর্শকের কৌতূহল বিবেচনায় বিষয়টি পুনর্বিবেচনায় নেয়া সমীচীন হতে পারে। সেই সঙ্গে প্রদর্শনীর ক্যাটালগ কেবল আর্টিস্টদের জন্য না করে সাধারণ দর্শকের জন্যও স্বল্প খরচে কোনো ক্যাটালগ তৈরির বিষয়টি তারা ভাবতে পারেন। জীবনের তৃষ্ণা নিবারণ সম্পর্কে বুদ্ধ বলে গেছেন, কিন্তু প্রদর্শনী দেখে বুদ্ধকে জানার যে তৃষ্ণা বেড়ে চলে দর্শকমনে, তা নিবারণের উদ্যোগ আয়োজকদের নেয়া উচিত বলেই মনে করি।
উল্লেখ্য, আজ প্রদর্শনীটির শেষ দিন। আর সমাপনীতে প্রথমবারের মতো প্রদান করা হবে ‘বেস্ট আর্টিস্টস অ্যাওয়ার্ডস’।










