প্রাচীন পুস্তকে বাংলাকে পরিচয় করিয়ে দেয়া হয়েছে শক্তির দেশ হিসেবে। শক্তি যেন তখন থেকেই এ ভূমিতে উপস্থাপন হয়েছে নানা রূপে-প্রতিরূপে। পদ্মা, জাঙ্গুলি, তারা, চণ্ডী, কালী থেকে শুরু করে শক্তির যে কত রূপ তার হিসাব নেই। সেসব চরিত্রকে ঘিরে গড়ে উঠেছে জনজীবনের বিশ্বাস। সে পৌরাণিক বিশ্বাস প্রতিবিম্বিত হয়েছে মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যে। বাংলার লোকজ চিত্রকলায়ও তার নজির দৃশ্যমান। চিরায়ত বাংলার পৌরাণিক সে উপজীব্য আরো এক দফা প্রাণ খুঁজে পেল চিত্রশিল্পী লিটন সরকারের নির্মাণে। তার সাক্ষী রাজধানীর কলাকেন্দ্রে চলমান একক চিত্রকর্ম প্রদর্শনী ‘পৌরাণিক মন’।

দর্শক মাত্রই প্রথম দেখায় সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন, লিটন সরকারের চিন্তার গড়ন সহজিয়া। কিন্তু তিনি প্রচলিত সীমাকে অতিক্রম করেছেন। কাগজে মিশ্র মাধ্যমে আঁকা তার দেবতা, দেবী, পীর ও তাদের সঙ্গে তাদের বাহন বেশ অভিনব। আঁকার ধরন যতটা না প্রাকৃতিক তার চেয়ে অনেক বেশি রূপক। তবে সে রূপকও প্রতিষ্ঠিত রূপক থেকে ভিন্ন। তিনি কি প্রচলিত রূপকের আর্কিওটাইপ থেকে বের হয়ে নতুন রূপক হাজির করতে চান? এজন্য সম্ভবত যিশু আর বুদ্ধ, প্রাচীন ভারত ও প্রাচীন মিসর তার চিন্তায় পাশাপাশি দোল খায়। সংযোগ খুঁজে পায় উত্তর ভারতের গুরু নানক আর বাংলার পীরের দর্শনে। বিষয়বস্তু নির্মাণে লিটন সরকার মূলত কামরুল হাসানের অনুগামী। আরো স্পষ্ট করে বললে কালীঘাট, লক্ষ্মীসরা ও গাজির পট; যেখান থেকে খোদ কামরুল হাসান অনুপ্রেরণা নিয়েছেন।

11

মিথকে যারা আক্ষরিক অর্থে নেন, তারা মনে করেন উদ্ভট। মিথ বলতেই ‘অবাস্তব’ বলে একটা দ্যোতনা তৈরি হয়েছে তাই। কিন্তু মিথ উদ্ভট কিছু নয়, তা নিয়ে বিস্তর আলোচনা করেছেন লেভি স্ট্রাউস, মির্চা এলিয়াদ, জোসেফ ক্যাম্পবেল ও কার্ল গুস্তাভ ইয়াংয়ের মতো বোদ্ধারা। তারা দেখিয়েছেন, আপাত উদ্ভট বিশ্বাসের ভেতরে রয়েছে জীবন ও জগৎকে বোঝাপড়ার চিরায়ত বিদ্যার প্যাটার্ন। লিটন সরকার সেটাই তালাশ করেছেন তার মতো করে। এজন্য তার চিত্রকর্মের একদিকে জায়গা করে নিয়েছেন বুদ্ধ, অন্যদিকে যিশু। চৈতন্য ও লালন সাঁই সেখানে পাশাপাশি। পুরাণের আর দর্শনের যে সংযোগ, সেটা বারবার স্পর্শ করতে চেয়েছেন লিটন। তার ভাষায়, ‘আমার আঁকার ঢঙ মূলত এ অঞ্চলেরই পরম্পরা। বিষয়বস্তুর ভাবনা এসেছে সুফি সাধক, নানক ও শ্রী চৈতন্যের বোঝাপড়া থেকে। আমাদের ধর্ম আলাদা, কিন্তু সত্তা এক; মিলনস্থল এক। সেখান থেকেই মূলত ভাবনাটা।’

লিটন সরকার পড়াশোনা করেছেন নারায়ণগঞ্জ ফাইন আর্টস ইনস্টিটিউট ও ইউনিভার্সিটি অব ডেভেলপমেন্ট অল্টারনেটিভে (ইউডা)। যৌথ প্রদর্শনীর সংখ্যা ১০ পার হয়ে গেলেও একক প্রদর্শনী এটাই প্রথম। লিটন সমকালীন চিত্রপ্রবণতায় যে নতুন মাত্রা যোগ করেছেন, তা হলফ করে বলা যায়। বিষয়বস্তুর পেছনের রহস্য জানতে চাইলে লিটন আমাদের সহজিয়া দর্শনের সে অমোঘ কথা শুনিয়ে দেন। ‘যে দেখে আর যা দেখে দুইয়ে মিলেই এক। নিজের ভেতরেই পরমের বাস। বিষয়টা গুরু নানক যেমন বলেছেন, তেমনটাই সামনে এনেছেন চৈতন্য। আমি সে দর্শনকে চিত্ররূপে উপস্থাপন করার চেষ্টা করেছি।’ তার সত্যায়ন পাওয়া যায় প্রদর্শনীর কিউরেটর ও শিল্পী ওয়াকিলুর রহমানের ভাষায়। লিটন সরকারের চিত্রকর্ম নিয়ে তার মূল্যায়ন, ‘লিটনের শিল্প তার বিশ্বাসের নিশ্বাসে চর্চিত। প্রতীকবাদে সমৃদ্ধ তার কাজগুলো বুঝতে তার মনের, ভাবনার, বিশ্বাসের গভীর অন্ধকার জগৎ জানা জরুরি।’

এক অনির্বচনীয় ঘোর নিয়ে প্রদর্শনী থেকে যখন বের হলাম, তখন প্রায় গুটিয়ে ফেলার প্রস্তুতি চলছে। প্রতিদিন বিকাল ৪টায় শুরু হয়ে শেষ হয় রাত ৮টায়। ১০ জানুয়ারি শুরু হওয়া প্রদর্শনীটি চলবে ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত।