নগর বিপ্লবের যুগে আমরা প্রাকৃতিক ও গ্রামীণ সমাজ-সভ্যতা বহু যুগ হলো হারাতে বসেছি। আমরা সভ্য হওয়ার অগ্রযাত্রায় খেয়ে ফেলছি বৃক্ষ, প্রাণী, পাথর, জলাভূমিসহ নানাকিছু। হারাতে বসা এসব অরণ্যের কথাই সুন্দরবন থেকে তুলে এনেছেন একদল অরণ্যপ্রেমী শিল্পী। এ গ্রুপ আর্ট এক্সিবিশনের নামও দিয়েছেন ‘অরণ্যরেখা’। এ আর্ট এক্সিবিশনের আয়োজক ‘আদ্যোপান্ত’। ২০১৯ সালে আদ্যোপান্ত যাত্রা শুরু করে। আহ্বায়ক জেমরিনা হক জানালেন, বিভিন্ন প্রত্যন্ত অঞ্চলে আর্ট ক্যাম্পের আয়োজন করে তারা তাদের ক্যানভাসে তুলে আনেন গ্রামীণ মানুষের জীবনযাত্রা ও ভাষা, প্রকৃতির বালখিল্যতা। আদ্যোপান্তর এবারের গন্তব্য ছিল সুন্দরবন। সুন্দরবনের গহিনের অজানা অনেক রূপবৈচিত্র্য রঙ-তুলিতে ফুটিয়ে তুলেছেন এ শিল্পীরা। আহ্বায়কসহ মোট ১২ শিল্পীর চিত্রকর্ম নিয়ে লালমাটিয়ার ভূমি গ্যালারিতে চলছে প্রদর্শনী ‘অরণ্যরেখা’।
এ দলীয় চিত্র প্রদর্শনীতে অংশ নেয়া শিল্পীরা হলেন ফারজানা রহমান ববি, ইসরাত জাহান, কনক আদিত্য, মামুন হোসাইন, মো. রবিউল ইসলাম, মো. জাহিদ হোসাইন, মনজুর রশীদ, মোরসেনা রহমান রুপা, নার্গিস আক্তার পুনম, শক্তি নোমান, উপমা দাস তৃণা ও জেমরিনা হক।

গ্যালারিতে প্রবেশ করলেই চোখ যাবে হাতের বাম পাশে অপেক্ষারত দুধরাজ পাখির দিকে। সাদা ধবধবে বিশাল লেজ নিয়ে অনবরত যেন মুখ খুলে তারস্বরে বলে যাচ্ছে স্বাগত, অরণ্যরেখায় স্বাগত। হঠাৎ মনে হলো দুধরাজ যেন সত্যিই আমায় ডাকছে। মনজুর রশীদের করা কাজটির সঙ্গে তার আরো কিছু কাজ দেখে নিলাম। কাগজের মিশ্র মাধ্যমে করা সিপাহি বুলবুল ও মাছরাঙা চিত্রকর্মগুলো।
কনক আদিত্যর অ্যাক্রিলিকে করা ভিন্ন রঙের দুটো চিত্রকর্ম পাওয়া গেল। শিল্পীর ভাষায় দুটোতেই একটা শৈল্পিক প্রাণগত মিল আছে, তা হলো healing vein লুকিয়ে আছে। এ healing vein প্রাণ-প্রকৃতির সবকিছুকে অনুকূলে নিয়ে আসে, এটি প্রকৃতিগত একটা শক্তি। শিল্পীকে এরপর দর্শনার্থীদের আসর জমিয়ে গান গাইতে দেখেও আমার তেমনটাই মনে হয়েছে, শিল্পীও মনেপ্রাণে বুঝি এই শক্তি বহন করে চলেছেন।
এসব ভাবছি আর দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ইসরাত জাহানের সেগুন পাতার পেইন্টিং দুটো দেখছিলাম—হলুদ রঙের সেগুন পাতায় বিকালের পড়ন্ত রোদ কিরণ দিয়ে যাচ্ছে। পাতাগুলোয় হলুদ আভা। হলুদ রঙ মনকে প্রফুল্ল করে। কিন্তু মনটা উৎফুল্ল না হয়ে নরম হয়ে এল। প্রয়োজনীয় পুষ্টির অভাবে পাতা মৃত্যুর দিকে যাচ্ছে, ঠিক যেমন মনুষ্যজীবন বেঁচে থাকার রসদ হারিয়ে মৃত্যুর দিকে যাত্রা করে। হলুদ রঙ যেন একদিকে সৌন্দর্য আরেকদিকে মৃত্যুর হাতছানি দিয়ে যাচ্ছে।

আলাদা করে চোখে পড়ল গুণী শিল্পী মামুন হোসাইনের ‘Nature’ সিরিজের চিত্রকর্মগুলো। মিশ্র মিডিয়ায় করা সব কাজের মধ্যে একটা অনন্য বৈশিষ্ট্য আছে, যা দেখলেই বোঝা যায় এটা তার হাতের কাজ। প্রতিটি অংকনশৈলীতেই প্রকাশ পাচ্ছে প্রকৃতির নান্দনিকতা। যেন বলপয়েন্ট দিয়ে টুকটাক টানটোন দিয়ে জীবন্ত করে তুলেছেন প্রাণ-প্রকৃতিকে।
শিল্পী মামুন হোসাইনের সহযাত্রী নার্গিস আক্তার পুনমের চিত্রকর্মগুলো একটু আলাদা। টাইগার ইন ক্যাকটাস ফ্লাওয়ারস শিরোনামের চিত্রকর্মগুলোয় পাশাপাশি রেখেছেন গহিন অরণ্যে বাঘের জীবনঘাতী ভয় এবং ক্যাকটাসের অজস্র কাঁটার আড়ালে সুন্দর ফুলেল জীবন। সুন্দরবনে যেমন রয়েল বেঙ্গল টাইগারেরও আবাসস্থল, তেমনি সৌন্দর্যেরও সহাবস্থান। এ যেন ভয় ও প্রেমের অঙ্গাঙ্গি অবস্থান।
এছাড়া শক্তি নোমানের Verdant Silence শিরোনামের দুটো চিত্রকর্ম আলাদাভাবে চোখে পড়ে। সুন্দরবনের সবুজ প্রাকৃতিক নীরবতার এক মেলবন্ধন তুলে ধরেছেন তিনি। বনের শ্বাসমূল, বাঘ ও হরিণের পদচিহ্ন এবং এসবের বাইরের শীতল নীরব জীবনের ধারাবাহিকতা বর্ণনা করেছেন।
এরই মধ্যে দীপংকর গৌতম দাদার সঙ্গে দেখা। বললাম দাদা ওনাদের কাজ কেমন লাগল। দাদার বোল্ড উত্তর, আরে, ওদের কাজ অনেক পরিণত আর বাস্তবসম্মত। জীবন ও প্রকৃতিসংশ্লিষ্ট বিষয় নিয়ে অ্যাক্রিলিকে সূক্ষ্ম ও অনবদ্য কাজ করেছে ওরা।
প্রদর্শনী দেখা ও গানের আড্ডা তখন তুঙ্গে। জল ও জঙ্গলের কাব্যে তখন তারা সুর ভাঁজছে জলের গানের-পাতায় পাতায় কাব্যগাথা, পাতায় লেখা গান/ শিরায় শিরায় স্বপ্ন আমার ভীষণ অভিমান।
সবশেষে প্রিন্ট অন পেপার মাধ্যমে করা উপমা দাস তৃণার নীল আকাশের নিচে শিরোনামের চিত্রকর্মটি দেখে জলের সুরে টিপটিপ সান্ধ্য বৃষ্টি সঙ্গী করে ফিরে এলাম।










