শিল্পকর্ম মূলত শিল্পীর প্রত্যক্ষ দর্শন অথবা পরোক্ষ অনুভবের ফসল। কথাটি আরো স্পষ্ট হয়ে ওঠে সম্প্রতি ঘটে যাওয়া ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান ও পরবর্তী সময়ের দিকে তাকালে। একটি যন্ত্রণাদগ্ধ কাল উত্তরণের প্রয়াস ফুটে উঠেছে শিল্পীর তুলিতে। ছাত্র আন্দোলনের মাধ্যমে ঘটে যাওয়া জুলাই বিপ্লব বা গণ-অভ্যুত্থান নিয়ে অনেক শিল্পকর্ম সৃষ্টি হয়েছে। দেশের বিভিন্ন স্থানে সেগুলো প্রদর্শনও হয়েছে।

১৫ নভেম্বর রাজধানীর ধানমন্ডির বেঙ্গল শিল্পালয়ে ১০ জন শিল্পীর শিল্পকর্ম নিয়ে আয়োজন করা হয়েছে আরো একটি চিত্রপ্রদর্শনী। যার শিরোনাম ‘‌বডি অ্যান্ড দ্য ম্যাপ’ বা ‘শরীর ও মানচিত্র’। এ শিল্পগৃহের লেভেল চারে প্রবেশ করতে প্রথমে চোখে পড়ল শিশুদের খেলনার একটি ভাস্কর্য। জুলাই বিপ্লবে উত্তপ্ত দেশ। সে জটিল জরাগ্রস্ত সময়ে নিজ বাড়ির ছাদে আপন মনে খেলতে থাকা কোমলমতি শিশুরও প্রাণ কেড়ে নেয় ঘাতকরা। সে নিষ্পাপ শিশুর স্মৃতির স্মারক হিসেবে গড়া হয়েছে খেলনার ভাস্কর্যটি। শিল্পকর্মটি গড়েছেন আফসানা শারমিন। তার মোট পাঁচটি কাজ এখানে স্থান পেয়েছে।

গ্যালারির প্রবেশমুখ পেরিয়ে চোখে পড়ল দেয়ালে ঝুলে থাকা আটটি স্ক্রলের চিত্রকর্ম। ব্যতিক্রমী এ চিত্রভাষার রূপকার ফারজানা আহমেদ। শিল্পী লম্বা কাগজে আক্রান্ত দেহ এঁকেছেন, যা অত্যধিক প্রাসঙ্গিক শরীর ও মানচিত্র নামকরণের বেলায়। তার কাজগুলো দেখে আমাদের অনুভূতির পাঁজর ভেদ করে দেয়। কী একটা দুঃসহ সময়! যা শিল্পভাষায় ধারণ করা হয়েছে।

শিল্পী এ. এছেন বেশকিছু কাজ এখানে রয়েছে। তার কাজগুলো উডকাঠে করা। শিল্পকর্মগুলো আমাদের বিষাদগ্রস্ত করে তোলে। রক্ত রঙ হয়ে ঝরে পড়েনি বরং শিল্পীর ক্যানভাস হয়ে উঠেছে। এছেন আরো একটি রোল করা ব্যান্ডিজের কাপড়ে দেশের মানুষের চিত্র তুলে ধরেছেন।

রিপন সাহার কয়েকটি কাজ পাশাপাশি রয়েছে। যে কাজগুলো আন্দোলনের সে রক্তচক্ষু উপেক্ষার প্রতিভাস হয়ে উঠেছে। প্রতীকী হিসেবে মানুষের মাথার ওপরে রাখা আঙুল, যা শাসককে বোঝানো হয়েছে। তবু মানুষ দৌড়াচ্ছে। ছুটে চলা মানুষের গল্প তুলে ধরেছেন ক্যানভাসে।

পুরনো পত্রিকার কোলাজে আন্দোলনের দৃশ‍্যপট ফুটিয়ে তুলেছেন পলাশ ভট্টাচার্য। যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন সময়ে আন্দোলনকারীরা কোন কোন পদ্ধতি ও কৌশল অবলম্বন করে সামনে এগিয়ে গেছে শিল্পী সেসব গল্প মুনশিয়ানার মাধ্যমে তুলে ধরেছেন কাজগুলোয়। আয়োজন নিয়ে আলাপ হয় শিল্প সমালোচক মোস্তফা জামানের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘‌এ প্রদর্শনীর একটি দিক এখানে যাদের কাজ আছে, তারা সবাই একাডেমিক চর্চার বাইরে গিয়ে ছবি আঁকেন। শিল্পকে এমন হতে হবে, এ ধারণায় বিশ্বাসী নন এরা। আরেকটি দিক রাজনৈতিক পটপরিবর্তন। সমাজের নতুন চিন্তার ঢেউ প্রথমে এসে লাগে শিল্পকলায়।’

কথা হয় এ প্রদর্শনীর কিউরেটর শার্মিলি রহমানের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘আমরা জুলাইয়ের ছাত্র-জনতার আন্দোলনের পরবর্তী সময়ে দাঁড়িয়ে যাপিত জীবনের মনস্তাত্ত্বিক দৃশ্যপটে, যা সমষ্টিগতভাবে প্রতিফলিত হচ্ছে তারই একটি প্রতিরূপ হিসেবে এ প্রদর্শনী উপস্থাপনা করছি। এখানে স্মৃতিকাতরতার চেয়েও যেটা সবচেয়ে প্রাধান্য পেয়েছে তা হচ্ছে আত্মবিনির্মাণ ও আত্মানুসন্ধান এবং সব কাঠামোগত চর্চার মোকাবেলা করার চেষ্টা।’

প্রদর্শনীটি মূলত সমাজ-সময়ের ভাষা ও ভাবের ব্যঞ্জনায় উদ্ভাসিত। প্রদর্শনীতে অংশ নেয়া শিল্পীরা হলেন রিপন শাহা, এ. এছেন, আফসানা শারমিন, আশাং মং, ফারজানা আহমেদ, মং মং শে, নিয়াজউদ্দিন আহম্মেদ, পলাশ ভট্টাচার্য, রাসেল রানা, রাজীব দত্ত। এখানে ঠাঁই পাওয়া শিল্পকর্মগুলো আমাদের চিন্তার গভীরে একটা বার্তা পৌঁছে দেয়। দৃষ্টিকে প্রসারিত করে নিয়ে যায় বাঁকবদলের প্রাক-মুহূর্তে। সাপ্তাহিক ছুটি রোববার বাদে বিকাল ৪টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত এ শিল্পপ্রাঙ্গণ। ‘শরীর ও মানচিত্র’ শীর্ষক প্রদর্শনী চলবে আগামী ২৮ ডিসেম্বর পর্যন্ত।