দেশের বিখ্যাত শিল্পী, বাবা প্রয়াত হয়েছেন ক’বছর আগে। প্রদর্শনী থেকে বাবার ড্রয়িং কিনলেন আত্মজা। এ ঘটনা জানাতেই কয়েকদিন আগে ফোন করেছিলেন শিল্পীর এক ভক্ত। বললেন, ‘জানেন নাকি। খুব বড় একটা প্রদর্শনী আজ শুরু হয়েছে গ্যালারি কায়ায়। সেখানে বেশকিছু চিত্রকর্ম প্রদর্শিত হচ্ছে যেগুলো আগে খুব একটা দেখা যায়নি। বিশেষ করে বশীর স্যারের (মুর্তজা বশীর) একটি কাজ। ছবির খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে যুই আপা (মুর্তজা বশীরের কন্যা মুনীরা বশীর) কিনে নিয়েছেন।’

সেই কাজটি দেখার কৌতূহল থেকে উপস্থিত হই রাজধানীর উত্তরা ৪ নম্বর সেক্টরের ১৬ নম্বর রোডের ২০ নম্বর বাড়ির শিল্প প্রাঙ্গণে, গ্যালারি কায়ায়। গ্যালারির ২১তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে ভেতরে চলছে চিত্রপ্রদর্শনী। গত ২৭ জুন শুরু হওয়া প্রদর্শনীর শিরোনাম ‘আর্ট ইজ টাইম অ্যান্ড বিয়ন্ড’।

16

ভেতরে প্রবেশ করতেই চোখে পড়ল শিল্পী হামিদুজ্জামান খান ও আইভি জামান দম্পতিকে। তারা দাঁড়িয়ে আছেন ‘সামিট’ শিরোনামের একটি বিশাল চিত্রকর্মের সামনে। ক্যানভাসে অ্যাক্রিলিক রঙে আঁকা মেঘ পাহাড়ের দৃশ্য! নাকি অন্য কিছু! ছবির মনভূমিজুড়ে খেলা করছে রঙের কারুকাজ। এটি শিল্পী হামিদুজ্জামান খানের আঁকা। হঠাৎই খেয়াল হলো শিল্পী দম্পতি যেহেতু এখানে দাঁড়িয়ে আছেন, তাহলে হয় তারা মাত্রই প্রবেশ করেছেন, নয়তো বের হবেন। ভাবলাম, আপাতত শিল্পকর্মগুলো দেখে নিই। তারপর তাদের অনুভূতি জেনে নেয়া যাবে। পাশেই রয়েছে মোহাম্মদ ইউনুসের ‘দেয়ালের ইতিহাস’ শিরোনামের একটি বিমূর্ত চিত্রকর্ম। শিল্পটি যেন একটি কবিতা। যার পরতে পরতে খেলা করছে রঙের ঢেউ। খুব যত্ন করে দেখলে চোখে পড়ে একটি মানুষ কি অগণিত মানুষের উঁকি দেয়ার ছবি। আরো কত কী! একটি দেয়ালকে আমরা কতভাবে ব্যবহার করি তা বিমূর্তকলার মাধ্যমে তুলে ধরেছেন শিল্পী। শিল্পকর্মটির নামকরণ মনে হলো সার্থক।

এক ছাদের নিচে এত গুণী শিল্পীর কাজের সমাবেশ! কোনটা রেখে কোনটার কথা লিখি। গত শতকের পঞ্চাশের দশকে যে অগ্রণী শিল্পীদের করস্পর্শে বিকশিত হয়েছে বাংলাদেশের চিত্রকলার জগৎ, তাদের প্রায় সবার কাজই এখানে উপস্থিত। কামরুল হাসানের ছাপচিত্র, মুর্তজা বশীরের মহান ভাষা আন্দোলনের লিনোকাট। এটি শিল্পী ওই সময়ই করেছিলেন। কাজী আবদুল বাসেতের সন্তান কোলে মা চিত্রকর্মটির দিকে তাকালে মন ভেসে যায় মায়ার জোছনায়। একজন দর্শনার্থীর মন যদি চিত্রকর্ম দেখে মায়ার আবেশে সিক্ত হয় তাহলে শিল্পী কতটুকু দরদ আর ভালোবাসায় এঁকেছিলেন ছবিটি! আফসোস, সেই অনুভূতি শিল্পীর কাছে জানার সুযোগ মিলবে না আর। ছবিটির পাশেই রয়েছে মোহাম্মদ কিবরিয়ার একটি বড় আকারের বিমূর্ত রীতির লিথোপ্রিন্ট।

17

গ্যালারিতে প্রবেশ করতেই দর্শনার্থীদের দৃষ্টি কাড়বে হাশেম খানের অ্যাক্রিলিকে আঁকা বিশালাকার বকপাখি। লম্বা পা ফেলে এগিয়ে যাচ্ছে পাখিটি। পেছনে দেখা যাচ্ছে আরো কয়েকটি বক। রণজিৎ দাশের ‘অনুভব’ শিরোনামের চিত্রকর্মে গোসলরত এক রমণীর ছবি। লোকায়ত বাংলার রূপ ফুটে উঠেছে আবদুশ শাকুর শাহের কয়েকটি কাজে। ‘প্রকৃতি থেকে’ শিরোনামে আবুল বারক আলভীর কাজটিও শিল্পরসিকদের ভাবায়।

মুর্তজা বশীরের বালিকা শিরোনামের একটি সিঙ্গেল লাইন ড্রয়িং রয়েছে। এটি সাদা-কালো। অথচ তার মধ্যেই বালিকার চোখ যে সাদা, তা ফুটে উঠেছে। বরেণ্যে এ শিল্পীর যে কাজটি নিয়ে এ লেখার শুরু সেটিতে ফিরে আসা যাক—ঈদমেলা থেকে ফেরা দুই কিশোর-কিশোরীর ড্রয়িং, ‘ঈদমেলা’ শিরোনাম যার। প্রদর্শনীর প্রথম দিনই ‍শিল্পীকন্যা মুনীরা বশীর কিনে নিয়েছেন এ চিত্রকর্ম। এ কাজটিও দেখা হলো। কন্যা বাবার শিল্পকর্ম কিনলেন। তার অনুভূতি জানতে চাইলে মুনীরা বশীর বলেন, ‘প্রথমে এক বাক্যে বলি—কাজটি যে পাব, তা একেবারে অপ্রত্যাশিত ছিল। দ্বিতীয়ত, কাজটি আমার কাছে এখন আবেগের নাম। এ ড্রয়িংটা আমাদের হারিয়ে যাওয়া পুরান ঢাকার স্মৃতি বহন করছে। আমরা বড় হয়েছি পুরান ঢাকায়। আমাদের ছোটবেলাতেও চকবাজারে ঈদের মেলা বসত। সেই ঈদমেলা ফেরত এক কিশোর-কিশোরীর ছবি বাবা এঁকেছেন। তারা মেলা থেকে কাঠের ঘোড়া নিয়ে বাড়ি ফিরছে। ছেলেটির মাথায় যে টুপি পরা, আমার বাবারও কিশোরবেলায় এমন টুপি পরা একটা ছবি আছে। বাবার কাছ থেকে শুনেছি তখনকার দিনে পুরান ঢাকার অভিজাত ঘরের ছেলেরা এমন জরির কাজ করা টুপি পরত। আরেকটি বিষয় হলো বাবা এটি এঁকেছিলেন ১৯৫৬ সালে। তখন তিনি ইতালিতে ছিলেন। পড়াশোনার জন্য গিয়েছিলেন। তখন তার যুবক বয়স। বাড়ি ছেড়ে এক বাঙালি যুবকের হয়তো তার ফেলে আসা স্মৃতিকে স্মরণ করতে কাজটি করেছিলেন। সেই কাজটি মেয়ে হিসেবে নিজের সংগ্রহে রাখার আনন্দ ভাষায় প্রকাশ করা এ মুহূর্তে সম্ভব নয়। এটি তার নিরীক্ষাধর্মী কাজ। কোথায় কোন রঙ বসবে, দেখবেন কাজটির মধ্যে তার নির্দেশনা দেয়া আছে।’

18

প্রদর্শনীর ছবি দেখা শেষ করে কথা হয় শিল্পী হামিদুজ্জামানের সঙ্গে। তিনি জানালেন, প্রদর্শনীর একটি বিশেষ দিক, এখানে অনেক ধরনের কাজ রয়েছে এবং ভালো কাজের পরিমাণ বেশি। অন্যান্য গ্যালরিতে এত বৈচিত্র্য হয়তো চোখে পড়ে না। অনেকগুলো বিখ্যাত কাজ পেয়ে যাবে। বিশেষ করে মুর্তজা বশীর, কিবরিয়া স্যারের (মোহাম্মদ কিবরিয়া) কাজ ভিন্নমাত্রা যোগ করেছে।

রফিকুন নবীর জলরঙে আঁকা ফুলদানি, চারকোলের করা বনভূমিতে সন্ধ্যা, কাকের ড্রয়িং, দেবদাস চক্রবর্তীর আঁকা দম্পতির রেখাচিত্রসহ নজরকাড়া ছবি রয়েছে প্রদর্শনীতে। প্রদর্শনগৃহে কথা হয় শিল্পী রফি হকের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘আমাদের দেশে ঢাকার বাইরে একটিও আর্ট গ্যালারি নেই। নেই তেমন শিল্প সংগ্রাহক। সেখানে ব্যক্তিগত উদ্যোগে একটি গ্যালারি ২১ বছর পার করল। এটা নিঃসন্দেহে একটি চ্যালেঞ্জ। নানা ধকল সহ্য করেই টিকে রয়েছে গ্যালারি কায়া। এজন্য একজন শিল্পী হিসেবে তাদের ধন্যবাদ জানাই। আরেকটি বিষয় শিল্পের প্রসারের জন্য সরকারের অনেকখানি দায়িত্ব ছিল। সেটি তারা পালন করতে পারেনি।’

অনেক নবীন শিল্পী এসেছেন গ্যালারিতে। প্রদর্শনীতে ৩৫ জন শিল্পীর ৭০টি শিল্পকর্ম রয়েছে। শিল্পীদের মধ্যে আরো রয়েছেন চন্দ্রশেখর দে, ফরিদা জামান, কামালউদ্দিন, কামরুজ্জামান সাগর, কনকচাঁপা চাকমা, মাহমুদুল হক, মাকসুদা ইকবাল, মোহাম্মদ ইকবাল, মোস্তাফিজুল হক, নগরবাসী বর্মণ, রণজিৎ দাস, রতন মজুমদার, সমরজিৎ রায় চৌধুরী, শিশির ভট্টাচার্য প্রমুখ।

কথা হয় গ্যালারি কায়ার পরিচালক শিল্পী গৌতম চক্রবর্তীর সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘২১তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে এ আয়োজন। এ প্রদর্শনীতে আমরা স্বল্প পরিসরে চেষ্টা করেছি বাংলাদেশের কনটেম্পোরারি চিত্রকলার চর্চার ধারবাহিকতা রক্ষা করতে। এখানে যেমন প্রবীণ শিল্পীদের কাজ আছে, তেমনি নবীন চিত্রকরদের কাজও রয়েছে।’

গত ২৭ জুন শুরু হওয়া প্রদর্শনী চলবে ১২ জুলাই পর্যন্ত। দর্শনার্থীদের জন্য প্রতিদিন বেলা ১১টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত উন্মুক্ত গ্যালারি কায়ার দুয়ার।