শিশির ভট্টাচার্য রেখানির্ভর চিত্রকলায় শিল্পভাষ্যের এক অনন্য উচ্চতা ছুঁয়েছেন। তিনি শব্দের চেয়ে বেশি বিশ্বাস করেন রেখাকে আর প্রতিবাদের চেয়ে ধ্যানমগ্নতা দিয়ে সময়কে চিহ্নিত করেন। রেখা নির্মিত তার সে অন্তর্জগতে নেই বাহুল্য, নেই চিৎকার। তবে ব্যঙ্গচিত্রের মাধ্যমে তিনি উন্মোচন করেছেন সমাজের মুখোশ। চার দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি যেমন ছিলেন চারুকলার অধ্যাপক তেমনি ছিলেন সংবাদপত্রের প্রথম পাতায় ব্যঙ্গচিত্র আঁকা শিল্পীদের একজন পথিকৃৎ।
শিল্পী শিশির ভট্টাচার্যের আত্মদর্শনের অন্বেষণ কখনো কলমে, কখনো কালি বা মার্কারে, কখনো স্কেচবুকে উঠে এসেছে। এভাবেই রেখাচিত্রের শিল্পভাষ্যে তিনি ফিরে গেছেন নিজের ভেতরে। এ শিল্পযাত্রারই এক নিঃশব্দ প্রকাশ ঘটল ৫ সেপ্টেম্বর বিকাল ৫টায়। শহরের কোলাহল থেকে খানিকটা দূরে ঢাকার লালমাটিয়ায় শিল্পের আশ্রম কলা কেন্দ্রে শুরু হলো শিশির ভট্টাচার্যের বহু প্রতীক্ষিত একক প্রদর্শনী—‘রেখাচিত্র’, যা চলবে ২৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত।
এ প্রদর্শনীতে কোনো আলাদা শিরোনাম নেই। কেননা নামকরণ নিয়ে তিনি ১৫ দিন ভাবলেও শেষে দেখলেন রেখাই বলছে সব। তার ভাষায়, ‘ব্যাখ্যা দিতে ইচ্ছে হয় না। কারণ যা বলার রেখাগুলোই বলেছে।’ আর এ বাক্যই যেন এ প্রদর্শনীর সারমর্ম।
উদ্বোধনী দিনে গ্যালারির ভেতরে-বাইরে চাপা উচ্ছ্বাস, মানুষের ভিড় আর শিল্পপ্রেমীদের চোখে একধরনের প্রত্যাশার দীপ্তি! উপস্থিত ছিলেন শিল্পী রফিকুন নবীসহ বহু শিল্পপ্রেমী, ছাত্র-ছাত্রী, সহকর্মী। এদিন শিল্পী নিজেই যেন নিজের শিল্পের ছায়া—সংযত, গভীর, অথচ স্পষ্ট।
এর আগে শিল্পীর সর্বশেষ একক প্রদর্শনী ছিল ২০১৩-তে ‘রং-তামাশা’। দীর্ঘ এক যুগ পরে করা প্রদর্শনীটিতে রয়েছে ৯৫টি রেখাচিত্র, ১৯৯০ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত সময়ের কাজ। এর আগের প্রদর্শনীতেও রেখার আধিপত্য ছিল, তবে সেখানে ছিল তীব্রতা, প্রতিবাদ। অন্যদিকে ‘রেখাচিত্র’ যেন আরো নীরব, আরো ধ্যানমগ্ন। বাস্তবের যুক্তি ভেঙে অবচেতনের ভাষা দিয়ে তিনি তৈরি করেছেন এক পরাবাস্তব দৃশ্যপট, যেখানে দর্শক শুধু ছবি দেখেন না, শিল্পীর অন্তর্জগতে প্রবেশ করেন।

এ প্রসঙ্গে বণিক বার্তার সঙ্গে আলাপচারিতায় শিল্পী জানালেন, ‘দাগ-তামাশা’র আগে আমার কিছু সিরিজ ছিল, যেমন—‘নায়কের গল্প হতে পারতো’, ‘খেলা দেখে যান বাবু’, ‘দি পিকচার’, ‘লাইনস্ অ্যান্ড লিরিকস্’। সবগুলোতেই আমার একধরনের প্রকাশভঙ্গি ছিল। আমার বিদ্রূপ বা ব্যঙ্গ এগুলো মূলত উচ্চবিত্ত একটা শ্রেণীকে নিয়ে যারা শুধু নিজের স্বার্থই দেখে। আর এ ধারায় কাজ আমার আদর্শগত বা স্বভাবগত।’
তার শিল্পে রয়েছে রাজনৈতিক রসবোধ, সাংস্কৃতিক বিশ্লেষণ এবং একধরনের নীরব প্রতিবাদ যা কখনো তীব্র, কখনো ধ্যানমগ্ন। তার কাজ শুধু দৃশ্য নয়, তা দর্শকের সঙ্গে শিল্পীর এক গভীর সংলাপ। শিল্পী বলেন, ‘প্রদর্শনীর জন্য যে এগুলো তৈরি করা, তা নয়। যা মাথায় এসেছে, যখন যেমন লেগেছে; স্কেচবুকে, নোটপ্যাডে, কখনো কলমে, কখনো কালি বা মার্কারে এঁকেছি।’
চার দশকের শিল্পচর্চায় এত কাজ, এত খ্যাতি—তবু প্রদর্শনী আয়োজনের ক্ষেত্রে যেন তিনি এক অনিচ্ছুক সাধক। প্রশ্ন করতেই শিল্পী বললেন, ‘আমার স্বভাবজাত চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য যা, তাতে আয়োজন করে এসব আলাদা রাখা কঠিন কাজ। একক প্রদর্শনী গোছানো এক বড় আয়োজন। আমি বেশ বড় বড় কাজ দিয়ে প্রদর্শনী করার চেষ্টা করতাম; যা সময়ের ব্যাপারও বটে। “দাগ-তামাশা”র এক যুগ পর “রেখাচিত্র” হয়তো হতো না, যদি ওয়াকিল ভাই আমাকে বারবার তাগাদা না দিতেন।’
আয়োজকরা জানালেন, শিশিরের মতো শিল্পীর দীর্ঘদিনের মৌলিকতা, নির্মাণ ও দৃষ্টিভঙ্গিকে তরুণ প্রজন্মের সামনে তুলে ধরতে পারাটা গর্বের। আর জনসমাগমের ভিড়ই বলে দেয়, প্রদর্শনীটি কতটা আকাঙ্ক্ষিত ছিল।
কলা কেন্দ্রের পরিচালক শিল্পী ওয়াকিলুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, “শিশির ভট্টাচার্যের ড্রয়িংয়ে অনন্য দক্ষতা, রাজনৈতিক রসবোধ ও সাংস্কৃতিক গভীরতা বাংলাদেশের শিল্পচর্চায় তাকে আলাদা করে। রেখাচিত্র প্রদর্শনী তার আত্মপ্রকাশের ভাষা; যেখানে মৌলিকতা, নিজস্বতা ও দীর্ঘদিনের শিল্পযাত্রা তরুণ প্রজন্মের কাছে তুলে ধরা হয়েছে।’
তার মতে, এত পরিচিতি ও কাজের পরও ৪০-৪৫ বছরের বহুমাত্রিক ও বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারে মাত্র পাঁচটি একক প্রদর্শনী শিশিরের শিল্পীসুলভ অনিচ্ছারই প্রতিফলন—কলা কেন্দ্র হল ১০ বছর যাবৎ শিল্পী দ্বারা পরিচালিত শিল্পীদেরই একটি গ্যালারি। এর পরিচালনা ও আয়োজনের সঙ্গে শিশির নিজেও সরাসরি জড়িত। সে জায়গা থেকে দীর্ঘদিনের নানা অনুরোধ, চেষ্টার সফল প্রয়াসই হলো রেখাচিত্রের একক প্রদর্শনী।”
ড্রয়িংয়ের খেরোখাতায় কি শিশিরের সিগনেচার? উত্তর আসে, ‘আমি যেহেতু পত্রিকায় কার্টুন করতাম, তখন বুঝেছি ‘সেলফ সেন্সরশিপ’ বলে একটা ব্যাপার থাকে। আমরা যখন কিছু প্রকাশ করি, নিজে নিজেই গুছিয়ে করি। তাই সিগনেচার স্টেটমেন্ট পুরোপুরি বলা যায় না।’
তবে তিনি এও যোগ করেন, ‘যা আমি বলি, করি বা প্রকাশ করি—তা অন্য কেউ পারবে বলে মনে হয় না। সেই অর্থে ‘সিগনেচার’ শব্দটা ঠিকই।’
সবিশেষ এ প্রদর্শনী শিল্পীর স্মৃতির ভেতর এক অনন্য উপলব্ধির জন্ম দিয়েছে। এছাড়া রেখাচিত্রে তার অবচেতনের ভাষা যেন বাস্তবের লজিক ভেঙে ফেলার সাহস। অন্তর্জাগতিক এক সংলাপে শিশির ভট্টাচার্য যেন নিজের আত্মদর্শনের যাত্রা খুঁজে পেয়েছেন। আর আমরা পেয়েছি এক শিল্পীর অন্তরগ্রন্থি ভাষ্য—নিঃশব্দ অথচ অভাবনীয় রকম গভীর।










