বিশ শতকের শুরুতে প্যারিস শহরের এক নিরিবিলি অ্যাপার্টমেন্টে আমেরিকান এক নারীর হাতে গড়ে উঠেছিল ব্যতিক্রমী ইতিহাস। তার নাম গার্ট্রুড স্টেইন। ঠিক কোনো সরকারি জাদুঘরের মতো নয়, কিন্তু তার ‘২৭ রু দ্য ফ্লুরাস’ অ্যাপার্টমেন্টটি হয়ে উঠেছিল আধুনিক শিল্পের প্রথম জাদুঘর। সে সময় বাইরে কোনো সাইনবোর্ড না থাকলেও ভেতরে চলছিল সাহসী শিল্পের সৃষ্টি, চর্চা ও বিপ্লব।

যুক্তরাষ্ট্র থেকে ১৯০৩ সালে প্যারিসে পাড়ি জমান গার্ট্রুড স্টেইন ও তার ভাই লিও স্টেইন। তখন লিও চিত্রকলা শেখায় ব্যস্ত ছিলেন। অন্যদিকে লেখালেখির চেষ্টা করছিলেন গার্ট্রুড। তাদের আরেক ভাই মাইকেল ব্যবসায়িকভাবে সফল ছিলেন এবং প্রতি মাসে আর্থিকভাবে তাদের কিছু সহায়তা করতেন। এ অর্থের বড় অংশই তারা খরচ করতেন শিল্পকর্ম কেনায়। বড় শিল্পীদের চিত্রকর্ম কেনা তাদের পক্ষে সম্ভব ছিল না। তাই তারা নতুন আর বিতর্কিত শিল্পীদের চিত্রকর্ম কিনতে শুরু করেন।

রু লাফিত্তে অবস্থিত অ্যাম্ব্রোয়াজ ভলার্ডের গ্যালারি থেকে তারা তাদের প্রথম চিত্রকর্ম কেনেন। ১৯০৫ সালের অক্টোবরে প্যারিসের ‘স্যালোঁ দ’অতন’ প্রদর্শনীতে তারা কিনে নেন হেনরি মাতিসের বিতর্কিত চিত্র ‘ফাম ও শাপো’। চিত্রটিকে রীতিমতো উপহাস করেছিল দর্শকরা, এমনকি তা ভেঙে ফেলার চেষ্টাও করা হয়েছিল। কিন্তু গার্ট্রুড ও লিও এতে সম্ভাবনা দেখেছিলেন।

কয়েক সপ্তাহ পর একসময়ের জাদুকর গ্যালারির পরিচালক ক্লোভিস সাগোর সঙ্গে দেখা করেন গার্ট্রুড ও লিও। তিনি তাদের তরুণ এক স্প্যানিশ শিল্পীর চিত্রকর্ম দেখান। সাগো জোর দিয়ে বলেন, ‘এই ছেলে সত্যিকারের প্রতিভাবান।’ ওই শিল্পী আর কেউ নন, পাবলো পিকাসো। মাত্র ৩০ ডলারে তারা কিনে নেন পিকাসোর ‘গার্ল উইথ আ বাস্কেট অব ফ্লাওয়ার্স’, যা ২০১৮ সালে বিক্রি হয় প্রায় ১১ কোটি ডলারে।

এভাবেই একে একে সাহসী সব শিল্পকর্ম জায়গা করে নেয় তাদের অ্যাপার্টমেন্টে। প্রতি শনিবার রাতে তারা ঘরের দরজা খুলে দিতেন শিল্পী, সাহিত্যিক ও কৌতূহলী দর্শকদের জন্য। সেই ঘরে যেতেন মাতিস, পিকাসো, হেমিংওয়ে, ফিৎজেরাল্ডের মতো গুণী মানুষ। সবাই মিলে ভাবনার নতুন নতুন পথ খুঁজে পেতেন।

গার্ট্রুডের লেখালেখির বড় অনুপ্রেরণা ছিল এ শিল্পকর্মগুলো। পিকাসো যেমন বলতেন, পল সেজানের চিত্রকলা তার চেতনায় নতুন দিক খুলে দিয়েছিল, তেমনি গার্ট্রুডও বলতেন, সেজানের কাজ তার লেখার ভাষা ও ছন্দে প্রভাব ফেলেছে। এমনকি পিকাসো একবার সেজানের চিত্র এত মনোযোগ দিয়ে দেখছিলেন যে লিও মনে করেছিলেন, এই বুঝি চিত্রটি গলে গেল!

এ প্রভাব শুধু প্যারিসেই সীমাবদ্ধ ছিল না। স্টেইন পরিবারের সংগ্রহে থাকা চিত্রগুলো যুক্তরাষ্ট্রের আর্মোরি শোতে প্রদর্শিত হয়। এর মাধ্যমে প্রথমবার যুক্তরাষ্ট্রে আধুনিক ইউরোপীয় শিল্প দেখানো হয়। পরে লন্ডনের গ্র্যাফটন গ্যালারির ‘পোস্ট-ইমপ্রেশনিস্ট’ প্রদর্শনীতে এ চিত্রগুলো ধার নেন সমালোচক রজার ফ্রাই। প্রদর্শনীটির প্রভাব পড়ে লেখিকা ভার্জিনিয়া উলফের লেখায়, যার প্রভাবে ভার্জিনিয়া উলফের লেখায় আসে নতুন ভাবনার ছাপ।

গার্ট্রুডের অ্যাপার্টমেন্টে শিল্প আর জীবন একসঙ্গে মিশে ছিল। চিত্রগুলো কোনো কাচ বা ফ্রেমে আটকে ছিল না। সেগুলোয় ধুলো জমত, সিগারেটের ধোঁয়ায় রঙ বদলে যেত, তবু সেগুলো ছিল জীবনের অংশ। তার সঙ্গিনী এলিস বি. টোকলাস বলেছিলেন, ‘গার্ট্রুড প্রতিদিন চিত্রগুলো ব্যবহার করতেন।’

সময় যত গড়িয়েছে, গার্ট্রুডের সংগ্রহেও পরিবর্তন এসেছে। কোনো শিল্পীকে অপছন্দ হলে বা রুচির বদল হলে সেই চিত্র সরিয়ে রাখা হতো ‘স্যালোঁ দে রিফিউজে’ নামে আলাদা একটি কক্ষে। তবে পিকাসো যে গার্ট্রুডের প্রতিকৃতি এঁকেছিলেন, সেটি সবসময় গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় থাকত—ঠিক তার নিজের চেয়ারের ওপরে। কখনো কখনো তিনি ইচ্ছা করে চিত্রের জায়গা বদলে দিতেন, যেন শিল্পীদের মধ্যে প্রতিযোগিতা তৈরি হয়। কথিত আছে, একদিন গার্ট্রুডের ডাইনিংরুমে মাতিসের নতুন চিত্র ‘বোনের দ্য ভিভর’ ঝোলানো দেখে ঈর্ষায় পিকাসো এঁকে ফেলেন তার বিখ্যাত ‘লে দ্যোমোয়াজেল দাভিনিওঁ’।

১৯১৩ সালে লিও অ্যাপার্টমেন্ট ছেড়ে চলে যান এবং সঙ্গে নিয়ে যান মাতিসের সব চিত্র। গার্ট্রুড রেখে দেন পিকাসোর কাজগুলো। কারণ তিনি বিশ্বাস করতেন, ভবিষ্যৎ সেখানেই। পরে জীবনের নানা প্রয়োজন মেটাতে তিনি অনেক সময় চিত্র বিক্রি বা বদল করতেন, কখনো খাবার কেনার জন্য, কখনো নিজের প্রকাশনী চালানোর জন্য। তিনি এমন কিছু অজানা শিল্পীকেও সমর্থন করেছিলেন, যাদের সে সময় কেউ খুব একটা গুরুত্ব দিত না। যেমন ফ্রান্সিস রোজ, যিনি পরবর্তী সময়ে গার্ট্রুডের কবরফলকের নকশা করেন।

গার্ট্রুড স্টেইন ১৯৪৬ সালে মারা যাওয়ার সময় তার সংগ্রহ অনেকটাই কমে গিয়েছিল। ১৯৬৩ সালে তার বয়স্ক সঙ্গিনী এলিস টোকলাস অসুস্থ ছিলেন। তখন তার উত্তরাধিকারীরা বাকি চিত্রগুলো সরিয়ে নেয়। আজ এ চিত্রকর্মগুলো বিশ্বের বড় বড় জাদুঘরে শোভা পাচ্ছে। অথচ একসময় এগুলো ছিল তার ছোট্ট বসার ঘরে—একেবারে সাধারণ জীবনের সঙ্গী হয়ে।

গার্ট্রুড স্টেইনের অ্যাপার্টমেন্ট আমাদের শেখায়, শিল্পের প্রদর্শনীর জন্য দরকার নেই বড় কোনো ভবন বা দামি টিকিট। দরকার শুধু খোলা মন আর সাহস করে দরজা খুলে দেয়ার মানসিকতা।

সূত্র: অ্যাপোলো ম্যাগাজিন