টানা কয়েকদিনের বৃষ্টিতে দেশ ভাসিয়ে আষাঢ় শেষ দিনে এসে ক্লান্ত হয়ে পড়ায় সূর্য যেন আবার আকাশের কর্তৃত্ব হাতে তুলে নিয়েছে। এ রকম দিনে বাইরে নাগরিক কোলাহল আর তপ্ত পিচঢালা পথ মাড়িয়ে ধানমন্ডি-লালমাটিয়ার ব্যস্ত সড়ক থেকে একটু দূরে ‘ভূমি গ্যালারি’র ভেতরে প্রবেশ করতেই যেন দৃশ্যপট বদলে যায়। নাকে লাগে সোঁদা মাটির ঘ্রাণ, কানে বাজে বৃষ্টির রিমঝিম শব্দ—না, সরাসরি বৃষ্টি কিংবা কাদার নয়; বরং ক্যানভাসে ধরা বর্ষার রূপই নিয়ে যাবে সেই শান্ত ও স্নিগ্ধ জগতে।
কেননা ভূমি গ্যালারিতে বাংলাদেশের বর্ষার নান্দনিক ছবি নিয়ে ‘রেইনস্কেপ’ শীর্ষক একটি প্রদর্শনী চলছে। ২৫ শিল্পীর জলরঙে আঁকা মোট ৭৫টি চিত্রকর্ম সেখানে প্রদর্শিত হচ্ছে। প্রশ্ন জাগতেই পারে, কেন এ প্রদর্শনীর সব কাজই কেবল জলরঙ বা ওয়াটার কালারে করা হয়েছে? কিছুক্ষণ ছবিগুলো দেখলেই অবশ্য সে প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যায়। বর্ষাকালেই প্রকৃতি তার আসল রূপ তুলে ধরে এবং সেই রূপকে ফুটিয়ে তোলার জন্য জলরঙই সবচেয়ে জুতসই মাধ্যম। ওয়াটার কালার, বর্ষা, বাদল দিন—সব মিলিয়ে বৃষ্টির তরলতার সঙ্গে জলরঙের স্বচ্ছতা যেন মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে এখানে। জানা যায়, এ প্রদর্শনীর মূল লক্ষ্য হলো যান্ত্রিক জীবনের অস্থিরতা ভুলে মানুষকে শিল্পের সেই শান্ত ও মানবিক জায়গায় ফিরিয়ে আনা।

রেজাউন নবীর মনসুন মেলোডি
সেসব ছবিতে গ্রামবাংলার মাঠে চরে বেড়ানো গরু-ছাগল-ভেড়া তাড়িয়ে আনা, ঘাটের খেয়া, কচুরি ফুলের বাহার, কদম ফুল, মফস্বলি জীবনে বর্ষার ছাপ যেমন আছে, তেমনি সেখানে বৃষ্টিভেজা রাতের শহরের বিরক্তিকর ট্রাফিকও নান্দনিক হয়ে ধরা পড়েছে। বাংলাদেশের বর্ষাকালের বৃষ্টির যে নান্দনিক সৌন্দর্য, তার সঙ্গে তিন প্রজন্মের এক শৈল্পিক সেতু এ প্রদর্শনীকে দিয়েছে ভিন্নমাত্রা। আয়োজকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এখানে কেবল নামী শিল্পীরাই নন, বরং সদ্য মাস্টার্স শেষ করা তরুণরাও পাশাপাশি দাঁড়িয়েছেন তাদের তুলি নিয়ে।
যেমন প্রখ্যাত শিল্পী আব্দুল মান্নান, জামাল আহমেদ, রণজিৎ দাস কিংবা রেজাউন নবীদের মতো দিকপালদের জলরঙের কাজের পাশে যখন তরুণ শিল্পী ঝলক সাহা বা তামান্না লিজাদের কাজ ঝুলে থাকে, তখন সেটি কেবল প্রদর্শনী থাকে না; হয়ে ওঠে এক গভীর ‘পারস্পরিক শিক্ষা এবং সৃজনশীল ভাববিনিময়ের পরিসর’। দর্শকরা দেখছেন কীভাবে বর্ষা একেকজনের চোখে একেক রঙে ধরা দেয়, যা কারো কাছে বিমূর্ত স্মৃতি, কারো কাছে চিরচেনা গ্রামবাংলার রূপ। তিনটি প্রজন্মের এ মেলবন্ধন জলরঙের মাধ্যমে বাংলার বর্ষাকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে বলেই মনে করছেন দর্শকরাও।

আনিসুর রহমানের আফটার রেইন-২
ভেতরে ঢুকে গ্যালারির প্রথম ঘরেই চোখে পড়ল একদল তরুণ-তরুণীর। তারা যেমন মুগ্ধ হয়ে ছবি দেখছে, তেমনি নিজেরাও ছবির সঙ্গে ছবি হয়ে উঠছে। সেখানে ঢাকার হোম ইকোনমিকস কলেজের ছাত্রী সাদিয়া মিম আর তার ছোট বোন লালমাটিয়া মহিলা কলেজের ছাত্রী তাসনিয়া মিম্মার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ফেসবুকের ইভেন্ট দেখে তারা এ এক্সিবিশন দেখতে এসেছে। তারা আরো জানায়, ‘রেইনস্কেপ’-এর কিছু ছবি অনলাইন ক্যাটালগে দেখে তারা আসতে আগ্রহী হয়েছে এবং এসে তাদের খুবই ভালো লাগছে। নিজেদের প্রাত্যহিক জীবনের অভিজ্ঞতার শিল্পদৃষ্টি তাদের মোহিত করছে।
‘রেইনস্কেপ’ নিয়ে কথা হয় ভূমি গ্যালারির প্রতিষ্ঠাতা ও নির্বাহী প্রধান সাইফুর রহমান লেনিনের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘যান্ত্রিক জীবনে বর্ষা মানেই জ্যাম আর কাদা-জল। কিন্তু শিল্পীর চোখে বর্ষা হলো এক ঐশ্বরিক মুহূর্ত। আসলে বাংলাদেশের যে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, এটা দেখবার বা উপভোগ করবার মোক্ষম সময় হচ্ছে বর্ষাকাল। এ বর্ষাকালেই প্রকৃতি তার আসল রূপটা তুলে ধরে।’
সবার জন্য উন্মুক্ত এ প্রদর্শনীতে তাই কেবল আর্ট কালেক্টররা নন, আসছেন অসংখ্য শিক্ষার্থী ও সাধারণ কর্মজীবী মানুষ। আয়োজকদের মতে, শিল্পকে যত মানুষের কাছাকাছি নেয়া যাবে, ততই মানুষের মনের অস্থিরতা কমবে। এ জাগতিক অস্থিরতা, মানুষের মধ্যে যে হিংসা-বিদ্বেষ...এটার বিপরীতে এ শিল্পই হতে পারে সবচেয়ে বড় হাতিয়ার, যা দিয়ে মানুষকে আবার ফিরিয়ে আনা সম্ভব একটা শান্ত ও মানবিক জায়গায়।
দলীয় এ চিত্র প্রদর্শনীতে অংশগ্রহণকারী শিল্পীরা হলেন আব্দুল মান্নান, জামাল আহমেদ, রণজিৎ দাস, রেজাউন নবী, রবিউল ইসলাম, দামাসুশ হাচ্চা, আনিসুর রহমান, প্রদ্যুত ভট্ট, সুমন বৈদ্য, আল আখির সরকার, রাশেদ কামাল রাসেল, কামরুজ্জোহা, ওয়ারিয়র রহমান সামী, সুবর্ণ চক্রবর্তী তন্ময়, শম্পা জোহা, রুবেল খান, হেলাল শাহ, আনামুজ জাহিদ, তামান্না লিজা, কারিদুল ইসলাম, ফারিয়াজ ইমরান ও ঝলক সাহা।
বাংলাদেশের জলরঙের ঐতিহ্যকে নতুন প্রজন্মের শিল্পচর্চার সঙ্গে যুক্ত করে আন্তর্জাতিক শিল্পপরিসরে আরো সুদৃঢ়ভাবে উপস্থাপন করা সম্ভব। ‘রেইনস্কেপ’ সেই বিশ্বাসেরই এক আন্তরিক ও নান্দনিক প্রকাশ। ১০ জুলাই শুরু হওয়া এ প্রদর্শনী চলবে ২২ জুলাই পর্যন্ত। প্রতিদিন বেলা ৩টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত প্রদর্শনীটি সবার জন্য উন্মুক্ত থাকবে।










