আমরা জানি, বাংলাদেশে শিল্পকলার যাত্রা শুরু ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান-ভারত বিভাগের পর। শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের উদ্যোগে তৎকালীন আরো শিল্পীর সহযোগিতায় চারুকলা কলেজ গড়ে ওঠে। তখন চারুকলায় কোনো নারী শিক্ষার্থী ছিল না। পরে ধীরে ধীরে কিছু মেয়ে চারুকলায় আসে। যা-ই হোক, শিল্পীদের কাজে বিভিন্ন বিষয়ের সঙ্গে নারী চরিত্রও এসেছে। প্রকৃতি ও জীবনযাপনের সাধারণ ঘটনায় বাংলাদেশে নারী ও পুরুষ শিল্পীরা যেভাবে নারীকে ক্যানভাসে ফুটিয়ে তুলেছেন তার বিবর্তনটা জানতে চাইছি। ষাট-সত্তরের দশকের সঙ্গে এ নতুন সহস্রাব্দে কতটা পরিবর্তন এসেছে?

আমরা জানি, বাংলাদেশে শিল্পকলার যাত্রা শুরু ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান-ভারত বিভাগের পর। শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের উদ্যোগে তৎকালীন আরো শিল্পীর সহযোগিতায় চারুকলা কলেজ গড়ে ওঠে। তখন চারুকলায় কোনো নারী শিক্ষার্থী ছিল না। পরে ধীরে ধীরে কিছু মেয়ে চারুকলায় আসে। যা-ই হোক, শিল্পীদের কাজে বিভিন্ন বিষয়ের সঙ্গে নারী চরিত্রও এসেছে। প্রকৃতি ও জীবনযাপনের সাধারণ ঘটনায় প্রাসঙ্গিকভাবে নারী এসেছে। কিছু চিত্রকর্মের শিরোনাম থেকে আমরা বিষয় সম্বন্ধে ধারণা পেতে পারি। জয়নুলের দুই সাঁওতাল রমণী (১৯৫১), কলসি কাঁখে রমণী (১৯৫১), মা ও শিশু (১৯৫৩), প্রসাধন (১৯৫৩), স্নান (১৯৭৬) ইত্যাদি। কামরুল হাসানের তিন কন্যা (১৯৫৫, ১৯৮৩), স্নান (১৯৬৬), উঁকি (১৯৬৭), স্তন্যদান (১৯৭৫), নায়ক (১৯৭৫) ইত্যাদি। বিষয় হিসেবে নারীকে উপস্থাপনের ক্ষেত্রে শিল্পী এসএম সুলতানের কাজে আমরা স্বতন্ত্র দর্শন খুঁজে পাই। নারী চরিত্রকেও তিনি বলিষ্ঠ ও পেশিবহুল এঁকেছেন।

এবং তারা পুরুষের পাশাপাশি খেতে-মাঠে কাজ করছে। সুলতানের কয়েকটি ছবি শাপলা তোলা (১৯৭৮), ধান ঝাড়া (১৯৮৬), মাছ কাটা (১৯৮৭), ধান ভানা (১৯৮৯)। শিল্পী মুর্তজা বশীর নারী নিয়ে প্রচুর ছবি এঁকেছেন। উল্লেখযোগ্য ঘরের পথে (১৯৫৮), তরুণী ও পাখি (১৯৬১), আমার গৃহকর্ত্রী (২০০৩), আত্মজা (২০০৩), হলুদ গোলাপ হাতে রমণী (২০০৩)। সাধারণভাবে আমার মনে হয় এ পর্যন্ত চিত্রকলায় নারীকে সাদামাটাভাবেই আমরা পেয়েছি। সত্তরের দশকে প্রয়াত শিল্পী দীপা হকের কাজ আধুনিক ও সমকালীনও বটে। বিষয় হিসেবে তিনি তৎকালীন সমাজে আলোর বিপরীতে নারীদের যে একটা অন্ধকার জীবন সেটা নিয়ে কাজ করেছেন। জীবিকার প্রয়োজনে নারীর এ পথ বেছে নেয়ার চিত্রে আমি সমাজ বাস্তবতার শুরুটা উপলব্ধি করি। লক্ষণীয় একটা বিষয়, চিত্রকলায় নারীর অবস্থান তুলে ধরার ক্ষেত্রে বিশিষ্ট কয়েকজন নারী শিল্পী অগ্রণী ভূমিকা রেখেছেন। নাজলী লায়লা মনসুর, দিলারা বেগম জলি, তৈয়বা বেগম লিপি ছাড়াও আরো শিল্পীর অবদান রয়েছে। পরবর্তী সময়ে অনেক তরুণ এ বিষয়ে কাজ করার চেষ্টা করেছে।

নানা কারণে আমাদের দেশের নারী শিল্পীদের জার্নিটা সহজ নয়। আপনার যাত্রাপথটা কেমন ছিল? আশির দশকে যখন আঁকা শুরু করলেন সে সময় থেকে আজকের দিনে নারী শিল্পীদের চলার পথ কতটুকু বদলেছে?

আসলে শুধু কি নারী শিল্পীদের যাত্রাটাই কঠিন? কর্মের নানা ক্ষেত্রে সব নারীকেই কোনো না কোনো বাধা পেরিয়ে আসতে হয়। আমি বলব, শিল্পকলা যেহেতু সৃজনশীল মাধ্যম, তাই অন্য কর্মক্ষেত্র থেকে এর চরিত্রটা ভিন্ন। এখানে মানসিকভাবে দৃঢ়তা, নিজেকে কথা দেয়াটা অত্যন্ত জরুরি। আমি কষ্ট করব না, অনুশীলন করব না, সৃজনশীলতার উৎকর্ষের জন্য কিছুই করব না, তাহলে কি শিল্পকর্ম হবে? এটা তো কেউ কাউকে করে দিতে পারবে না।

চারুকলায় ভর্তি হওয়ার অনেক আগে থেকেই আমি ও বড় বোন আনা ইসলাম ছবি আঁকা, লেখালেখি, সংগঠন করা ইত্যাদির সঙ্গে জড়িত ছিলাম। আমার বাবা সরকারি কর্মকর্তা হলেও তার ছবি আঁকার হাত ভালো ছিল। ছোটবেলায় বাবার কাছে অনেক ড্রইং শিখেছি। ফলে আমার যাত্রাপথটা খুবই আনন্দদায়ক ছিল। একাডেমিক পর্ব শেষ করে নিজের পথে হাঁটার জন্য যখন কাজ করতে থাকি, তখন দেশ একটি অস্থির সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। সামরিক শাসন, মৌলবাদের উত্থান আমাকে মানসিকভাবে অস্থির করত। সে সময় যে বিষয় নিয়ে আমি কাজ করেছি এবং বিশেষত যেভাবে তাকে উপস্থাপন করেছি তা অনেক বড় মাপের শিল্পীদের কাছেও গ্রহণযোগ্য হয়নি। কিন্তু আমার ভরসা তরুণরা। নতুন প্রজন্ম আমার চিত্রকর্ম বারবার দেখেছে, প্রদর্শনীতে নিজেরা আলোচনা করেছে। এখন তো নারী শিল্পী পুরুষ শিল্পী বিভাজন করার প্রয়োজন আছে বলে আমি মনে করি না।

চিত্রকর্মে নারী মানেই সুন্দরের প্রতিভূ, এমন একটা ধারণা চালু আছে। আপনি আপনার ছবিতে নারীকে কীভাবে দেখতে চেয়েছেন?

বর্তমান সময়কে অনুধারণ করা যেকোনো সচেতন শিল্পীর জন্যই একটা গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার। সমাজের এ অবস্থানে থেকে কী করে ভাবা যায় নারী মানেই সুন্দরের প্রতিভূ! নারীকে প্রথমত একজন মর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তি মানুষ হয়ে উঠতে হবে। আমি যেহেতু সমাজ বাস্তবতা নিয়ে কাজ করি, ফলে আমার অধিকাংশ ছবিই নয়ন সুখকর নয়। মানুষের অস্তিত্বের বন্দিত্ব, সমাজে নারীর অবস্থান, মৌলবাদের করাল থাবা সব মিলিয়ে নারীকে রক্ষার নামে ধর্ম নারীকেই পিষে মারছে ধর্মান্ধতার চাকায়। আমি চাই নারী এ অবস্থান থেকে মুক্তি পাক। এজন্য নারীকেই সচেতন হতে হবে। আর শিল্পীরা যেন নারীকে পুতুল বা পণ্য হিসেবে চিত্রে উপস্থাপন না করেন এটাই প্রত্যাশা।

আপনার প্রথম একক শিল্প প্রদর্শনীর বিষয় ছিল ‘‌নারী ও সমাজ’, যা শিল্পসমালোচক ও সমঝদারদের প্রশংসা কুড়িয়েছিল। এ ছবিগুলো আঁকার ভাবনা, প্রস্তুতি নিয়ে যদি বলেন...

২০০০ সালে প্রথম একক চিত্র প্রদর্শনীর আগের কয়েকটি বছর আমার জীবনের বেশকিছু ঘটনা আমার শিল্পচর্চায় প্রভাব ফেলে। প্রথম আমি নিজের মতো করে ছবিতে আমার কথা বলতে চাই, ভাবনাটা বহুদিন আমাকে বিচলিত করেছে, ভাবিয়েছে। আগে যে ধরনের কাজ করেছি, তার সঙ্গে ভাবনার যোগসূত্র ছিল। বিষয়বস্তু হিসেবে সমকালীন ঘটনা এসেছে। মৌলবাদের উত্থান, নানা দুর্বিষহ ঘটনার মধ্যে সমাজে নারীর অবস্থান ইত্যাদি। ‘নারী ও সমাজ’"প্রদর্শনীর উল্লেখযোগ্য কাজ ছিল ‘অন্তঃসত্ত্বা’ সিরিজের ছবিগুলো। এ কাজগুলো আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার ফসল। ১৯৯৫ সালে আমি প্রথম সন্তানের মা হই। সন্তান জন্মের আগের কয়েক মাস আমি এ ছবিগুলো আঁকি। ১৯৯৭ সালে দ্বিতীয় সন্তানের জন্মের আগেও আরো কিছু কাজ করি। এসব চিত্রকর্ম সমঝদারদের দৃষ্টি কেড়েছে আরেকটা কারণে, ক্যানভাসকে আমি নতুন আঙ্গিকে উপস্থাপন করেছিলাম।

আপনি যখন নারীকে এঁকেছেন, তখন রঙের ব্যবহারে আপনার নিজস্ব ভাষা কীভাবে নির্মাণ করেছেন?

সত্যি কথা বলতে কী ছবির বিষয়, কম্পোজিশন ইত্যাদি নিয়ে প্রাথমিক একটা ভাবনা অবশ্যই কাজ করে। কখনো তা নিয়ে লে আউট করি। কিন্তু নারী ফিগারটি কী রঙের হবে তা বিচ্ছিন্নভাবে খুব একটা ভাবি না। কাজ করতে করতে অনেক সময় সিদ্ধান্তটি মাথায় আসে। ফিগারের চরিত্র বুঝে আসলে রঙ প্রয়োগ করি। এক্ষেত্রে ব্যতিক্রম ‘অন্তঃসত্ত্বা’ সিরিজের একটি কাজ। যেখানে সন্তান প্রসবের সুখ, যন্ত্রণা, আকাঙ্ক্ষার মিশ্র অনুভূতিতে নারী চিৎকার করছে। তার মুখ, দেহ গোলাপি রঙের, মিষ্টি নীল আকাশ। আর কোনো ছবিতে আমি গোলাপি নারী আঁকিনি।

নারীবাদী দর্শন আপনার শিল্পীজীবনকে কতটা প্রভাবিত করেছে?

আমার ভাবনা-দর্শন আমার মানসিকতাকে যেভাবে গড়ে তুলেছে, তারই প্রতিফলন আমার আঁকা চিত্রকর্ম।

সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন শাকেরা তাসনীম ইরা। বণিক বার্তায় এটি প্রকাশিত হয়েছিল ২০২৪ সালের ৮ মার্চ।