বিশ্বখ্যাত শিল্পী মকবুল ফিদা হুসেনের আঁকা ২৫টি দুর্লভ চিত্রকর্ম ১২ জুন মুম্বাইয়ের পুনদোল আর্ট গ্যালারিতে নিলামে উঠতে যাচ্ছে। দুই দশকেরও বেশি সময় আগে আঁকা এসব চিত্র প্রথমবারের মতো জনসমক্ষে আসছে। এক অমীমাংসিত আর্থিক মামলার জেরে প্রায় দেড় যুগ ধরে সেগুলো ব্যাংকের ভল্টে তালাবদ্ধ ছিল।
শিল্পী হুসেন এ চিত্রগুলো আঁকতে শুরু করেছিলেন ২০০০-এর দশকের গোড়ার দিকে। এক উচ্চাভিলাষী প্রকল্পের অংশ ছিল এটি। তার ইচ্ছা ছিল বিশ শতকের ১০০টি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা কেন্দ্র করে ১০০ চিত্রকর্ম আঁকার। ২০০৪ সালে এ সিরিজের প্রথম ২৫টি চিত্রকর্ম তিনি বিক্রি করেন মুম্বাইয়ের ব্যবসায়ী গুরু স্বরূপ শ্রীবাস্তবকে। ১০০ ছবির জন্য চুক্তি হয়েছিল ১ বিলিয়ন রুপির, যা তৎকালে ভারতীয় শিল্পজগতের সবচেয়ে বড় চুক্তি ছিল।

মাত্র দুই বছরের মাথায় সেই চুক্তির ওপর কালো মেঘ ঘনিয়ে আসে। ভারতের কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থা সিবিআই অভিযোগ আনে যে ব্যবসায়ী শ্রীবাস্তব একটি সরকারি কৃষি উন্নয়ন সংস্থার কাছ থেকে নেয়া ঋণ অপব্যবহার করে তা বিনিয়োগ করেছেন রিয়েল এস্টেট, মিউচুয়াল ফান্ড ও শিল্পকর্মে। এর ফলে ২০০৮ সালে আদালতের নির্দেশে ২৫টি হুসেন চিত্রকর্মসহ প্রায় ১ বিলিয়ন রুপির সম্পদ বাজেয়াপ্ত করে সংস্থাটি। তখনই ব্যাংকের অন্ধকার ভল্টে বন্দি করা হয় এসব চিত্রকর্ম।
এমএফ হুসেন, যাকে ভারতীয় শিল্পের ‘পিকাসো’ বলা হয়, বরাবরই ছিলেন বিতর্কিত ও সাহসী। তার শিল্পে একদিকে যেমন ইতিহাসের গাঢ় দাগ, তেমনি ছিল মানবজীবনের বিচিত্র অনুভব। তার আঁকা এ ২৫টি ছবি ‘MF Husain: An Artist’s Vision of the XX Century’ নামে পরিচিত, যা ছিল পরিবর্তনশীল শতকের বৈপ্লবিক প্রযুক্তি, রাজনীতি ও সংস্কৃতির প্রতিচ্ছবি।
ছবিগুলোয় দেখা যাবে বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহতা, দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে মানুষের লড়াই, চার্লি চ্যাপলিনের হাস্যরস, আবার পাশেই মহাকাশযানের উৎক্ষেপণ—সব মিলিয়ে এক বৈসাদৃশ্যের অভিঘাতে জন্ম নেয় শিল্পের অনির্বচনীয় রূপ। এক ছবিতে দেখা যায়, বেঞ্চে বসে কথা বলছে নানা দেশ ও বর্ণের মানুষ—হুসেনের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের স্বপ্ন যেন ক্যানভাসে ফুটে উঠেছে। আরেকটি চিত্রকর্মে চ্যাপলিনের মুখের হাসি আর পেছনে রকেট উৎক্ষেপণের দৃশ্য—সমাজে বৈষম্য ও রাষ্ট্রীয় ব্যয়ের দ্বৈত বাস্তবতার ইঙ্গিত দেয়। আছে দেশভাগ, হলোকাস্টের মতো ঘটনাও।
এ চিত্রকর্মগুলোর একটি অনন্য দিক হলো, সেগুলো অজানা হয়ে থেকেছে দীর্ঘ সময়। গুরু স্বরূপ শ্রীবাস্তব ২০১৮ সালে এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘আমি প্রথম ২৫টি চিত্রকর্ম বিক্রি করে হুসেনকে বাকি টাকা দেয়ার পরিকল্পনা করেছিলাম। কিন্তু আইনি জটিলতার কারণে ২০০৮ সালে হুসেন যখন আমাকে লন্ডন ও প্যারিস থেকে চিত্রকর্ম নেয়ার জন্য বললেন, তখন আমার তহবিল প্রস্তুত ছিল না। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন।’
হুসেন কেন একজন অজ্ঞাত ব্যবসায়ীকে এ চুক্তির অংশ করেছিলেন—এ প্রশ্নের উত্তরে পুনদোল আর্ট গ্যালারির পরিচালক দাদিবা পুনদোল বলেন, ‘তার কাছে বিক্রি হওয়াটাই ছিল মুখ্য বিষয়। তিনি পরিচয় খোঁজেননি’।
একসময় যেসব চিত্র বিশ্বে আলোড়ন তুলতে পারত, সেগুলো আটকে ছিল এক তালাবদ্ধ ভল্টে। আজ সেগুলো ফিরে আসছে আলোয়—আশা, ইতিহাস আর সাহসিকতার এক নতুন ব্যঞ্জনায়।










