এক অমর চিত্রী, যার মৃত্যুর ১৩৫ বছর পরও অপার দুঃখ-বেদনা-সংশয় আর সত্য-মিথ্যার সঙ্গে যিনি জড়িয়ে আছেন তিনি ভিনসেন্ট ভ্যান গঘ। তিনি নিজের জীবনের ও শিল্পের এক অনবদ্য কথক হয়েও চিরন্তন এক রহস্যগল্পে নিজেকে হাজির নাজির রেখেছেন। অমীমাংসিত নানা জিজ্ঞাসার চাপান-উতোর বুঝি তিনি অলক্ষে থেকে ঠিকঠাক ঠাওর করছেন, কে জানে!  আমাদের মনে প্রশ্ন জাগে এমনটা কি সত্যি হয়েছিল, নাকি যা আমরা জানি, তা নিয়েও আছে সংশয়? তার জীবন আখ্যান, সত্য-মিথ্যার স্তর পেরিয়ে আমরা সে আখ্যানটায় নিজেদের ব্যাপ্ত করি। এভাবেই যেন ভিনসেন্ট ভ্যান গঘ আমাদের মাঝে নিজের বিরুদ্ধে নিজেরই দাঁড়িয়ে যাওয়া এক মিস্টিক চরিত্র হয়ে বিরাজ করে, সরব করে।

গঘ এমন এক মিস্টিক চরিত্র, যার প্রতিপক্ষ বা প্রতিপক্ষ হয়ে প্রতিবিধান, প্রতিবয়ান হাজির হতে থাকে। যার একেকটি অন্যটিকে খারিজ করে, প্রশ্ন তোলে, নতুন অর্থ-অনর্থের বাহাস তৈরি হয়। নিজের সম্পর্কে তার যাপনকালে অজস্র ব্যক্তিগত পত্র চালাচালি করেছেন, তদুপরি যেন তিনি থেকে গেছেন অন্তরালে! নিজেকে উন্মোচন করতে গিয়ে ঢের আব্রুতে ঢেকেছেন তবে? আসলে গঘ শুভানুধ্যায়ীদের নিরন্তর জিজ্ঞাসা বা ঔৎসুক্যের কাছে একদিকে তার পত্রভাষ যেমন নানা উন্মোচনের স্মারক, তেমনি তিনি নিজেকে যেন রেখেছেন অব্যাখ্যার অন্তরালে। ফলে এ মনীষীচিত্রীর ‘‌‌অন্তিম’গাথা আমাদের জিজ্ঞাসায় সরব করে রাখে। এ কথা অনস্বীকার্য, ইতিহাসের মহত্তম এক শিল্পীর যন্ত্রণা ও মনোবেদনার দলিলে যেন আমাদেরও হিস্যা লিখিত হয়ে আছে। ফলে তার কাটা কান নাকি কানের লতি, কানের খণ্ড অংশগ্রহীতা, উন্মাদগামিতা, মদাসক্তি, গণিকাগমন, আত্মহত্যা এমন প্রসঙ্গাবলি পৌনঃপুনিক আমাদের ধ্বস্ত করে।

২০ বছর পরে আপনি যে কাজগুলো করেছেন তার চেয়ে আপনি যা করেননি তাতে বেশি হতাশ হবেন। ...তাই অন্বেষণ করুন। স্বপ্ন দেখুন। আবিষ্কার করুন।"মার্ক টোয়েনের এ কথাই যেন ভ্যান গঘ সমাচারের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হয়ে আছে। ফলে তার ৩৭ বছরের জীবনের শেষ ৭০ দিন নানা অন্বেষণ-বিশ্লেষণের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে আছে। একটা সৃজনশক্তি জীবন কেমন করে আচমকা থেমে গেল তা নিয়ে জল্পনা, অনুমান, কল্পনার শেষ নেই। তার শেষ পরিভ্রমণ ছিল আউভার্স-সুর-ওয়েস, সে জায়গা যেখানে ভিনসেন্ট ১৮৯০ সালের মে-জুলাই পর্যন্ত তার জীবনের শেষ দুই মাসের বেশি সময় কাটিয়েছিলেন। যেখানে অনাকাঙ্ক্ষিত জীবনাবসান এমনকি তিনি ও তার ভাই থিওকে সমাহিত করা হয়েছে। তার কিছু বিখ্যাত কাজ এখানে করা হয়েছিল। তিনি তার চিত্রই জীবনের শেষ দিনগুলোয় খুব সৃজনমগ্ন ছিলেন। সংখ্যা বিতর্ক থাকলে তার শেষ ৭০ দিনে প্রতিদিন গড়ে একটি চিত্রকর্ম নির্মাণ করেছিলেন।

২০১৪ সালে ভ্যানিটি ফেয়ারে প্রকাশিত একটি প্রবন্ধ, যার শিরোনাম ছিল "NCIS : Provance : The Van Gogh Mystery। এতে ‘‌Van Gogh: The Life’-এর লেখকরা তাদের পাওয়া ফরেনসিক প্রমাণ এবং তাদের সঙ্গে পরামর্শ করা বিশেষজ্ঞদের ব্যাখ্যা হাজির করেছেন। বিশেষ করে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় হ্যান্ডগান ফরেনসিক বিশেষজ্ঞদের একজন ড. ভিনসেন্ট ডি মাইও, যারা তাদের অনুসন্ধান প্রকাশ করেছিলেন।

তাদের মধ্যে বেশ কয়েকজনের ভাষ্যের কোনোটিতেই "আত্মহত্যা" শব্দটি উল্লেখ করা হয়নি। তাছাড়া ভিনসেন্টের চিকিৎসা করা ডা. গ্যাচেটসহ কেউই ধারণা করতে পারেননি যে ভিনসেন্ট কোত্থেকে বন্দুক পেয়ে থাকবেন। গ্যাচেটের কোনো বন্দুক ছিল না এবং তিনি যেখানে থাকতেন সেই রেভো ইনের কারো কাছেও বন্দুক ছিল না। ভিনসেন্টের বন্দুক ব্যবহারের সুযোগ ছিল না এবং ঘটনাস্থলে কখনো বন্দুক পাওয়া যায়নি। এছাড়া তার আঁকার সব সরঞ্জাম, ইজেল, রঙ, ব্রাশ ও ক্যানভাস কখনো পাওয়া যায়নি। খেতের উপস্থিতি সম্পর্কে বিস্তারিত প্রতিবেদন পাওয়া গেছে। বিবরণগুলোর মাধ্যমে ড. ডি মাইও এ সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন যে—

Vincent could not have shot himself. Guns in those days fired black powder and were very messy, ending up all over the shooter’s hands. And the description of the wound showed no gunpowder or burns from the shot. The gun was pointing downward making the theory that he shot himself even less plausible. Dr Di Maio concluded that the shot had to have been fired from about two feet away.

যদিও ভিনসেন্টের অবসাদজনিত উন্মার্গগামিতা, হতাশা সাধারণ্যে আত্মহন্তারক হিসেবে গ্রহণযোগ্য করে থাকবে! এ বিষয়ে গবেষক গুণগ্রাহীদের মতামতের নানা বিশ্লেষণ ভিনসেন্টের মৃত্যুকে দুঃখভারাক্রান্ত করে। গঘের শেষ শিল্পকর্ম, শেষ উক্তি, শেষ ইচ্ছে নিয়েও মত-ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণের শেষ নেই! ফ্রান্সের দক্ষিণাঞ্চলীয় আর্লেস ও সেন্ট–রেমি–দে–প্রভিন্স থেকে ১৮৯০ সালের ২০ মে প্যারিসের অভে সুর ওয়াইস গ্রামে যান ভ্যান গঘ। ধারণা প্রচলিত আছে যে এর মধ্যেও তিনি ৭৪টি চিত্রকর্ম তৈরি করেছেন। অনেকেই মনে করেন, ‘হুইটফিল্ড উইথ ক্রো’ ছবিটি তিনি আঁকা শেষ করেছিলেন ১৮৯০ সালের ১০ জুলাই। কিন্তু ১০ জুলাই ভ্যান গঘ লিখিত চিঠিতে চিত্রকর্মটির সুনির্দিষ্ট কোনো উল্লেখ নেই! ভিনসেন্ট মারা যান ওই বছরের ২৯ জুলাই।

ডাচ আর্ট হিস্টোরিয়ান জেন হালস্কার, যিনি কিনা ভ্যান গঘের চিত্রকর্ম নিয়ে গবেষণার জন্য খ্যাত, অবশ্য গমখেতের এ ছবিকে গঘের জীবনের শেষ সময়ের কাজ হিসেবেই উল্লেখ করেছেন। অবশ্য ‘ট্রি রুটস’ নামে আরেকটি ছবিকেও অনেকে তার শেষ কাজ হিসেবে উল্লেখ করেন। তবে ১০ থেকে ১৪ জুলাই ভ্যান গঘ তিনটি চিঠি লিখেছিলেন তার ভাই, বোন ও মা কে।  তার মধ্যে ১০ জুলাই প্রিয় ভাই ও বোনটি সম্বোধনে লেখা চিঠিতেই  আঁকা সম্পর্কে উল্লেখ করেন, “আমি আবারো কাজ শুরু করেছি। যদিও আঙুল থেকে তুলি প্রায় খসে যাচ্ছে। কারণ আমি জানি যে আমি ঠিক কী করতে চাই, এরই মধ্যেই তিনটি আরো বড় ক্যানভাসে কাজ শুরু করেছি। ঝোড়ো আকাশের নিচে বিস্তীর্ণ খেত, কিন্তু বিষণ্নতা ও চূড়ান্ত নিঃসঙ্গতা প্রকাশ করার চেষ্টায় খুব একটা নিজের মেজাজে এগোতে পারিনি। ছবিগুলো দ্রুতই দেখতে পাবে আশা করি, যেহেতু যত দ্রুত সম্ভব আমি নিজেই এসব প্যারিসে নিয়ে যাব। আর আমি নিশ্চিত যে শব্দে যা বলতে পারিনি, এ ক্যানভাসগুলো তোমাদের তা বলবে, বলবে যে গ্রামকে আমি সত্যিই কত স্বাস্থ্যকর আর প্রাণবন্ত বলে মনে করি।"

অন্যদিকে যেকোনো চিত্রকর্মই তার শেষ চিত্রকর্ম হোক না কেন, মৃত্যুর আগের ৭০ দিনে অর্থাৎ উল্লিখিত সমস্ত চিত্রকর্মই (মতান্তরে ৭৪টি শিল্পকর্ম) তার মৃত্যুর কাছাকাছি সময়ে আঁকা হয়েছিল। বর্তমানে আমাদের কাছে কোনো প্রমাণ নেই যে ভ্যান গঘের কোন চিত্রকর্মটি শেষ আঁকা হয়েছিল। নতুন প্রমাণ না পাওয়া পর্যন্ত ভ্যান গগের শেষ চিত্রকর্মটিও রহস্যই থেকে যাবে! থিওকে গঘের লিখিত অন্তিম পত্র (যা ডাকে দেয়া হয়নি) মোতাবেক তার আঁকা চিত্রকর্মের উল্লেখ পাওয়া যায়। তিনি লিখেছিলেন, “দ্যবিনির বাগানের ওই ছোট্ট স্কেচটা দেখো—এই হলো আমার সবচেয়ে সযত্ন-চিন্তিত ক্যানভাস। পুরনো খড়ো চালাঘরের স্কেচ একটা, আর বৃষ্টির পরে বিস্তৃত গমখেতের ৩০ সাইজ ক্যানভাসের মাপে দুটো স্কেচ এর সঙ্গে যোগ করছি।" এ ছিল তার জীবনে চিত্রকর্ম সম্পর্কে শেষ বলা/লিখিত উচ্চারণ।

ভাই থিওকে উদ্দেশ করে শেষ চিঠিটি লিখেছিলেন ২৩ জুলাই ১৮৯০ সালে। মৃত্যুর মাত্রই সপ্তাহ খানেক আগে। চিঠির শুরুতেই তিনি লিখেছিলেন, প্রিয় ভাইটি, আজকের চিঠির জন্য ধন্যবাদ, আর ভেতরের ৫০ ফ্রাঁ, ধন্যবাদ তার জন্যেও। মৃত্যুর আগে এই শেষ চিঠিটি তার কাছেই পাওয়া যায়। এ চিঠির ওপর থিও নিজের হাতে লিখেছিলেন, ‘২৯ জুলাই এ চিঠি তার বুকের ওপর ছিল।’ ছোট ভাই থিও ভ্যান গঘের ভাষ্যমতে, তার জীবনের শেষ বাক্যটি ছিল ‘La tristesse durera toujours.’ “লা ট্রিস্টেসে ডুরেরা টুজোর্স, যার ইংরেজিতে অনুবাদ ‘This sadness will last forever’র বাংলা অর্থ "দুঃখ চিরকাল থাকবে। ১ আগস্ট ১৮৯০ থিও তার মাকে লেখা চিঠিতে বলেছিলেন, ভ্যান গঘের অন্তিম উচ্চারণ সম্পর্কে ভিনসেন্ট বলেছিলেন, ‘এভাবেই চলে যেতে চাই’, আর তার আধ ঘণ্টার মধ্যেই নিজের ইচ্ছে পূরণ করে ও।"

ডা. গ্যাচেটের কথা দিয়েই শেষ করি—‘আমরা যারা ভিনসেন্টের বন্ধু, তারা যেন দুঃখ না করি। ভিনসেন্ট মরেনি, সে মরতে পারে না। তার ভালোবাসা, তার প্রতিভা, যে সৌন্দর্য সে সৃষ্টি করে গেছে, তা চিরভাস্বর হয়ে থাকবে, পৃথিবীকে উজ্জ্বল করে তুলবে।’

This living hand, now warm and capable

“Of earnest grasping, would, if it were cold

And in the icy silence of the tomb,

So haunt thy days and chill thy dreaming nights

That thou would wish thine own heart dry of blood

So in my veins red life might stream again,

And thou be conscience-calmed—see here it is—

I hold it towards you.”

—John Keats, This living hand

লেখক: শিল্পী ও সমালোচক