চিত্রশিল্পী শহিদ কবীরের জন্ম ১৯৪৯ সালে। ১৯৬৪ সালে ঢাকা আর্ট কলেজে ভর্তি হন। লেখাপড়া শেষে ১৯৭৩ সালে সেখানে শিক্ষকতায় যোগ দেন। ১৯৮৩ সালে চাকরি ছেড়ে চলে যান স্পেনে। তার ছবিতে বাংলার মাটি, পরিবেশ, প্রান্তিক মানুষের সহজ-সরল গল্প জীবন্ত হয়ে ওঠে। লালন সিরিজের ছবি দেশে-বিদেশে প্রশংসিত। নিজের জীবন, চিত্রকর্মের বিষয় ও প্রেরণা নিয়ে সম্প্রতি কথা বলেছেন নভেরার সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন বাশার খান
আপনার বাবা ছিলেন দারোগা। তখনকার সমাজে দারোগা মানে কঠোর ও প্রভাবশালী ব্যক্তি। দারোগার ছেলে থেকে প্রখ্যাত চিত্রশিল্পী—আপনার এ জার্নির গল্পটি জানতে চাই।
আমার বাবা চাইতেন আমি পুলিশ ইন্সপেক্টর হই। তখনকার দিনে দারোগা মানে গ্রামের রাজার মতো—শক্তিশালী, ইনফ্লুয়েনশিয়াল। আমার পাঁচ ভাই ছিল। বাবা সবসময় চাইতেন আমি যেন হেডমাস্টারের ছেলে, ডাক্তারের ছেলে বা এ রকম পরিবারের ছেলেদের সঙ্গে মিশি। কিন্তু ছোটবেলা থেকেই কেন যেন আমি কৃষক, মুচি, মেথর—প্রান্তিক মানুষের সঙ্গে বেশি মিশতাম। ওদের সঙ্গ, ওদের খাবার, ওদের জীবন আমাকে বেশি টানত। আমার মনে হয় আমার ছবির ভেতরে যে মাটির গন্ধ, তার শুরু ওইখান থেকেই। আমার পরিবারে মা সুঁই-সুতোর কাজে খুব দক্ষ ছিলেন। বড় বোনও আঁকতেন, এক ভাই চারুকলা থেকে পাস করে অধ্যাপনা করতেন। কিন্তু সাধনা হিসেবে আজও একমাত্র আমিই ছবি আঁকা চালিয়ে যাচ্ছি।
বলা হয়, শিল্পকর্মে ছলচাতুরীর জায়গা নেই। এটা অন্যান্য ক্ষেত্রে কমবেশি থাকলেও শিল্পমাধ্যমে সে সুযোগ নেই। এখানে সম্পূর্ণ নিষ্ঠা, পরিশ্রম ও গুরুত্বের সঙ্গে কাজ করতে হয়। আপনার দৃষ্টিতে এর ব্যাখ্যা কী?
আমি মনে করি একজন শিল্পীর তিনটি জিনিস থাকা খুব প্রয়োজন—সততা, ভেতরের শিশু ও একটা আদিম মন। শিশু আর আদিম মানুষ খুব সৎ হয়—ঠিক তেমনই শিল্পীকে সৎ থাকতে হয় নিজের প্রতি, নিজের শিল্পের প্রতি। আর্ট কোনো প্রফেশন না, এটা ভোকেশন। এর প্রতি শ্রদ্ধা থাকতে হয়। একজন শিল্পীর কাজ শুধু ছবি আঁকা নয়। তাকে দেশের প্রতি, মানুষের প্রতি, প্রাণীর প্রতি দায়বদ্ধ হতে হবে। এমনকি সেটা কুকুর-বিড়ালের প্রতিও। পৃথিবীতে বিখ্যাত যারা ছবি এঁকেছেন, গান গেয়েছেন ও লিখেছেন তারা সেই দায়িত্ব পালন করে গেছেন। এমনকি লালনও। নিজে লাঠি হাতে নিয়ে ব্রিটিশ শাসনের অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে গেছেন। শিল্পকলা একাডেমিতে বাউলশিল্পীদের অনুষ্ঠান থেকে একজন শিল্পীর একটি লাইন আমাকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছিল। সেই বাউলশিল্পী বলেছিলেন, ‘সৃষ্টিকর্তা মানুষকে একটা প্রদীপ জ্বালিয়ে দেয়। যদি সে সততা ও সাধনায় সেই আলোকে অন্য মানুষের মধ্যে বিতরণ না করে, একসময় সৃষ্টিকর্তা এসে সেই প্রদীপ নিয়ে নেন।’

আপনি শুরু করেছিলেন বিমূর্ত ছবি দিয়ে। পরে কীভাবে নিজের ধারা খুঁজে নেন?
চারুকলায় পড়ার পর প্রথম পাঁচ বছর বিমূর্ত কাজ আমাকে ভীষণ প্রভাবিত করেছিল। রঙ, ফর্ম, স্পেস—এসব মোটামুটি বোঝার পর মনে হলো বিমূর্ত দিয়ে আমি সব বলতে পারছি না। নিজের জিনিস খুঁজতে হবে। তখন খোঁজা শুরু করলাম—আমার অতীত, মাটি, আমার লোকঐতিহ্য, কাঁথা, পট ও গ্রামের গল্প। যেখানে আমি মিশেছি মুচি-কাশি-চাষার সঙ্গে, সেখান থেকেই আমার ছবির শুরু। ২০১৪ সালে একবার বরিশালে এক বুড়ো চাচার ছবি আঁকলাম। তার চোখ হলুদ—মানে জন্ডিস। তিনি বললেন, ‘আমি নাও বাঁচতে পারি। কিন্তু সরকারের প্রতিশ্রুতি দেয়া হাসপাতাল বানানো হয়নি।’ এ গল্প আমাকে এতই স্পর্শ করেছিল যে সেই ছবির নাম দিয়েছিলাম, ‘রানী, আমার ওষুধ কই?’ ছবিটি বেঙ্গল গ্যালারিতে আমার বড় প্রদর্শনীতে ছিল। তখন অনেকে আমাকে প্রশ্ন করেছিল, এই রানী আসলে কে? এখানে রানী মানে শেখ হাসিনা। এ ধরনের প্রান্তিক গল্পই আমার ছবিকে গড়ে দেয়। এটা ইচ্ছা করে নয়, ভেতর থেকে আসে। শিল্পীর সবচেয়ে বড় শক্তি হলো দর্শন—মানে দেখা। দেখা থেকেই দর্শন তৈরি হয়। শিল্পী যেভাবে দেখে, সেভাবেই তার অনুভব জন্ম নেয়।
আপনার শিল্পকর্মে বাউল সাধক ফকির লালন সাঁইয়ের সংগীত, আধ্যাত্মিক দর্শন ও মর্মবাণী প্রতিফলিত। টেম্পেরায় করা বাউল সিরিজের চিত্রকর্ম চিত্রানুরাগীদের মুগ্ধ করেছে। সম্প্রতি লন্ডনে আন্তর্জাতিক নিলামে লালন সিরিজের আপনার তিনটি চিত্রকর্ম ৫৩ হাজার ৩৪০ পাউন্ডে বিক্রি হয়, বাংলাদেশী মুদ্রায় যা প্রায় ৮৭ লাখ ৮৭ হাজার টাকা। চিত্রকর্মে লালনকে বেছে নেয়াটা ব্যতিক্রম। এর কারণ কী?
এটা ভাষায় বলা কঠিন। স্পিরিচুয়াল ইন্টেলেক্ট, শেখানো যায় না। আমি প্রথম লালনের গানের সুরে আকৃষ্ট হয়েছিলাম, পরে গানের কথায়। এরপর লালনের ব্যক্তিত্বে। ১৯৮০ সালের দিকে শিল্পী ফরিদা পারভিনের কণ্ঠে লালনের গান শুনে মুগ্ধ হই। ওনার এত সুন্দর কণ্ঠ যে আমাকে সাংঘাতিক মোহিত করেছে। তারপর গানের কথায় খেয়াল করে লালন সম্পর্কে ধারণা পাই। আমি এখনো শিখি। আমার যতটুকু জ্ঞান হয়েছে তা শুনে ও দেখে।
চিত্রকর্মে সুকান্ত ভট্টাচার্যের কবিতাকেও বেছে নিয়েছেন।
সুকান্ত আমাকে খুব আকৃষ্ট করেন। তার কবিতায় ‘ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময়, পূর্ণিমা চাঁদ যেন ঝলসানো রুটি।’ আমি তো এগুলো প্রতিদিন দেখি। আমাদের দেশে এখনো মানুষ রাস্তায় পড়ে থাকে, রাস্তায় খায়, রাস্তায় ঘুমায়। এখনো মানুষের খাবার, চিকিৎসা—কিছুই ঠিকমতো হচ্ছে না। বাস্তব তো একদম উল্টো। যে সরকারই আসুক, আগের মতোই থাকে। শুধু তেলে মাথায় তেল দেয়। হাসপাতাল দেখলেই বোঝা যায়, ডাক্তাররা সবাই প্রাইভেট হাসপাতালের দিকে ঝুঁকে আছেন। সরকারি হাসপাতালে ঠিকমতো চিকিৎসা নেই, ওষুধ নেই, গরিব মানুষের জন্য কোনো ব্যবস্থা নেই। সুকান্ত তো এ বাস্তবতাটাই বলেছেন। সেই থেকে রুটির ছবি এঁকেছি।
আপনার সিনিয়র বা সমসাময়িক শিল্পীদের সঙ্গে এমন কোনো বিশেষ স্মৃতি আছে, যা আপনাকে অনুপ্রাণিত করেছে কিংবা কষ্ট দিয়েছে?
হ্যাঁ, আছে। দেলোয়ার হোসেন আমার সিনিয়র ছিলেন। ডাকতাম দেলু ভাই। থাকতাম চারুকলার হোস্টেলে। তখন এর নাম ছিল আর্ট কলেজ হোস্টেল, বতর্মানে শাহনেওয়াজ হল। আমার বেশির ভাগ কাজই হতো জেলেপাড়া, রায়েরবাজারের কুমোরপাড়া, কুমারদের জীবন, গাবের রঙ, কালো জালের রঙ—এসব নিয়ে। অনেকে বলত আমি নাকি ছবিকে বেশি কালো করে ফেলি, কিন্তু দেলু ভাই আর মোহাম্মদ কিবরিয়া স্যার বলতেন, ‘ভালো লাগছে।’ দেলু ভাই আমাকে প্রায়ই উৎসাহ দিতেন। একদিন বলেন, ‘তুই এত ভালো কাজ করিস, একটু পড়াশোনা করিস না?’ বলি, ভাই, আমি দুই পাতা পড়লেই মনে হয়, এত বড় বই শেষ করব কীভাবে?
তখন তিনি বলতেন, ‘রাতে আমার রুমে আয়। আমি তোকে পড়ে শোনাব।’ তিনি আমাকে পড়াতেন অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘বাগেশ্বরী’—পঙ্ক্তিমালা বা বাণী। আজও একটি লাইন আমার হুবহু মনে আছে, যা শুনলে শরীর শিহরিত হয়—‘শিল্প ও কৃষ্টি মানুষের দৈনন্দিন ভাত-কাপড়-আহার জোগাড় করতে পারে না বটে, কিন্তু একটি জাতিকে আত্মহত্যা থেকে রক্ষা করতে পারে।’ বিদেশে বক্তৃতা দিতে গেলে এখনো আমি লাইনটি অনুবাদ করে শোনাই। তারা অবাক হয়ে যায় যে এই একটি বাক্য কত গভীর!
সত্যিই তো আমাদের বাঙালি জাতি আজও কত ঝুঁকিতে, আত্মবিধ্বস্ত। শিল্প-সংস্কৃতি ছাড়া একটি জাতি টেকে না। ভুটান, নেপাল—এদেরও ন্যাশনাল আর্ট গ্যালারি আছে। অথচ বাংলাদেশ এত কিছু করতে পারে—পদ্মা সেতু, ট্রেন, বড় বড় মেগা প্রজেক্ট—কিন্তু আজও একটি কনটেম্পোরারি ন্যাশনাল আর্ট গ্যালারি পর্যন্ত নেই। এটা সত্যিই লজ্জার।










