শিল্পের জন্য শিল্প কিনা সে বিতর্ক বহুদিনের। শিল্প মানুষের জীবনকে তুলে ধরবে, নাকি তা জীবন নিরপেক্ষ কল্পনা হবে সে প্রশ্নের জবাব দেয়াটাও সহজ নয়। শিল্পী সুবর্ণা মোর্শেদা তার একটি শিল্প প্রকল্পের অনুপ্রেরণা নিয়েছেন রাজধানীর কড়াইল বস্তি থেকে। নিম্ন আয়ের হাজার হাজার মানুষ এখানে সংসার পেতেছেন। সারা জীবন এক শহরে বসবাস করে, হাজারো গলি ঘুরলেও বস্তির গলি আমাদের অচেনা, সেখানকার মানুষের জীবন আমাদের অপরিচিত। কিন্তু এখানেই সুবর্ণা খুঁজে পেয়েছেন তার শিল্পের উপাদান। বস্তির মানুষের সংগ্রামকে দিয়েছেন শিল্পের ভাষা। এমন তিনটি শিল্পকর্ম নিয়ে দুর্জয় বাংলাদেশ ফাউন্ডেশনের (ডিবিএফ) সহায়তায় সম্প্রতি প্যারিসে গ্রাঁ পালেতে আয়োজিত রেভেলেশনস ইন্টারন্যাশনাল ফাইন ক্রাফট অ্যান্ড ক্রিয়েশন বিয়েনালে অংশ নিয়েছেন তিনি। ২১ মে শুরু হয় পাঁচ দিনব্যাপী এ উৎসব। এ আন্তর্জাতিক শিল্প উৎসবের উদ্বোধন করেন ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ।
রেভেলেশনসে প্রথমবার একজন বাংলাদেশী শিল্পী হিসেবে সুবর্ণা মোর্শেদার অংশগ্রহণের অভিজ্ঞতা কেমন হলো জানতে চাইলে বললেন, ‘আমার জন্য অনেক বড় একটা অভিজ্ঞতা ছিল। এত দেশ থেকে আসা শিল্পীদের সঙ্গে নিজের কাজ প্রদর্শন, তাদের সঙ্গে কথা বলা, ভাবনার আদান-প্রদান—সবকিছুই আমাকে নাড়া দিয়েছে।’

শিল্প যে ভাষা, ভৌগোলিক সীমার বাধা অতিক্রম করতে জানে সে ইঙ্গিতও মিলল তার কথায়, ‘সবার ভাষা আলাদা হলেও শিল্পটাই যেন আমাদের ভাষা হয়ে উঠেছিল। আমি দেখেছি আমার দেশের উপকরণ, বয়ন—এসব খুব আগ্রহ নিয়ে দেখেছেন দর্শকরা। কেউ কেউ কিছু বলেননি, শুধু দাঁড়িয়ে তাকিয়ে থেকেছেন—তাদের চোখে একটা অনুভব ছিল। জিজ্ঞাসা ছিল কিন্তু প্রশ্ন করেনি। মনে হয়েছে, আমি শুধু একজন শিল্পী না, বরং আমার সমাজ, দেশ, আমার গল্পেরও একজন বাহক।’
প্রকল্পে তার সহশিল্পী ছিলেন সাজেদুল হক শুভ ও শাহরিয়ার জামিল খান। সঙ্গে ছিলেন উৎপল, অরবিন্দু, নাজনিন, মনিকা, ফাতেমা, সাথি, সাবস ও তৌসিফ।
কড়াইলের মানুষের জীবনে স্বস্তি হয়তো সচ্ছল জীবনের নয়। কিন্তু সেখানকার মানুষের মন শক্ত। নারীরা সেখানে আরো বেশি দৃঢ়। শিল্পী সুবর্ণার কথায়, ‘প্রকল্পটা শুরু হয় যখন আমি খুব কাছ থেকে তাদের দেখতে শুরু করি—এ শহরের অভিজাত গুলশান এলাকার পাশেই বস্তিতে বাস করা নারীরা কতটা মানসিকভাবে শক্ত। চোখে-মুখে ক্লান্তি, জীবনে অনিশ্চয়তা, তবু একটুও ভেঙে পড়ছেন না। প্রতিদিন নিজের জন্য, পরিবার আর সম্মানের জন্য লড়ে যাচ্ছেন। আমি বুঝতে পারি, এ শক্তিটা আসলে অনেক বড় ব্যাপার, যা আমরা খুব কমই দেখি বা শুনি। তাদের সেই মনের জোর, নীরব সহ্যশক্তি, আর ভেঙে না পড়ার মানসিকতা—এসবই আমাকে এ কাজ শুরু করতে উৎসাহ দেয়।’
রেভেলেশনসে তার প্রদর্শিত তিনটি শিল্পকর্মের একটি ফিনিক্স পাখির—ফিনিক্স অব রিনিউয়াল। এটি তৈরি হয়েছে কড়াইল বস্তির পলিপ্যাকেট আর কাপড়ের টুকরো দিয়ে। ‘এটা শুধু শিল্প না, বরং তাদের (কড়াইলের নারী) ভেতরের শক্তির একটা ছাপ হয়ে থাকুক, এই ছিল ভাবনা। তারই সিম্বল হিসেবে আসলে ফিনিক্স পাখিটা।’
প্রদর্শনীর দর্শকরা অনেকে জেনেছেন সুদূর বাংলাদেশের এক বস্তির নাম, যেখানকার মানুষের জীবন শুধু দারিদ্র্য দিয়েই বিশেষায়িত করা যায় তা নয়, বরং তাদের মানসিক দৃঢ়তা শিল্পের সমান্তরাল। তাদের সাহস হয়ে ওঠে শিল্পীর ফিনিক্স। বিশেষ করে কড়াইলের নারীরা, যারা প্রতিদিনের হাজারো সীমাবদ্ধতার মধ্যেও সব সামলে নেন, পরিবার টিকিয়ে রাখেন, সিদ্ধান্ত নেন।
শিল্পী সুবর্ণা মোর্শেদার কথায়, ‘আমি কড়াইলকে দেখে বুঝেছি, এখানে মানুষ শুধু বেঁচে থাকে না; প্রতিদিন নানা চাপ, অনিশ্চয়তা আর অসমতায় থেকেও তারা মানসিকভাবে ভীষণ শক্তিশালী। আমার কাজ সেই শক্তির প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠুক, সেটাই ছিল উদ্দেশ্য।’
যাদের জীবন নিয়ে এ শিল্পায়োজন, তাদের ভাবনা কী? ‘আপা, আমি তো কিছুই করি না’—শিল্পীকে দেখানো কড়াইলের নারীদের এ সরল বিনয়ের মধ্যে থাকে তাদের হাড় নিংড়ানো শ্রম, অসীম ভালোবাসা আর অব্যক্ত কষ্ট। তাদের জীবন দেশের বাইরের গ্যালারিতে উঠে এসেছে দেখে তারা আনন্দিত হন। তাদের কাছে এটা এক রকমের স্বীকৃতি, মর্যাদা। তাদের প্রতিদিনের জীবন যে শিল্পের অধিক সেটা তারা অনুভব করতে পারেন।










