বাংলাদেশী আধুনিক চিত্রকলা দীর্ঘ সময় আন্তর্জাতিক বাজারে তুলনামূলকভাবে পিছিয়ে ছিল। নানা সময়েই দেখা গেছে বিদেশের বহু শিল্পীর শিল্পকর্ম চড়া দামে বিক্রি হচ্ছে। কিন্তু বাংলাদেশের শিল্পীদের চিত্রকর্ম নিয়ে এমন কথা শোনা যেত না। তবে সম্প্রতি এ অবস্থার পরিবর্তন হয়েছে। বাংলাদেশের শিল্পীদের শিল্পকর্ম গুরুত্ব পাচ্ছে বিদেশের নিলামে। বলা যায় বাংলাদেশী শিল্পীরা নতুন করে মূল্যায়িত হচ্ছেন। এ সময়ে দক্ষিণ এশীয় শিল্পের বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয়তার প্রেক্ষাপটে নিউইয়র্কে অনুষ্ঠিত ক্রিস্টি’জ ও সদবি’সের নিলামে বাংলাদেশের বিশ শতকের শিল্পকর্মগুলো তাদের প্রাক্কলিত মূল্যকেও ছাড়িয়ে যাচ্ছে। এ নিয়ে লিখেছেন সাইরাস নাজি।
সাইরাস সাম্প্রতিক একটি ঘটনাকে সামনে এনেছেন। সম্প্রতি সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দাম উঠেছে জয়নুল আবেদিনের একটি চিত্রকর্মের। ২০২৫ সালের ১৯ মার্চ ক্রিস্টি’জে তার ১৯৬৯ সালের একটি তৈলচিত্র ১ লাখ ১৯ হাজার ৭০০ ডলারে বিক্রি হয়েছে। বঙ্গোপসাগরে মাছ ধরার দৃশ্য তোলা এ তৈলচিত্র ৬০-৮০ হাজার ডলারে বিক্রি হবে বলে ধারণা করা হয়েছিল।
সাইরাস আরো জানান, সদবি’সে ১৭ মার্চ তার একটি ইঙ্ক স্কেচ বিক্রি হয় ৬৯ হাজার ৮৫০ ডলারে। এর সম্ভাব্য বিক্রয় মূল্য ৭ হাজার ডলার ধারণা করা হয়েছিল। সে হিসেবে ১০ গুণ বেশি দামে বিক্রি হয়েছে স্কেচটি। এটি ছিল তার বিখ্যাত ‘সাঁওতাল সিরিজ’-এর একটি স্কেচ। স্কেচে পূর্ববঙ্গের এক আদিবাসী দম্পতির চিত্রায়ণ রয়েছে।
একই কম্পোজিশনের আরেকটি ছবি ২০২৪ সালের মে মাসে বিক্রি হয় ৩ লাখ ৮০ হাজার ডলারে। গত দুই বছরে জয়নুল আবেদিনের সাতটি চিত্রকর্ম নিলামে লাখ ডলারের বেশি মূল্যে বিক্রি হয়েছে। এর মধ্যে রেকর্ড মূল্য ছিল সদবি’সে বিক্রি হওয়া ১৯৭০ সালের একটি সাদা-কালো ছবির। এটি গত বছর সেপ্টেম্বরে ৫ লাখ ১৬ হাজার ডলারে বিক্রি হয়। এটি এখন পর্যন্ত কোনো বাংলাদেশী শিল্পীর শিল্পকর্মের সর্বোচ্চ নিলাম মূল্য।
জয়নুল আবেদিন বাংলাদেশের চিত্রকলার কিংবদন্তি। তিনি ব্রিটিশ আমলে কলকাতায় শিল্পকর্মে দীক্ষিত হয়েছিলেন। প্রথম খ্যাতি লাভ করেন ১৯৪৩ সালের বঙ্গ-দুর্ভিক্ষ চিত্রায়ণের মাধ্যমে। দেশভাগের পর তিনি ঢাকায় চলে আসেন এবং সেখানে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের প্রথম চারুকলা ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা করেন। তার শিল্পধারা ছিল আধুনিকতাবাদী, যা পশ্চিমা শিল্পভাবনার পাশাপাশি বাঙালি লোকশিল্প ও জীবনধারায় গভীরভাবে প্রভাবিত।

তবে বাংলাদেশী শিল্প শুধু আবেদিনেই সীমাবদ্ধ নয়। তার সমসাময়িক শিল্পী কামরুল হাসান, শেখ মোহাম্মদ সুলতান ও তার ছাত্র মোহাম্মদ কিবরিয়ার নামও নিতে হয় এবং তাদের কাজও নিলামে উঠেছে। সদবি’সে কিবরিয়ার ১৯৬৭ সালের একটি বিমূর্ত ক্যানভাস চিত্র বিক্রি হয়েছে ৪৪ হাজার ডলারে। এটির মূল্য ২৪ হাজার ডলার উঠবে বলে মনে করা হয়েছিল। জাপানে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কিবরিয়ার শিল্পে সূক্ষ্মতার ছাপ স্পষ্ট। তার চিত্রকর্মকে মূল্যবান করতে বিষয়টি কাজে দিয়েছে।
সাইরাস নাজির লেখা থেকে জানা যায়, কামরুল হাসান ও সুলতানও বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ শিল্পী। কিন্তু তাদের উচ্চমানের চিত্রকর্ম এখনো আন্তর্জাতিক নিলাম বাজারে খুব কম দেখা যায়। ক্রিস্টি’জে কামরুল হাসানের দুটি চিত্র ৭ হাজার ডলারেরও কম দামে বিক্রি হয়েছে।
১৯৫০-৬০-এর দশকে ঢাকা আর্ট ইনস্টিটিউটে সৃষ্টিশীলতার একটি বিপ্লব ঘটলেও আন্তর্জাতিক মহলে বাংলাদেশী শিল্প এখনো তেমন পরিচিত নয়। সে কারণে তাদের চিত্রকর্ম আন্তর্জাতিক বাজারে যায় না। ঢাকার একজন সংগ্রাহক দুর্জয় রহমান বলেন, ‘আপনি এমন কিছু কিনতে পারবেন না, যা আপনি চেনেন না।’ পশ্চিমে বাংলাদেশী শিল্পের উল্লেখযোগ্য কোনো প্রদর্শনী হয়নি, ইংরেজিতে প্রকাশনাও খুব সীমিত। সে কারণে তারা আগ্রহ বোধ করেন না।
বাংলাদেশের সরকারি গুদামে এখনো বহু গুরুত্বপূর্ণ শিল্পকর্ম পড়ে আছে। এছাড়া শিল্প-সংস্কৃতির প্রচারেও খুব বেশি কাজ হচ্ছে না। সে কারণে এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে বলে সাইরাস মনে করেন। এছাড়া স্বাধীনতার আগে তৈরি হওয়া বহু শিল্পকর্ম পাকিস্তানের ব্যক্তিগত সংগ্রহে থেকে গেছে, যেগুলো আর বাংলাদেশের শিল্পজগতে যুক্ত নয়। সাইরাস জানাচ্ছেন, নিলামে জয়নুল আবেদিনের রেকর্ড গড়া কয়েকটি কাজ এসেছে পাকিস্তানি সংগ্রহ থেকে।
তবে প্রশ্ন ওঠে, বাংলাদেশী শিল্পকর্ম গুরুত্ব পাওয়ার বিষয়টি কি সাময়িক এক উচ্ছ্বাস, নাকি সত্যিই নতুন এক বাজার গড়ে উঠছে? দুর্জয় রহমানের মতে, ‘জয়নুল আবেদিনের মূল্য এখনো দক্ষিণ এশীয় অন্যান্য শিল্পীর তুলনায় কম। তার শিল্প ঐতিহাসিক গুরুত্ব বিবেচনায় এটা আরো বাড়া উচিত।’
ভবিষ্যতে এ প্রবণতা অন্য বাংলাদেশী শিল্পীদের ক্ষেত্রেও ছড়াবে কিনা সেটাই দেখার বিষয়। কেননা ঢাকা ও করাচিতে এখনো বাংলার বহু আধুনিক শিল্পকর্ম রয়ে গেছে, যা বিশ্ববাজারে আসার অপেক্ষায়।
— আর্ট নিউজপেপারে প্রকাশিত সাইরাস নাজি’র নিবন্ধ অবলম্বনে ফিচার ডেস্ক










