শিল্পকর্ম সংগ্রহের বিষয়টি ব্যক্তিগত অভিরুচির ওপর নির্ভর করে। এক্ষেত্রে সঠিক কোনো মানদণ্ড নেই। ইতালির ফ্লোরেন্সে অবস্থিত গ্যালারি গ্যালেরিয়া ইল পন্টের পরিচালক আলবার্তো বেমার মনে করেন, সংগ্রাহকদের এমন শিল্পকর্ম বেছে নেয়া উচিত যা তাদের রুচি ও অনুভূতির সঙ্গে মেলে। তারা সত্যিকার অর্থেই যা ভালোবাসেন শুধু তা-ই কেনা উচিত। শিল্প সংগ্রহ ব্যক্তির শৈলী ও মূল্যবোধকে প্রতিফলিত করা উচিত, তা হোক ঘর সাজানোর জন্য বা দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের জন্য। বিশ্বজুড়ে অসংখ্য শিল্পী ও বিক্রেতা থাকায় বিকল্পও অনেক। যা নতুন সংগ্রাহকদের জন্য বিভ্রান্তিকর হতে পারে, পাশাপাশি ভুল করার সম্ভাবনা বাড়িয়ে দিতে পারে। তাই শিল্পকর্ম সংগ্রহে নতুনদের অবশ্যই সম্ভাব্য ভুল সম্পর্কে ধারণা রাখা এবং সেসব এড়িয়ে চলা জরুরি।

শিল্পী ও শিল্পকর্ম সম্পর্কে ধারণা না থাকা

একটি শিল্পকর্ম কেনার মানে শুধু এই নয় যে অর্থের বিনিময়ে তা নিজের করে নেয়া। বরং শিল্পীর গল্প ও শিল্পকর্মের অন্তর্নিহিত অর্থও অনুধাবন এক্ষেত্রে জরুরি। কারণ এর ব্যত্যয় ঘটলে শিল্পকর্মের সঙ্গে নিজের সংযোগ স্থাপন সম্ভব নাও হতে পারে। নিউইয়র্কভিত্তিক গ্যালারি মালিক হলিস ট্যাগার্ট বলেন, কেনার আগে একজন সংগ্রাহককে অবশ্যই কিছু বিষয়ে গবেষণা করতে হবে। তারা কি সত্যিই শিল্পকর্মটি পছন্দ করছেন, তাদের ঘর বা গ্যালারির সঙ্গে এটি কতটা মানানসই হচ্ছে, শিল্পী সম্পর্কে পর্যাপ্ত ধারণা আছে কিনা ইত্যাদি বিষয় আমলে নেয়া যেতে পারে। এছাড়া বেশি বেশি গ্যালারি পরিদর্শন, শিল্পীদের সঙ্গে সাক্ষাৎ ও বিভিন্ন অনলাইন প্লাটফর্মের মাধ্যমে জ্ঞান সমৃদ্ধ করার পরামর্শ দিয়ে থাকেন বিশেষজ্ঞরা।

9

ভুল পরামর্শ মেনে চলা

নতুন সংগ্রাহকরা প্রধান যে ভুল করেন তা হলো উপযুক্ত পরামর্শ অনুসরণ না করা। তাছাড়া বর্তমান নিলাম মূল্যের সঙ্গে তুলনা করে বর্তমান ধারা বা জনপ্রিয়তার বিচার করেন। এতে অনেক ক্ষেত্রেই নিজের জন্য উপযুক্ত নয় এমন শিল্পকর্ম কিনে থাকেন নতুন সংগ্রাহকরা। তাছাড়া শুধু অন্যের মতামতের ওপর নির্ভর করে যেকোনো ক্রয়-পরবর্তী সময়ে আফসোসের কারণ হতে পারে। কারণ একেকটি শিল্পকর্ম যথেষ্ট মূল্যের হয়। এজন্য নিয়মিত অভিজ্ঞ সংগ্রাহক ও গ্যালারিগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক ভালো রাখা জরুরি। এতে শিল্পী, শিল্পকর্ম, বর্তমান ধারা ও দাম সম্পর্কে ভালো ধারণা পাওয়া যাবে।

শিল্পকর্মের ব্যবহারিক দিক উপেক্ষা করা

সংগ্রাহকদের শিল্পকর্ম কেনার আগে কোথায় রাখবেন তা ভেবে দেখা জরুরি। ব্রুকলিনভিত্তিক সংগ্রাহক আন্তোনিও ভালভার্দে একবার একটি বড় পেইন্টিং কিনেছিলেন। পেইন্টিংটি তার অ্যাপার্টমেন্টে আঁটছিল না। তিনি মূলত ভবিষ্যতের জন্য ইতিবাচক বিনিয়োগ হিসেবে ওই শিল্পকর্ম কেনেন। তাছাড়া আকারের পাশাপাশি ব্যবহারিক দিকও গুরুত্বপূর্ণ। নাজুক ভাস্কর্য ব্যস্ততম কোনো করিডোরে রাখা মোটেই ঠিক হবে না। আর ফ্রেমবিহীন তেলচিত্র শিশুদের ঘরের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। কোনো সংগ্রাহকের ঘরে যদি পোষা প্রাণী থাকে তাহলে অবশ্যই শিল্পকর্মের উপযুক্ত সুরক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে। নিজের ঘরে বা নির্দিষ্ট কোনো স্থানে শিল্প রাখা ও প্রদর্শনের জন্য নিরাপত্তা, সুরক্ষা ও প্রতিকূল পরিবেশের বিষয়টি নিয়ে যাচাই-বাছাই করা জরুরি।

শিল্পকর্মের উৎস সম্পর্কে জিজ্ঞাসা না করা

একটি শিল্পকর্ম আসল কিনা বা এর শিল্পী ও পরবর্তী মালিকানা বুঝতে উৎসগত তথ্য জানা জরুরি। কারণ শিল্পকর্ম বেশ কয়েকবার হাতবদল হতে পারে। নতুন সংগ্রাহক যদি সরাসরি শিল্পীর কাছ থেকে কোনো শিল্পকর্ম কিনে থাকেন তাহলে তিনি হবেন এর প্রথম মালিক। সেক্ষেত্রে খুব একটা যাচাইয়ের প্রয়োজন হয় না। তবে হাতবদল হওয়া অর্থাৎ সেকেন্ডারি মার্কেট থেকে কিনলে অবশ্যই প্রথম মালিক ও শিল্পী সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য জেনে নিতে হবে। বিশেষ করে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে তৈরি শিল্পকর্মের ক্ষেত্রে বেশি সতর্ক হওয়ার পরামর্শ দেন বিশেষজ্ঞরা। কারণ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় অনেক শিল্পকর্ম লুট ও কম মূল্যে বিক্রি করা হয়। উৎস ও দাম সম্পর্কে নিশ্চিত হতে নির্ভরযোগ্য গ্যালারির সঙ্গে যোগাযোগ করা যেতে পারে। তাছাড়া বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে শিল্পকর্ম যাচাই ও নিলামের তথ্য বিভিন্ন অনলাইন মাধ্যমকে পরখ করা সম্ভব।

সিদ্ধান্ত নিতে তাড়াহুড়ো করা

তড়িঘড়ি সিদ্ধান্ত নেয়া নতুন সংগ্রাহকদের জন্য বড় ভুল হতে পারে। একটু সময় নিয়ে ঠিকমতো যাচাই করে ক্রয়ের সিদ্ধান্ত নেয়া জরুরি। যদিও অনেক সময় শিল্পজগতে কোনো একটি শিল্পকর্ম কেনার ক্ষেত্রে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেয়ার চাপ আসতে পারে। সেক্ষেত্রে অভিজ্ঞ কারো পরামর্শ নেয়া যেতে পারে। প্রতিটি সংগ্রহের মাধ্যমে নিজের পছন্দ ও অভিজ্ঞতাকে শাণ দেয়ার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রে আত্মবিশ্বাস অর্জন করা সম্ভব। অনেক সময় দেরি করার কারণে ভালো একটি শিল্পকর্ম হাতছাড়া হতে পারে। তবে ভুল সিদ্ধান্ত নেয়ার চেয়ে তা অনেক ক্ষেত্রেই ইতিবাচক হতে পারে। এজন্য নিজের সামর্থ্য ও অভিরুচি বিবেচনায় নিয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া দরকার।