নিকারির মৎস্যগন্ধা ডালা, ছাগলছানার তিড়িংবিড়িং নাচ; ঠাস বুনটে আলো ঝলমলে দিগন্ত, মেঠোপথে ভারবাহী ফসল কাঁধে কৃষকের বাড়ি ফেরা। কিংবা নিবিষ্টমনে রমণীর পরনের পোশাকে সেফটিপিন লাগানো, জনযুদ্ধ, মুক্তিযুদ্ধ, গ্রামের পথের রিকশচালক, কলসি কাঁখে জল ভরে ফিরতি পথে রমণীদের অসমাপ্ত গল্প, হারমোনিয়াম বাজনারত গ্রামের প্রবীণ শিল্পী, মধ্যাহ্নভোজে কৃষক এবং হাতপাখা ঘোরানো কৃষাণী, গাভীর দুধ পানরত বাছুর—আর এমন কত যে দৃশ্যগল্প! মৃত্তিকাসংলগ্ন এমন দৃশ্যগল্পের কারিগর হিসেবে সুবিদিত শিল্পী সমর মজুমদার। গুণী এ শিল্পীর ৬০টি চিত্রকর্ম নিয়ে সম্প্রতি রাজধানীর ভূমি গ্যালারিতে আয়োজিত হয় তার ষষ্ঠ একক চিত্রকলা প্রদর্শনী। ‘শিল্পাঙ্গন’ আয়োজিত এ প্রদর্শনীর শিরোনাম, ‘অনুস্মৃতি’।
লোকজ উপাদানকে উপজীব্য করে ছবি আঁকেন সমর মজুমদার। তুলে ধরেন গ্রামের হারিয়ে যাওয়া সময়টাকে। গরু কিংবা ছাগলছানার ছবিতে তিনি বিষয়টিকে এমনভাবে উপস্থাপন করেন, যেখানে মায়ার রাজ্য এসে ভর করে স্মৃতির পটে।
প্রদর্শনগৃহে প্রবেশ করেই চোখ যায় ‘ভীতিকর পারাপার’ শিরোনামে একটি কাজের ওপর। যেখানে দেখা যাচ্ছে, এক জননী তার এক সন্তানকে কোলে নিয়ে আরো দুই সন্তানের হাত ধরে সাঁকো পার হচ্ছেন। ছবির আক্ষরিক ভাষার বাইরে গিয়ে যদি প্রতীকে আশ্রয় নিই তাহলে দাঁড়ায় কী! গ্রাম্য এ মায়ের মতো দেশের প্রত্যেক জননীই পেন্ডুলামের মধ্যে আছেন। শুধু আকুতির দৃশ্যই বহন করে না, বরং সতর্কতার ইঙ্গিতও প্রদান করে এসব চিত্রকর্ম। আমাদের উপলব্ধির ঘরে এসে ঢুঁ মারে এক নিরুত্তরের হাহাকার। সমর মজুমদারের ছবিতে যেমন আবেশ, মায়া ও স্মৃতির উপস্থিতি থাকে, তেমনি গভীর মমত্ববোধও এসে দোলা দেয়।

‘মাটির গান’ সিরিজের বেশ কয়েকটি ছবি এ প্রদর্শনীতে উপস্থাপিত হয়েছে। সেগুলোর বর্ণনা কি শুধু শব্দের মাধ্যমে তুলে ধরা সম্ভব? এ কাজগুলো দেখেই প্রথমে মন চলে গেল শওকত আলীর ‘প্রদোষে প্রাকৃতজন’ উপন্যাসের প্রচ্ছদপটে। ক্ল্যাসিক এ গ্রন্থের প্রচ্ছদের শিল্পীও সমর মজুমদার। মাটির গানের কাজগুলো আমাদের ফিরিয়ে নিয়ে যায় জল-হাওয়ার ঘরে। সেই অনেক অনেক কাল আগে, যেখানে শব্দ-সুরের আবহে বাজে দূর অতীতের গল্প। সন্তানকে গোসল করাচ্ছেন এক মা। সেই ছবির সামনে দাঁড়িয়ে এক দর্শনার্থী তার পাশেরজনকে বলছেন, ‘দেখো দেখো আমাদের মায়েরা কত মমতাময়ী। কত যত্ন নিয়ে তার সন্তানকে লালনপালন করে।’ একটু ফুরসত পেয়ে এ দর্শনার্থীর কাছে প্রদর্শনী সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এ শিল্পীর কাজ আগে দেখিনি। এখানে হঠাৎ আসা। চিত্রকর্ম সম্পর্কে তেমন ধারণা আমার নেই। তবে গ্রামের মেয়ে হিসেবে এটুকু বলা যায়, শিল্পী যেন গ্রাম তুলে এনেছেন নগরে। আমাদের চেনা জগৎ। ফেলা আসা শৈশব।’
শিল্পী সমর মজুমদারের অনুভূতি জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমার এ প্রদর্শনী অন্যগুলোর চেয়ে একটু আলাদা। কারণ এমন এক সময় প্রদর্শনী শুরু হয়েছে, যখন দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি অনেকটাই ঘোলাটে। তাই খুব ঘরোয়াভাবে আয়োজনটি করা হয়েছে। যে কারণে বিশেষ আলোচনা ও প্রচারের সুযোগ ঘটেনি। এখানে যে কাজগুলো রয়েছে তার মধ্যে দুই-একটি ব্যতীত অন্য কাজগুলো কোথাও প্রদর্শন হয়নি।’
প্রদর্শনী সম্পর্কে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাচ্যকলা বিভাগের অধ্যাপক শিল্পী মলয় বালা বলেন, ‘এ কাজগুলো সমর মজুমদারের বহু বছরের অনুসন্ধান, সংগ্রহ ও অভিজ্ঞতার এক পরিমার্জিত সংহতি। এখানে যেমন রয়েছে পূর্ববর্তী কাজের রঙ-সংযম ও মানবিক গভীরতা, তেমনই রয়েছে নতুন দৃশ্য গঠন, ঘনীভূত টেক্সচার আর মর্মস্পর্শী মানব ইমেজ এবং গভীরতর দৃষ্টিভঙ্গি। এ প্রদর্শনী আমাদের সামনে খুলে দেয় এমন এক অনুভবের দরজা, যার মাধ্যমে আমরা মানুষকে দেখি তার ভেতরের ভঙ্গুরতা, দৃঢ়তা নীরব যন্ত্রণা—একটি অসমাপ্ত অথচ সম্পূর্ণ সত্তা হিসেবে।’
বস্তুত সমর মজুমদারের চিত্রকর্ম দেখে স্নেহ, মায়া আর ভালোবাসার অফেরতযোগ্য অনুভূতি ভর করে মস্তিষ্কে। স্মৃতির কোষে কোষে দোলা দেয় এ চিত্রকর্মগুলো।










