ইতালির শিল্পী মরিজিও কাত্তেলান আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে মাঝে মাঝেই শিরোনাম হন। ডাক্ট টেপ দিয়ে দেয়ালে একটি কলা আটকে রেখেছিলেন তিনি—সেই শিল্পকর্মই গত মাসে সথবি’স-এ ৬২ লাখ ডলারে বা প্রায় ৭৪ কোটি টাকায় বিক্রি হয়েছে। কিনে নিয়েছিলেন চীনা সংগ্রাহক ও ক্রিপ্টোকারেন্সির উদ্যোক্তা জাস্টিন সান। পরে তিনি কলাটি খেয়ে ফেলেন, সেটা ভিডিও করে বিশ্ববাসীকে দেখিয়েছেনও। সঙ্গে তিনি বলেছেন, এ যুগে আইডিয়াই গুরুত্বপূর্ণ, বস্তু নয়—শিল্পকর্মে কলা নতুন করে স্থাপন করা দিয়ে সেটাই বোঝা যায়। কাত্তেলানের এ আলোচিত কনসেপচুয়াল শিল্পের নাম ‘কমেডিয়ান’। এখানে শিল্পকর্মটি অটুট রাখতে সবসময়ই কলা বদল করতে হয়।
২০১৭ সালে যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অফিস গুগেনহেম মিউজিয়ামকে অনুরোধ করেছিল ভ্যান গঘের ‘স্নো’ শীর্ষক চিত্রকর্মটি হোয়াইট হাউজে প্রদর্শনের জন্য ধার দিতে। কিন্তু মিউজিয়াম কর্তৃপক্ষ রাজি হয়নি। বরং তারা হোয়াইট হাউজকে পরামর্শ দিয়েছিল যে তারা চাইলে কাত্তেলানের ‘আমেরিকা’ (২০১৬) শীর্ষক শিল্পকর্মটি নিতে পারে। এটি ছিল নিখাদ স্বর্ণ দিয়ে তৈরি করা একটি টয়লেট। স্বভাবতই হোয়াইট হাউজ এ প্রস্তাবে রাজি হয়নি। মিউজিয়াম কর্তৃপক্ষ বলেছিল, খুব দুর্লভ ঘটনা ছাড়া তারা ভ্যান গঘের চিত্রকর্মটি বাইরে নেন না। কিন্তু দেখা যায় হোয়াইট হাউজকে ফিরিয়ে দেয়ার পর তারা ইউরোপের চারটি প্রদর্শনীতে শিল্পকর্মটি পাঠিয়েছেন। মিউজিয়াম কর্তৃপক্ষের বিভিন্ন বিবৃতিতে এটা স্পষ্ট হয় যে কাত্তেলান ট্রাম্পের আমেরিকার সমালোচনা থেকেই ‘আমেরিকা’ শিল্পকর্মটি তৈরি করেন।

কাত্তেলানের স্বর্ণের টয়লেট নিয়ে কাণ্ড এখানেই শেষ হয়নি। কিছুদিন পর ব্রিটেনের এক ডিউক ‘আমেরিকা’ সংগ্রহের আগ্রহ প্রকাশ করেন। তিনি ব্রিটেনের অন্যতম অভিজাত প্রাসাদ অক্সফোর্ডশায়ারের ব্লেনহেম প্রাসাদে বাস করেন। এটা ছিল ডিউক অব মার্লবোরোর ম্যানশন। উইনস্টন চার্চিল এখানেই জন্মেছিলেন।
ব্লেনহেমের কিউরেটর কাত্তেলানের একটি প্রদর্শনীর আয়োজন করেছিলেন। ২০১৮ সালে তিনি গুগেনহেমকে অনুরোধ করেন ‘আমেরিকা’ ধার দিতে। গুগেনহেম রাজি হয়, তখন সেই স্বর্ণের টয়লেট চার্চিলের টয়লেট কক্ষে স্থাপন করা হয়। মরিজিও কাত্তেলানের শিল্পকর্ম নিয়ে ব্লেনহেম প্রাসাদে ‘ভিক্টরি ইজ নট অ্যান অপশন’ শিরোনামে প্রদর্শনীটি শুরু হয় ২০১৯ সালের ১২ সেপ্টেম্বর। কিন্তু দুদিন পরই বিপর্যয়! খুব সকালে চোর এসে চুরি করে নিয়ে যায় প্রদর্শনীতে স্থান পাওয়া স্বর্ণের টয়লেট। সঙ্গে পানির লাইন থেকে পানি বের হয়ে অনেক ঘর ভেসে যায়। এরপর কাত্তেলানের এ শিল্পকর্মের আর কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি। অনেকেই মনে করেন এটা গলিয়ে ফেলা হয়েছে। এতে ছিল ১০৩ কেজি স্বর্ণ, যার দাম প্রায় ১০৭ কোটি টাকা। অবশ্য এ বছর এপ্রিলে এ চুরির সঙ্গে জড়িত বলে একজনকে শনাক্ত করা হয়েছে। ফেব্রুয়ারিতে তাকে আদালতে তোলা হবে।
ভ্যান গঘের ‘স্নো’ বিদেশে বিভিন্ন প্রদর্শনী শেষে আবার নিউইয়র্কের গুগেনহেমে ফিরে এসেছে। ছবিতে দেখা যায় একজন পুরুষ একটি কুকুরকে সঙ্গে নিয়ে বরফ ঢাকা মাঠের মধ্য দিয়ে দূরের এক খামারবাড়ির দিকে এগিয়ে চলেছেন। ভ্যান গঘ ছবিটি এঁকেছিলেন ১৮৮৮ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি। তিনি তখন ফ্রান্সের দক্ষিণাঞ্চলে অবস্থান করছিলেন। সেদিন নিশ্চয়ই ভ্যান গঘ ভাবেননি তার এ ছবি রাখার অনুরোধ করবেন আমেরিকার প্রেসিডেন্ট।
কাত্তেলানের সেই কলার শিল্পকর্মের পরিণতি কেমন হলো? কাত্তেলান তার এ শিল্পকর্মের তিনটি সংস্করণ করেছেন। ২০১৯ সালে প্রতিটি বিক্রি হয় ১ লাখ ২০ হাজার ডলার করে। তাদের একটি পুনরায় বিক্রি হয় সথবি’স-এ ৬২ লাখ ডলারে। আরেকটি আছে একজনের ব্যক্তিগত সংগ্রহে। তৃতীয়টি দান করা হয়েছে গুগেনহেম মিউজিয়ামকে। দিন শেষে এত কিছুর পর অনেক শিল্প সমালোচক বলছেন, কাত্তেলানের ‘আমেরিকা’ হারালেও ‘কমেডিয়ান’কে পেয়েছে গুগেনহেম!
সূত্র ও ছবি: দি আর্ট নিউজপেপার










