চলছে মাঘের বিদায়ী প্রস্তুতি। অবশ্য শীত-সন্ধ্যার যে আমেজ, সেটি সপ্তাহখানেক ধরে রাজধানীতে আর নেই। চলতি সপ্তাহের প্রথম দিন রাঙা গোধূলি বেলায় উপস্থিত হয়েছিলাম গুলশান-তেজগাঁও লিংক রোডের ২১১ আলোকি গ্রীনহাউজে। মূল ফটক পেরোনোর পর মুহূর্তে বুঝতে পারলাম এসে পড়ছি অন্যরকম একটা পরিবেশে। ব্যাকগ্রাউন্ডে বাজছে গান। প্রশস্ত উঠোনজুড়ে চলছে তরুণ-তরুণীদের গল্প-আড্ডা। নাগরিক কোলাহল থেকে স্বস্তি পেতেই বুঝি তারা ভিড় জমিয়েছেন এখানে! এছাড়া এ প্রাঙ্গণে যাপিতজীবনের পসরা নিয়ে প্রায়ই চলে বহুমুখী আয়োজন। সেদিনও ছিল বেশকিছু আয়োজন। তাই ঢাকা স্টোরিটেলার্স আয়োজিত চিত্রকর্মের প্রদর্শন কোথায় অনুষ্ঠিত হচ্ছে তা খুঁজে পেতে একটু বেগ পেতে হয়েছিল।

1

প্রদর্শন গৃহের দরজা ঠেলে ভেতরে প্রবেশ করতেই আলো-আঁধারির ছায়ায় যেন খচিত রয়েছে অমূল্য সব ধন। লম্বা হলঘর। দেয়ালজুড়ে শোভা পাচ্ছে দেশের বরেণ্য চিত্রশিল্পী, ভাস্করদের করা নান্দনিক চিত্রকর্ম। উপস্থাপন শৈলী ও চিত্রকর্মে বিষয়বস্তু যেন ঠাসবুনটে গাঁথা। শুরুতে চোখে পড়বে অ্যাক্রেলিক ক্যানভাসে করা কনকচাঁপা চাকমার চারটি কাজ। ছোপ ছোপ লাল রঙের মাঝে আঁকা হয়েছে পাহাড়ি রমণীর ছবি। পাশেই ‘মনোমুগ্ধকর গোধূলি’ শিরোনামের একটি কাজ, যা দেখে একরাশ প্রশান্তিতে ভরে উঠবে দর্শনার্থীদের মন। রঙ ও রেখা ব্যবহারে অনেক আগেই স্বকীয়তায় পৌঁছে গেছেন কনকচাঁপা। কাজ দেখলেই বোঝা যায়।

‘পুরাতন শহর’ শিরোনামে শাহনূর মামুনের করা চিত্রযুগলটির ওপর। ধূসর দালানের ফাঁক দিয়ে দেখা যাচ্ছে এক চিলতে নীল আঁকাশ। এ দৃশ্যটি দর্শককে কাছে টানছে। প্রদর্শন গৃহ ঘুরেফিরে দেখছেন আগতরা। বিশাল অ্যাক্রেলিক ক্যানভাসে জামাল আহমেদের করা একটি চিত্রকর্মের কাছে ভিড় জমাচ্ছেন তারা। কেননা এ ছবিগল্পে তুলে ধরা হয়েছে বুড়িগঙ্গা নদীতে লালাভ সূর্যাস্তের দৃশ্য।

রফিকুন নবীর দুটি কাজ এ গ্যালারি শোভা বাড়িয়েছে অনেকখানি। একটি তার বহুল বিখ্যাত টোকাই চরিত্র, আরেকটি নৌকায় বিশ্রামরত দুই জেলে। পাশেই রয়েছে মনিরুল হকের কয়েকটি বিমূর্ত চিত্রকর্ম। মেঝেতে বসানো রয়েছে শ্যামল সরকারের অদম্য শিরোনামের পাঁচটি প্রাণীর ভাস্কর্য। যেখানে উপস্থাপন করা হয়েছে পৃথিবীর প্রত্যেকটি প্রাণীই অবিরামভাবে ছুটে চলছে। দিন শেষে পরাক্রমশীল প্রাণীটিও যে নিস্তেজ হয়ে যায়। সেটিই কাজটির বিষয়বস্তু। লোকঐতিহ্যের স্পর্শ-গন্ধমাখা আবদুস শাকুর শাহের চিত্রকর্ম। লোকজ ফর্মে করা তার কিছু কাজও এখানে রয়েছে।

15_9GrRNug (1)

বিমূর্ত ধারার শিল্পী মুহাম্মদ ইউনুস। এখানে তার কাজও ঠাঁই পেয়েছে। দর্শনার্থী অবশ্য এ শিল্পীর ‘ষাঁড়ের লড়াই’ চিত্রকর্মটির সামনে দাঁড়িয়ে উদ্ধার করছেন বিষয়বস্তু। গভীর নিমগ্ন চিত্তে ছবিটির দিকে তাকালাম। স্পষ্টত হয় দুটি ষাঁড়ের লড়াই। লালজমিনের একটি সাদা রঙে ষাঁড়ের শিং সমেত অবয়ব। আক্রমণাত্মক আরেকটি ষাঁড়কে ফুটিয়ে তুলেছেন সাদার মধ্যে কালো শিং ও রেখার মাধ্যমে। কিছু সময় পর এ শিল্পীর সঙ্গে দেখা হলো। তার কাজ সম্পর্কে জানতে চাইলে বলেন, ‘বিমূর্ত চিত্রকলা বলতে অদৃশ্য এক অনুরণন, যা দেখা যায় না, অনুভব করে নিতে হয়। প্রকৃতির রঙ, রেখা ও টেক্সার নিয়ে মূলত একটা গল্প রচনা করি। সে গল্পটি অনেকটা ধ্রুপদি সংগীতের সুরের মতো, যা প্রাণের মধ্যে একটা রিদম তৈরি করে। একেকজনের কাছে একেক অনূভূতি সৃষ্টি হয়।’

novera

মুহাম্মদ ইউনুসের চিত্রকর্ম কম্পোজিশন উইথ ব্লু

এএইচ ঢালির আঁকা বিশাল একটি কাজ দেখছিলেন নূর হোসেন নামের এক দর্শনার্থী। প্রদর্শনীর চিত্রকর্ম সম্পর্কে এ নারী দর্শনার্থী বলেন, ‘‌বিষয় বৈচিত্র্যের দিক থেকে আয়োজনটি দারুণ। বাংলাদেশের প্রাণপ্রকৃতির। মানুষের যাপিতজীবন। সবকিছু উঠে এসেছে এখানে।’ তিনি আবারো ঢালির আঁকা গোচারণভূমির দৃশ্যটি দেখিয়ে শিল্পীর নাম উচ্চারণ করে মুগ্ধতা প্রকাশ করলেন।

প্রদর্শনী কিউরেটর সৈয়দা আদিবা হোসেনের সঙ্গে কথা হয়। তিনি বলেন, ‘‌প্রদর্শনী থেকে উপার্জিত অর্থ সিলেটের কয়েকটি নিম্নবিত্ত পরিবারের শিক্ষার্থীদের শিক্ষার কাজে ব্যয় হয়। আমাদের উদ্দেশ্যকে উৎসাহিত করতে দেশের প্রথিতযশা শিল্পীরা তাদের সেরা কাজটিই দিয়েছেন। সেই সঙ্গে চিত্র সংগ্রাহকদের কাছ থেকেও ভালো সাড়া পাচ্ছি। এখানে ৯০টির মতো কাজ রয়েছে।’

প্রদর্শনীর কাজগুলো নিসর্গের আলোয় ভরপুর। স্বকীয় বিষয় শৈলী ও প্রকাশভঙ্গিতে উজ্জ্বল। বিশেষ এ গ্রুপ শিল্প প্রদর্শনীর নাম ‘দ্য স্টোরি অব আর্ট’। এখানে ২৮ জন খ্যাতনামা চিত্রশিল্পী একই ছাদের নিচে একত্রিত হয়েছেন।

রফিকুন নবী থেকে শুরু করে মনিরুল ইসলাম, হামিদুজ্জামান খান, আব্দুস শাকুর শাহ, শহীদ কবীর, শাহাবুদ্দিন আহমেদ, ফরিদা জামান, রোকেয়া সুলতানা, আহমেদ শামসুদ্দোহা, শেখ আফজাল হোসেন, বিনিতা করিম, আনিসুজ্জামান, শ্যামল সরকার, হাসুরা আকতার রুমকির মতো প্রতিশ্রুতিশীল তরুণদের কাজকে ঠাঁই দেয়া হয়েছে। তাদের জন্য এটি অনন্য অভিজ্ঞতা বটে। আজমীর হোসেন তার নিজের চিত্রকর্মের সামনে দাঁড়িয়ে ছিলেন। তিনি জলরঙে তুলে ধরেছেন, মেঘমেদুর বর্ষার প্রকতি। বর্ষার মেঘের আবরণের ঢাকা আকাশ। মাঠে চরে বেড়াচ্ছে কালো মহিষদল। দৃশ্যের সঙ্গে দারুণ কম্পোজিশন তুলছে সাদা সাদা বকপক্ষীর দল। যেন অপরূপ সৌন্দর্যের এক ডালি। এ শিল্পীর কাছে অনুভূতি জানতে চাইলে বলেন, ‘‌এ গ্যালারিতে যে মজা, গুরুস্থানীয় শিল্পীদের সঙ্গে আমার কাজও আছে। তাছাড়া এখানে প্রচুর সাধারণ দর্শক দেখতে আসছেন। যাদের অনেকেই এসেছেন মূলত আলোকির ফ্যাশন শো দেখতে।’

৭ ফেব্রুয়ারি ‍শুরু হওয়া প্রদর্শনীটি চলবে আগামীকাল পর্যন্ত। প্রতিদিন বেলা ১১টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত দর্শনার্থীর জন্য উন্মুক্ত এ প্রদর্শনীর দরজা।