ফিলিস্তিনি চিত্রশিল্পী মারওয়ান নাসসার ১৯৮৪ সালে গাজায় জন্মগ্রহণ করেন। পড়াশোনা করেছেন আল-আকসা বিশ্ববিদ্যালয়ে। একই বিশ্ববিদ্যালয়ে করেছেন শিক্ষকতাও। অংশগ্রহণ করেছেন দেশে ও দেশের বাইরে একাধিক যৌথ প্রদর্শনীতে। বিশেষ পরিচিতি অর্জন করেছে তার একক প্রদর্শনী ‘হিরাক’। যুদ্ধবিধ্বস্ত ফিলিস্তিন থেকে শিল্পী হিসেবে নিজের অভিজ্ঞতা এবং যাপিত জীবন নিয়ে তিনি কথা বলেছেন বণিক বার্তার সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আহমেদ দীন রুমি

গাজার যুদ্ধ পরিস্থিতিতে আপনার দৈনন্দিন জীবন সম্পর্কে কিছু বলবেন কি?

দৃষ্টিভঙ্গি যেমনই থাক, যুদ্ধ নিয়ে প্রকৃত অনুভূতিগুলো আমরা কখনো প্রকাশ করতে পারব না। বিশেষ করে যেটা আমাদের সঙ্গে ঘটে। গাজার প্রতিটি মানুষের দৈনন্দিন রুটিন এখন এক রকম। জীবিকা নির্বাহের কোনো উপায় নেই। প্রতিদিন প্রশ্ন জাগে, কীভাবে এ রুটিন কাটিয়ে ওঠা সম্ভব? তার পরও আশা জিইয়ে রেখেছি।

শিল্পী তার চারপাশের মানবিক পরিস্থিতির অংশ। চারপাশে যে বিপর্যয় চলছে; প্রভাবিত করে। অবরোধের কারণে গাজায় মৌলিক পণ্যের সংকট ব্যাপক। দুমুঠো খাবারের জন্য সবার কত সংগ্রাম। সবাই তাদের শিশুদের জন্য খাবার সংগ্রহের চেষ্টা করে। যদি কিছু খাদ্য পাওয়া যায়, তা অতিরিক্ত দামে বিক্রি হয়। ভেবেছিলাম শিল্পের মাধ্যমে গাজার জীবনকে চিত্রিত করার চেষ্টা শুরু করব। দ্রুত স্কেচ করতে শুরু করি প্রতিদিনের কাজ হিসেবে। স্টুডিওতে যা কিছু ছিল, তা নিয়েই চেষ্টা করেছি মাসের পর মাস।

আপনি বললেন, শিল্পী তার চারপাশের মানবিক পরিস্থিতির অংশ। তাহলে গাজার পরিস্থিতি সেখানকার শিল্পচর্চায় কতটা প্রভাব ফেলেছে?

43

গাজায় চলমান যুদ্ধ ফিলিস্তিনি জনগণ ও তাদের সৃষ্টিশীল সংস্কৃতিবান ও চিন্তাবিদদের জন্য নতুন কিছু না। ফিলিস্তিনি শিল্পীরা বরাবরই তাদের জনগণের সমস্যার সঙ্গে যুক্ত থাকতে চেয়েছেন। অনুসরণ করেছেন রাজনৈতিক ও সংগ্রামী আন্দোলনের পথ। ফলে শিল্প এখানে অরাজনৈতিক কর্মকাণ্ড হিসেবে বিবেচিত নয়।

একজন শিল্পী সর্বদা তার জন্মস্থানের প্রতি অনুগত। শুধু ফিলিস্তিনি নয়; শিল্প সার্বিকভাবেই সারা বিশ্বের মানবিক দিককেই সামনে রাখে। প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মধ্য দিয়ে সমাজে যে সংকট তৈরি হয়, তার মধ্য দিয়ে আবির্ভাব ঘটে এক্সপ্রেশনিজম ও অন্যান্য শৈলীর। ফিলিস্তিনি শিল্পেরও একটি মানবিক ও সামাজিক লক্ষ্যও রয়েছে। এখানে শিল্প ও সাংস্কৃতিক উৎপাদন কেবল উচ্চশ্রেণির মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। বরং সাধারণ জনগণও এ সৃজনশীল প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করেছে। তারা সাংস্কৃতিক পণ্যগুলোকে সমর্থন ও প্রচার করেছে। জায়গা দিয়েছে নিজেদের ঘরে। কাজগুলো নিয়ে তারা গর্বিত। বিপ্লবী কবিতার মতো দেয়ালে চিত্র আঁকা এবং স্লোগান লেখা ছিল সাধারণ কাজ।

যুদ্ধের সময় শিল্পের মূল ভূমিকা হলো সংগ্রামের যন্ত্রণাকে চিত্রিত করা। শিল্প উৎপাদন তাই এক ধরনের সংরক্ষণ। শিল্পী কখনো নিরপেক্ষ স্থানে অবস্থান করে না। যুদ্ধের সময়ে সে সেই লড়াইয়ে অংশ নেয়। সৎ শিল্প মানবিক ও নৈতিক অবক্ষয়ের চিত্র তুলে ধরে।

শিল্পের এই সফরে আপনি কীভাবে কাজের মাধ্যমে আপনার অনুভূতি বা চিন্তা প্রকাশ করতে চান?

শিল্পী হিসেবে প্রতিটি ধাপে আমরা মুক্তির খোঁজ করি। সংস্কৃতি ও শিল্পের চর্চা তো মুক্তিরই একটি মাধ্যম। শিল্পী চারপাশের যে পরিস্থিতির সঙ্গে সংযুক্ত, শিল্প তারই প্রতিফলন। যখন শিল্পীর কোনো বিষয় জনসাধারণের মধ্যে আলোচনার জন্ম দেয়, তখন শিল্পী দুটি পথের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকে। প্রথমত, শিল্পের প্রয়োজনীয়তা এবং দ্বিতীয়ত জনগণের প্রয়োজন। এই অবস্থায় শিল্পী তার সমাজকে উন্নতির দিকে নিয়ে যেতে চায় শিল্পের মাধ্যমে।

যুদ্ধে আমার অভিজ্ঞতার বিষয়টি নিয়ে বলতে গেলে, নিজের ঘরবাড়িতে নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার অনুভূতি। নিজের, সন্তানদের এবং প্রিয়জনদের প্রতি ক্রমাগত ভয়, বারবার স্থানচ্যুতি—সমস্ত কিছুই আমার আগের শিল্পচর্চার পথ থেকে একটি নতুন বাস্তবতায় নিয়ে গেছে। আরো গভীর মনন ও দৃষ্টিভঙ্গির দিকে। শিল্প হয়ে উঠেছে মানুষের কষ্ট ও চিন্তাভাবনা বোঝার উপকরণ। আমরা এখন আর শুধু নাম বা মানুষ হিসেবে বিবেচিত নই, সংখ্যায় পরিণত হয়েছি। এক বছর ধরে আমরা যা অনুভব করছি, সেটি বিশ্বব্যাপী রাজনৈতিক নেতাদের বড় বড় কথা ও কাজের মধ্যে পার্থক্য স্পষ্ট করে দিয়েছে।

66

ছবি: মারওয়ান নাসসারের সৌজন্যে

যুদ্ধের সময়ে শিল্প কি আসলে প্রতিরোধের ভূমিকা পালন করতে পারে?

আমি মনে করি পারে। ইতিহাসেই সেটা প্রমাণ হয়েছে। মানুষ বিভিন্ন সময়ে শিল্প ও সংস্কৃতিকে শাসন প্রতিষ্ঠার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছে। ইতিহাসের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক পরিবর্তন এবং শিল্পের ভূমিকা দেখলে বোঝা যায়, শিল্প মানুষকে জাগ্রত ও বিপ্লবী হতে উৎসাহিত করেছে। যখন পিকাসো তার গোয়ের্নিকা চিত্রকর্মটি মানবিক মুক্তির ভাবনা এবং পৃথিবীজুড়ে স্বাধিকার আন্দোলনকে উজ্জীবিত করেছিল। পিকাসোর চিন্তা অনুসরণ করে গাজা এখন প্রতিদিন জন্ম দিচ্ছে একটি নতুন গোয়ের্নিকা। প্রশ্ন হলো, এ বিপুল হত্যাযজ্ঞ কি পৃথিবীকে নাড়া দেবে? মানবিক ন্যায়ের জন্য জাগরণের সৃষ্টি করবে?

চিত্রকর্মে যদি স্থানীয় জনতার প্রতিনিধিত্ব থাকে। সেক্ষেত্রে আপনি কি মনে করেন না যে, আপনার কাজ আন্তর্জাতিক মহলে স্থানীয় দর্শকদের তুলনায় ভিন্নভাবে পাঠ করা হয়?

আমি মনে করি না যে আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় স্তরে কাজের বোঝাপড়া খুব একটা ভিন্ন। চিত্রকলার ভাষা সর্বজনীন। শিল্পকর্মের পাঠ সুস্পষ্ট ভাষায় সব জায়গাতেই বোঝা যায়। যেহেতু মানুষের মধ্যে সাংস্কৃতিক সীমানাগুলো ভেঙে পড়েছে, চিন্তাগুলো একে অপরের সঙ্গে মিশে গেছে, এখন শিল্পকর্ম খুব সহজে আরো দূরবর্তী জায়গায় পৌঁছতে সক্ষম।

গাজা অঞ্চলের পরিবেশ অবশ্যই সংকুচিত। সেখানে মিউজিয়াম ও শিল্প গবেষণা কেন্দ্রের অভাব। রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্রগুলোর প্রতি উপর্যুপরি হামলার কারণে কমপ্লেক্সেরও সংকট। তবে গাজায় কিছু স্থানীয় প্রদর্শনী ও আন্তর্জাতিক কেন্দ্রগুলোর সাংস্কৃতিক কার্যক্রম এখনো সক্রিয়। আমি অনুভব করি, গাজার জনগণ সাংস্কৃতিক, চিন্তা এবং শৈল্পিক কর্মকাণ্ডে ব্যাপকভাবে জড়িত। তারা রাজনৈতিক ও বিপ্লবী প্রতীকী ছবি পছন্দ করে, যা তাদের দুঃখ, আশা ও চেতনা নিয়ে কথা বলে। আমি চেষ্টা করি আমার কাজকে এমনভাবে উপস্থাপন করতে যাতে এটি একটি রূপক ও ফিলিস্তিনি পরিচয় তুলে ধরে।

IMG_٢٠٢٥٠١١٩_١٧٢٦٣٩

যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে আপনার শিল্পকর্মে কোনো বাঁক পরিবর্তন ঘটেছে কী?

আমি মনে করি একজন সৃষ্টিশীল মানুষকে প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হতে হবে। এ কারণে যুদ্ধের সময়কার অভিজ্ঞতাকে আরো গভীরভাবে অনুসন্ধান করেছি। কঠিন মুহূর্তগুলোতেও প্রতিদিন অঙ্কন করেছি। এসব কাজ আগের অভিজ্ঞতায় আঁকা কাজের চেয়ে অনেক বেশি সৎ। রাশিয়ান ফরমালিজমের জনক ভিক্তর স্লোফস্কি যেমনটা দাবি করেছিলেন যে, কষ্টই সৃষ্টিশীলতাকে মুক্ত করে।

যুদ্ধের সময়টি ছিল আমার পূর্ববর্তী অভিজ্ঞতা সমাপ্ত করার সময়। তখন আমি বেশকিছু স্কেচ শেষ করি এবং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আমি আরো স্থিতিশীল হতে শুরু করি, পাশাপাশি ছবি আমার মনের মধ্যে গেঁথে যায়, যা আমাকে আরো গভীরভাবে ভাবতে সহায়তা করে। আমি মানুষের অভিব্যক্তি এবং তাদের আচরণকে রঙের মাধ্যমে অনুসন্ধান করতে শুরু করি। এ সময়ের মধ্যে প্রায় ১০০টি শিল্পকর্ম এবং স্কেচ শেষ করেছি। যার মধ্যে ছিল একটি বিশেষ সিরিজ, সেখানে আমি মানুষের অভ্যন্তরীণ উদ্বেগের প্রতিফলন দেখাতে চেষ্টা করেছি।

তরুণ শিল্পীদের জন্য আপনার কোনো পরামর্শ রয়েছে? বিশেষ করে একই ধরনের পরিস্থিতিতে যারা আছেন, তাদের জন্য।

নতুন প্রজন্মকে বৈশ্বিক অভিজ্ঞতার দিকে মনোনিবেশ করতে হবে। যেগুলো মানবিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে প্রভাব ফেলেছে, সেদিকে। শিল্পের নানা ধারা একে অপরের সঙ্গে মিলিত হয়ে পরস্পরকে প্রভাবিত করে। প্রমাণ করে আধুনিক শিল্পের সর্বজনীনতা। এখন তো আর এমন কোনো প্রতিবন্ধকতা নেই, যা নতুন অভিজ্ঞতার অনুসন্ধান থেকে বিরত রাখবে।

শিল্পী তার অতীত থেকে বিচ্ছিন্ন থাকতে পারে না। তাই তাকে তার স্মৃতিকে কাজে লাগিয়ে ঐতিহ্যকে পুনরুজ্জীবিত করতে হবে। অতীতকে পুনরুদ্ধার করার উদ্দেশ্য শুধু তার ওপর দাঁড়িয়ে থাকা নয়। বরং তা একটি নতুন দৃষ্টিভঙ্গির ভিত হওয়া উচিত।