ফ্রান্সের এক আশ্রমে থাকাকালীন কিংবদন্তি ভিনসেন্ট ভ্যান গঘ প্রায় দেড়শটি চিত্রকর্ম এঁকেছিলেন। সেসবের মধ্যে তার বিখ্যাত চিত্রকর্ম আইরিসেস এবং দ্য স্ট্যারি নাইটও ছিল। সে সময়টাতে ভ্যান গঘ অন্যান্য শিল্পীর চিত্রকর্মকে নিজের ব্যাখ্যামতো পুনঃসৃষ্টি করেছিলেন। এটাকে তিনি বলতেন ‘অনুবাদ’। ভাই থিওকে এক চিঠিতে তিনি লিখেছিলেন, কেবল অনুকরণ নয়, রঙের ভাষা ও ইমপ্রেশনেও তিনি রূপান্তর ঘটিয়েছেন।
উনিশ শতকে আঁকা ভ্যান গঘের সেসব ‘অনুবাদ’ চিত্রকর্মের একটি সম্প্রতি আবারো উঠে এসেছে আলোচনায়। একটি বিশেষজ্ঞ দল দাবি করেছে, তারা ভ্যান গঘের একটি হারিয়ে যাওয়া ‘অনুবাদ’ চিত্রকর্ম চিহ্নিত করেছেন!
বিশেষজ্ঞদের চিহ্নিত করা এই লাল গালের একজন মৎস্যজীবীর তৈলচিত্রটি এক অ্যান্টিক সংগ্রাহক মিনেসোটা থেকে এক গ্যারেজ সেলে ৫০ ডলারেরও কম মূল্যে কিনেছিলেন। ২০১৯ সালে সেই সংগ্রাহক চিত্রকর্মটি অপ্রকাশিত মূল্যে এলএমআই গ্রুপ ইন্টারন্যাশনাল নামের একটি শিল্প গবেষণা প্রতিষ্ঠানে বিক্রি করেন। তার পর থেকে প্রতিষ্ঠানটির গবেষকরা চিত্রকর্মটি বিশদভাবে পর্যালোচনা করেছেন এবং সম্প্রতি একটি ৪৫০ পৃষ্ঠার প্রতিবেদন প্রকাশ করেছেন, যেখানে তারা উপসংহার টেনেছেন—এটি একটি ভ্যান গঘ চিত্রকর্ম।
১৮ ইঞ্চি উচ্চতার এ প্রতিকৃতিতে দেখা যায়, একজন সাদা দাড়িওয়ালা মৎস্যজীবী সমুদ্রের ধারে বসে পাইপ টানছেন এবং মাছ ধরার জাল মেরামত করছেন। তার দৃষ্টিতে চিন্তার ছাপ, আর মুখে গভীর হাসির রেখা। চিত্রকর্মের নিচে ডানদিকে একটি স্বাক্ষর দেখা যায়—‘এলিমার’।
এলএমআই গ্রুপের প্রধান অপারেটিং কর্মকর্তা ম্যাক্সওয়েল এল অ্যান্ডারসন যখন প্রথম চিত্রকর্মটি পরীক্ষা করেন, তখন তিনি গভীরভাবে মুগ্ধ হন। যদিও চিত্রকর্মটি ভ্যান গঘের পরিচিত উজ্জ্বল রঙের বৈশিষ্ট্য বহন করে না, তবু এটি যে দক্ষ এক শিল্পীর হাতের কাজ তা তিনি বুঝতে পারেন। এরপর বিশদ বিশ্লেষণে চিত্রকর্মের রঙের স্তরের মধ্যে পাওয়া যায় একটি চুল। সেই চুলের ডিএনএ বিশ্লেষণে জানা যায়, এটি লালচে-বাদামি চুলবিশিষ্ট ব্যক্তির চুল, যা স্বয়ং ভ্যান গঘের বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে মেলে!
এছাড়া বিজ্ঞানী জেনিফার ম্যাস ও তার দল আবিষ্কার করে, এ চিত্রকর্মে ব্যবহৃত লাল রঙ পিআর-৫০ নামের একটি পিগমেন্ট, যা ১৯০৫ সালের পর উদ্ভাবিত। কিন্তু আরো গভীরভাবে করা অনুসন্ধানে পাওয়া যায়, এ পিগমেন্টের জন্য ১৮৮৩ সালেই পেটেন্ট করা হয়েছিল। তার মানে ভ্যান গঘের সময়েও এই পিগমেন্ট ব্যবহার করা সম্ভব ছিল। পাশাপাশি, ‘এলিমার’ নামে করা স্বাক্ষরের অক্ষরগুলোর বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, এটি ১৮৮৫ সালের ভ্যান গগের কিছু চিত্রকর্মের স্বাক্ষরের সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ।
ভ্যান গঘ সাধারণত তার চিত্রকর্মে স্বাক্ষর দিতেন না। তাহলে কেন ভ্যান গঘ এ চিত্রে ‘এলিমার’ স্বাক্ষর করলেন?—সে প্রশ্ন থেকেই যায়!
তবে গবেষকরা বলছেন, এলিমার নামটি এসেছে হ্যান্স ক্রিস্টিয়ান অ্যান্ডারসনের উপন্যাস দ্য টু ব্যারোনেসের একটি চরিত্র থেকে, যা ছিল ভ্যান গঘের অন্যতম প্রিয় সাহিত্যকর্ম। তারা মনে করেন, ১৮৮৯ সালে দক্ষিণ ফ্রান্সের আশ্রয় কেন্দ্রে থাকার সময় ভ্যান গঘ এটি এঁকেছিলেন। চিত্রকর্মটি ছিল ড্যানিশ শিল্পী মাইকেল অ্যাঙ্কারের আঁকা মৎস্যজীবী নিলস গেইহেদের এক প্রতিকৃতির ‘অনুবাদ’।
এলএমআই গ্রুপের এ বিশ্লেষণ ভ্যান গঘের কাজের নতুন দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেছে, বিশেষ করে তার অন্য শিল্পীদের কাজ পুনঃসৃষ্টি করার অভ্যাস সম্পর্কে। শিগগিরই এলিমার চিত্রকর্মটি শীর্ষস্থানীয় ভ্যান গঘ গবেষক ও সংগ্রাহকদের সামনে উপস্থাপন করবে এলএমআই। তাদের ধারণা, এর মূল্য অন্তত দেড় কোটি ডলার হতে পারে।
যদিও এলএমআই গ্রুপের গবেষণা নিশ্চিত করেছে, কিন্তু এলিমার চিত্রকর্মের সত্যতা এখনো বিতর্কিত। ২০১৯ সালে ভ্যান গঘ মিউজিয়ামও এটি পরীক্ষা করে। তখন এটিকে তারা আসল হিসেবে স্বীকৃতি দেয়নি। তবে তারা নতুন গবেষণাও এখনো পর্যালোচনা করেনি। তাই ‘এলিমার’ ভ্যান গঘের আঁকা কিনা সেটি নিশ্চিত হতে অপেক্ষা করতে হবে ভ্যান গঘ মিউজিয়ামের স্বীকৃতির। তার আগ পর্যন্ত এলিমার শিল্প ইতিহাসের এক আকর্ষণীয় ও অমীমাংসিত অধ্যায় হয়ে থাকবে।
সূত্র: স্মিথসোনিয়ান ম্যাগাজিন










