এক বাটি ফল, খাবারের টেবিল, পানের বাটি কিংবা অগোছালো ফেলে রাখা বই। খুব সাদামাটা দৃশ্য যেন। দৈনন্দিন চোখের সামনে দেখা উপকরণ। যেন জীবনের লুকানো ও ক্ষণস্থায়ী সৌন্দর্যের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। এ চেনা দৃশ্যের মধ্যেই শিল্পীরা খুঁজে নেন তাদের সৃষ্টির প্রেরণা। জন্ম নেয় স্টিল লাইফ। অর্থাৎ স্টিল লাইফ এমন এক ধরনের শিল্পকর্ম, যেখানে চারপাশের প্রাত্যহিক চোখে পড়া নির্জীব বস্তু যেমন ফল, ফুল, শিকার করা প্রাণী, ঝুড়ি কিংবা বাঙ্কারে পড়ে থাকা বুলেট প্রদর্শিত হয়। রাজধানীর উত্তরায় অবস্থিত গ্যালারি কায়ায় জীবনের এ আটপৌরে অংশটিই মূর্তমান হয়ে উঠেছে দেশের প্রবীণ ও নবীন শিল্পীদের যৌথ প্রদর্শনীতে।

স্টিল লাইফ শিরোনামে প্রদর্শনীটি শুরু হয়েছে ২৫ জানুয়ারি। দেশের ১৪ জন আধুনিক ও সমকালীন চিত্রশিল্পীর আঁকা ৪৯টি চিত্রকর্ম নিয়ে। মিশ্র মাধ্যম, রঙিন কলম, অ্যাক্রিলিক, চারকোল কিংবা জলরঙ— আঁকার মাধ্যম বিভিন্ন হলেও বিষয়বস্তু স্টিল লাইফ। বিষয়টির ব্যাখ্যা দিলেন গ্যালারি কায়ার পরিচালক ও প্রদর্শনীর কিউরেটর গৌতম চক্রবর্তী স্বয়ং। তিনি বলেন, ‘আমরা যারা চারুকলায় পড়াশোনা করেছি, তারা প্রথম জীবনে স্টিল লাইফ করি। তারপর আর সেভাবে ভাবা হয় না। তবে কেউ কেউ পরবর্তী জীবনে কাজটা চালিয়ে যান। আন্তর্জাতিক পরিসরে পিকাসোর মতো অনেকে স্টিল লাইফের জন্য বিখ্যাত। আমাদের দেশেও রয়েছেন, ফলে আমরা সিদ্ধান্ত নিই দেশের শিল্পীদের স্টিল লাইফ নিয়ে কাজ করার।’

প্রদর্শনীতে যে ১৪ জন শিল্পীর কাজ ঠাঁই পেয়েছেন, তাদের অনেকেরই দেশব্যাপী পরিচিতি আছে। হাশেম খান, চন্দ্রশেখর দে, রতন মজুমদার, জামাল আহমেদ, রণজিৎ দাস, শেখ আফজাল হোসাইন, আলপ্তগীন তুষার, অনুকূল চন্দ্র মজুমদার, আজমির হোসাইন, কামাল উদ্দিন, কামরুজ্জামান সাগর, সোহাগ পারভেজ, শাহনুর মামুন এবং দিদারুল হোসাইন লিমন। বিষয়বস্তু নির্মাণে স্বাতন্ত্র্যও নজরে পড়ে। হাশেম খানের আঁকা মাটির পাত্র আর রতন মজুমদারের আঁকা চৌকাঠে এক জোড়া জুতা যেন একই কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। শিল্পীদের সংখ্যা নিয়ে গৌতম চক্রবর্তী জানান, এ ১৪ জনের বাইরেও অনেকে স্টিল লাইফ নিয়ে কাজ করেন। কিন্তু একটা পর্যায়ে গিয়ে দাঁড়ি টানতে হয়। চিত্রকর্ম বা শিল্পীর সংখ্যাটা মূলত প্রতিনিধিত্বশীল। প্রদর্শনীটি মূলত শিল্পীরা কীভাবে স্টিল লাইফ ভাবছেন, সেটা হাজির করার প্রয়াস।’

দেয়ালে চোখ বোলাতে বোলাতেই দর্শকমনে একটা কৌতূহল উঁকি দেবে। প্রদর্শনীটি একদিক থেকে দেখলে মনে হবে কয়েকটা প্রজন্মের সমন্বয়। প্রবীণদের থেকে শুরু করে রয়েছে নবীন পর্যন্ত বিস্তৃতি। কিউরেটর পূর্বপরিকল্পনা এটা। তার ভাষায়, ‘গ্যালারি কায়ার প্রতিষ্ঠাকাল থেকেই আমাদের মাথায় ছিল প্রদর্শনীতে প্রবীণদের সঙ্গে নবীনদের মেলবন্ধন ঘটানো। প্রদর্শনী হবে একটা সেতুর মতো। প্রবীণদের অভিজ্ঞতা নবীনদের কাছে জানানো হবে। আবার নবীনদের চিন্তা থেকেও প্রবীণরা নেবে অনুপ্রেরণা। বিস্তৃত হবে শিল্পচর্চার পরিধি।’

স্টিল লাইফ শিল্পের ইতিহাস জুড়ে বিস্তৃত। ঘরানাটি ১৭ শতকের নেদারল্যান্ডসে বিশেষভাবে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। নগরায়ণের ফলে ব্যক্তিক অনুভূতি অগ্রাধিকার পেয়েছে। পাশাপাশি অগ্রাধিকার পেয়েছে হতাশা, ক্লান্তি, অবসর আর প্রাত্যহিক একঘেয়েমি। স্টিল লাইফ যেন ভেতরের সেই জায়গাটাকেই স্পর্শ করে। যখন কামাল উদ্দিনের পানের বাটার দিকে চোখ যায়, উঁকি দেয় নানা সম্ভাবনা। বিরান ঘরে বানানো পানটা রেখেই চলে গেছে কেউ। কিংবা কেউ বানিয়ে অপেক্ষা করছে কারো জন্য। ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদের এ যুগে সংগত কারণেই স্টিল লাইফের শক্ত বাজার রয়েছে বৈশ্বিক পরিসরে। অথচ দুঃখজনকভাবে বাংলাদেশে খোদ শিল্পকলার বাজারই মাথা উঁচু করতে পারেনি। বিষয়টি নিয়ে যেন আফসোস ঝরে পড়ে শিল্পী গৌতম চক্রবর্তীর মুখে। তিনি বলেন, ‘ছবি বিক্রি হতে হবে। আর্টিস্টের জন্য ছবি আঁকা হতে হবে প্রধান কাজ। জীবিকার জন্য যেন তাকে অন্য কিছু ভাবতে না হয়। তার জন্য শিল্পের বাজার দরকার। বিভিন্ন দেশে বড় বাজার আছে শিল্পের। অথচ আমাদের অনেক আর্ট কলেজ থাকার পরও আর্টের বাজার তৈরি হয়নি।’

স্টিল লাইফ প্রদর্শনী চলবে ৭ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত। প্রতিদিন বেলা সাড়ে ১১টা থেকে সন্ধ্যা সাড়ে ৭টা পর্যন্ত খোলা থাকবে গ্যালারি।