করারই কথা। শিশুদের চিন্তার মধ্যেই থাকে একধরনের কোমল আবেশ। মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে চলমান শিল্প প্রদর্শনীতে এমন ছবিই দেখা যাবে মনে করলে ভুল হতো। কেননা মাত্র কয়েক পা এগোতেই সেই আবেশ ভেঙে দেয় সৈয়দ সাইফের শক্তিশালী শিল্পকর্ম ‘মর্দানা’।

মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে চলছিল ২০ শিল্পীর উপস্থাপনায় ‘পুনর্কল্পনায় সুলতানার স্বপ্ন’। সেখানে নানা ধরনের চিত্রকর্ম, ভাস্কর্য ও ইনস্টলেশন ছিল। বেগম রোকেয়ার সুলতানার স্বপ্ন নতুন করে ধরা দিয়েছে এ শিল্প প্রদর্শনীতে। সেখানেই প্রথমে দৃষ্টি আটকায় ‘মর্দানা’র ওপর।

সৈয়দ সাইফের ‘মর্দানা’য় শিল্পী বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনের কল্পিত নারীবাদী ইউটোপিয়াকে—নারীরা শাসন করে এবং পুরুষেরা নির্জনে বাস করে—এক তীব্র শিল্পভাষ্যে রূপ দিয়েছেন। এর মাধ্যমে দর্শক সুলতানার স্বপ্ন, এমনকি বেগম রোকেয়াকে আবিষ্কার করবেন নতুন করে। একইভাবে রূপশ্রী হাজংয়ের শিল্পকর্মেও এসেছে বিষয়টি। বেগম রোকেয়ার ‘সুলতানার স্বপ্ন’য় একটা গভীর প্রশ্ন ছিল—কেন নবোদ্গত চারাগাছ পূর্ণতা লাভের আগেই ঝরে পড়বে? সেই প্রশ্ন থেকেই অনুপ্রাণিত হয়ে রূপশ্রী নির্মাণ করেছেন তার শিল্পকর্ম ‘সংগ্রাম’।

‘পুনর্কল্পনায় সুলতানার স্বপ্ন’ শীর্ষক এ প্রদর্শনীতে একত্র হয়েছেন সমসাময়িক ২০ শিল্পী। তারা ‘সুলতানার স্বপ্ন’কে কেন্দ্র করে নির্মাণ করেছেন তাদের স্বতন্ত্র শিল্পভুবন। রোকেয়ার রচনায় যেমন এক সূক্ষ্ম অথচ বাস্তবসম্মত স্বপ্নলোকের প্রতিফলন দেখা যায়, তেমনি এ শিল্পীরা নিজেদের কল্পনা, অভিজ্ঞতা ও দৃষ্টিভঙ্গির আলোকে সেই স্বপ্নকে দৃশ্যমান করে তুলেছেন এক নতুন শিল্প-বাস্তবে।

Untitled-2

এ প্রদর্শনী কেবল শিল্পের সমাহার নয়, বরং এটি বেগম রোকেয়ার আলোচনামূলক চিন্তার এক বিস্তৃত পুনঃপাঠ। এখানে শিল্পীরা অস্তিত্বের অযৌক্তিকতা, কল্পনার বৈপরীত্য, অদৃশ্য লিঙ্গভিত্তিক শ্রম ও আখ্যানভিত্তিক চিত্রভাষার কাব্যিক প্রয়োগের মাধ্যমে প্রজন্মান্তরে সঞ্চারিত স্মৃতি, প্রকৃতি ও দেহের সহাবস্থানের সম্পর্ককে নতুন করে অনুধাবন ও মূল্যায়নের আহ্বান জানিয়েছেন। পুরো প্রদর্শনী ঘুরে দেখলে দর্শক শিল্পকর্মের মাধ্যমে অনুভব করবেন রোকেয়ার লিখিত এমনকি অনুচ্চারিত বিষয়গুলোও।

প্রদর্শনীর মধ্যে রয়েছে দীপ্তি দত্তের ‘স্বপ্নের বাইরে থেকে’, ফারজানা আহমেদ উর্মির ‘সুলতানার স্বপ্নভূগোল’, রাজীব দত্তের ‘সুলতানাদের আকাশের আলো ও আঁধার’, পলাশ ভট্টাচার্যের ‘দরজা’, সাজিয়া রহমান সন্ধ্যার ‘কাদেরাবাদের গল্প’ ও আসাং মাংয়ের ‘জগতের ভেতরে জগৎ’সহ আরো বহু শিল্পকর্ম, যেগুলো প্রত্যেকটিই নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গিতে বেগম রোকেয়ার ভাবনাকে নতুন মাত্রায় উন্মোচন করেছে।

s

এসব শিল্পকর্মের মধ্য দিয়ে শিল্পীরা পুনরুজ্জীবিত করেছেন হারিয়ে যাওয়া ক্ষুদ্র ইতিহাসগুলো, প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন লিঙ্গভিত্তিক স্থানিক বিন্যাস ও মতাদর্শিক স্তরক্রম এবং ‘সুলতানার স্বপ্ন’প্রসূত এক নতুন কল্পনার জন্ম দিয়েছেন—আশা ও সহনশীলতার সহাবস্থানকে। ৬ ডিসেম্বর ২০২৫ শুরু হওয়া এ প্রদর্শনী আমাদের সংগ্রামের ইতিহাস এবং লেডিল্যান্ডের ইউটোপীয় স্বপ্নরেখার মধ্যে এক সেতুবন্ধ রচনা করে এ বার্তাই উন্মোচন করেছে—‘মুক্তি কোনো স্থির অবস্থা নয়, বরং তা সমতা, যুক্তি এবং সম্মিলিত বিকাশের মধ্য দিয়ে অর্জিত এক চলমান, রাজনৈতিক ও রূপান্তরমূলক প্রক্রিয়া।’

গতকাল দিনব্যাপী শিল্পীদের উপস্থিতিতে আয়োজিত বিশেষ প্রদর্শনী পরিভ্রমণ এবং সাংবাদিকদের সঙ্গে তাদের সরাসরি সংলাপ ও অভিজ্ঞতা বিনিময়ের মধ্য দিয়ে এ চিন্তাশীল ও সৃজনময় আয়োজনের পর্দা নামে। তবে রেখে যায় প্রশ্ন, প্রতিধ্বনি এবং নতুন কল্পনার এক দীর্ঘস্থায়ী অনুরণন।