‘আমি তোমার জন্যে পথপ্রান্তে অশ্বত্থের মতো দাঁড়িয়ে থাকবো—’ প্রিয়তমার অপেক্ষার কথা বলতে গিয়ে এভাবেই গাছের প্রসঙ্গ টেনেছিলেন কবি রফিক আজাদ। গাছ প্রাকৃতিক ভাস্কর্য; ফলে সৃষ্টিশীল ব্যক্তি মাত্রই গাছের সঙ্গে সম্পর্ক অনুভব করে। কবি ও সাহিত্যিকদের লেখায় বারবার প্রাসঙ্গিক হয়েছে গাছ। নিজেদের মতো করে ক্যানভাসে গাছ এঁকেছেন শিল্পীরা। কখনো ব্যাকগ্রাউন্ড হিসেবে, আবার কখনো কেন্দ্রীয় চরিত্র হিসেবে গাছ মুগ্ধ করেছে চিত্রপ্রেমীদের।
বাংলাদেশের আধুনিক চিত্রকলার প্রথম দিকের তিন পুরোধা পুরুষ এস এম সুলতান, জয়নুল আবেদীন ও শফিউদ্দিন আহমেদ। এস এম সুলতানের চিত্রকর্মে গাছ তুলনামূলক বলশালী আকারে হাজির। বিশেষ করে জমি কর্ষণে যাত্রা ও শিরোনামহীনের (গ্রামের দৃশ্য) মতো চিত্রকর্মগুলোকে উল্লেখ করা যায় উদাহরণ হিসেবে। গাছ এখানে প্রাধান্য বিস্তারকারী চরিত্র। জয়নুল আবেদীনের সাঁওতাল দম্পতি চিত্রকর্মে ব্যাকগ্রাউন্ড হিসেবে রয়েছে গাছ। শফিউদ্দিন আহমেদের অন দ্য ওয়ে টু দ্য ফেয়ার এবং দুমকাতেও গাছ তৈরি করেছে অপার্থিব আবহ।

ভ্যান গঘ, ফ্রিদা কাহলো, অ্যানসেল অ্যাডামস, স্যালি মান ও ক্লদ মোনে গাছকে প্রধান চরিত্র করে ফুটিয়ে তুলেছেন। গাছ কেবল গাছ হিসেবেই থাকেনি। যুক্ত করেছে ভিন্ন অর্থ। কখনো নিঃসঙ্গতা ও নীরবতা আবার কখনো উচ্ছ্বাস ও কোলাহলকে ধারণ করেছে। এদিকটায় অ্যালেক্স ক্যাটস, গর্ডন পার্কস এবং মার্ক রথকোও দেখিয়েছেন মুনশিয়ানা। ফরাসি ইমপ্রেশনিস্ট চিত্রকর ক্লদ মোনে ও জার্মান চিত্রকর আলবেইত বিয়ারস্ট্যাডের কথা বিশেষভাবে বলতে হয়। উভয়েই প্রকৃতিকে ফুটিয়ে তুলেছেন। কখনো বাগান, কখনো পর্বত আর কখনো কেবল গাছ। আমেরিকান শিল্পী এলেক্স ক্যাটস প্রতিকৃতি আঁকার জন্য পরিচিতি অর্জন করলেও কিছু গাছের নিদর্শনও রেখে গেছেন মৌলিক স্বাক্ষর হিসেবে। আমেরিকান পেইন্টার রক্সি পেইন গ্রাফট নামে ভাস্কর্য তৈরি করেছেন; ভাস্কর্যটি মূলত পেইনের ‘ডেনড্রয়েডস’ নামে একটা সিরিজের অংশ।
হোরেস ভারনেট, জাঁ বাতিস্তা এবং দিয়াজের মতো বিখ্যাত চিত্রকররা বৃক্ষকে হাজির করেছেন নানা রূপে ও মাত্রায়। চিত্রকর জুলে দুপ্রে এঁকেছেন দ্য ওল্ড ওক। দ্যুপ্রে তার অধিকাংশ কর্মজীবনে বিভিন্ন প্রাকৃতিক দৃশ্য আঁকতেন, যার মধ্যে ছিল গাছপালাময় সমভূমি থেকে শুরু করে ঘন বনভূমি। তিনি বিশাল ওক গাছটির প্রতি শ্রদ্ধা দেখিয়ে চিত্রের কেন্দ্রে স্থাপন করেছেন। পাশে একটি ছোট ফিগার হেঁটে যাচ্ছে, যা গাছটির বিশালতা বোঝায়। ডাচ প্রাকৃতিক দৃশ্যের চিত্রশিল্পী জ্যাকব ভ্যান রুইসডেল তার বিশাল বৃক্ষ চিত্রায়ণের জন্য বিখ্যাত। তার ফরেস্ট সিন চিত্রকর্মে ডানপাশের সামনের অংশে ফাটা বার্চ গাছটি ক্ষণস্থায়ী জীবন ও মৃত্যুর অনিবার্যতাকে প্রতীকায়িত করে। হাডসন রিভার স্কুলের চিত্রশিল্পী থমাস কোলের টর্নেডো ইন অ্যান আমেরিকান ফরেস্ট একইভাবে তুলে ধরে বিষণ্ণতাকে। সেখানে ভেঙে পড়া এবং উপড়ে যাওয়া গাছগুলো থেকে টর্নেডোকে আন্দাজ করা যায়। বাম দিকে মনোযোগ দিয়ে দেখলে একটি ছোট ফিগার চোখে পড়ে, যাকে হয়তো বিশাল গাছগুলো রক্ষা করেছিল।
ফটোগ্রাফি শিল্পের অন্য এক রূপ। অনেক আলোকচিত্রী গাছকে ক্যামেরাবন্দি করেছেন। উনিশ ও বিশ শতকের ক্যামেরায় বাংলার জনপদের যে আলোকচিত্র পাওয়া যায়, স্বাভাবিকভাবেই তার বড় একটা অংশে গাছ হাজির। ভিয়েতনামি-আমেরিকান বিন দান প্রাকৃতিক দৃশ্যের সঙ্গে তার সংযোগকে খুঁজে পেয়েছিলেন। আলোকচিত্রী কার্লটন ই. ওয়াটকিনস তার বিখ্যাত গ্রিজলি জায়ান্ট সেকোইয়া গাছের ছবি তুলেছিলেন ক্যালিফোর্নিয়ায়। তার ছবি জাতীয় উদ্যান প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলেছিল। আনসেল অ্যাডামস প্রথম ক্যামেরা ব্যবহার করতে শুরু করেন ১২ বছর বয়সে, যখন তিনি ইয়োসেমাইটে গিয়েছিলেন। পরবর্তী সময়ে তার ফটোগ্রাফ যুক্তরাষ্ট্রে জাতীয় উদ্যান সম্প্রসারণের প্রচারণায় সাহায্য করেছে। সম্ভবত বৃক্ষের সবচেয়ে বিখ্যাত ছবিগুলোর একটি হলো স্যালি ম্যানের ডিপ সাউথ, আনটাইটেল্ড (স্কারড ট্রি)। ম্যান তার ক্যামেরা স্থির করেছিলেন গাছের কাণ্ডের দাগের দিকে। এ নিরাময় হয়ে গেলেও দৃশ্যমান ক্ষত মনে করিয়ে দেয় যে গাছগুলো ইতিহাসের নীরব সাক্ষী, স্মৃতির ধারক। চিত্রকর্মে আমেরিকান আলোকচিত্রী ম্যান ফরাসি আলোকচিত্রী গুস্তাভ লে গ্রের বিচ ট্রি, ফরেস্ট অব ফন্টেনব্লুকেও উল্লেখ করছেন।
আমেরিকান চিত্রশিল্পী সিলভিয়া প্লিম্যাক কয়েক দশক ধরে স্টুডিওর চারপাশের গাছের পর্যবেক্ষণ করেছেন। তার সুন্দর কাঠখোদাই করা দ্য নাট ট্রিজ চিত্রে দুটি গাছ দেখা যায়। এদিক থেকে বাস্তবতাবাদী চিত্রশিল্পী অ্যান্ড্রু ওয়াইথের দ্য ওক এতটাই বিশদ যে এটি একটি অঙ্কন বলে বিশ্বাস করা কঠিন। জলরঙ, গাউচ, কালি এবং গ্রাফাইট দিয়ে অঙ্কনে গাছের কাণ্ডটি এত উঁচু যে এর শীর্ষ অংশ দৃশ্যমান নয়। বেশিরভাগ চিত্রশিল্পী মার্ক রথকোর বিমূর্ত চিত্রকলার সঙ্গে পরিচিত, কিন্তু রথকো কিছু চিত্রকর্মও করেছিলেন গাছ নিয়ে। প্রিন্টমেকার জোসেফ নরম্যান বহু বৃক্ষ ও বনের কাজ করেছেন। শিল্পীর চিন্তায় গাছকে সামনে রাখার যে ঐতিহ্য, তা বর্তমান শিল্পীদের মধ্যেও সমানভাবে উজ্জ্বল।










