ইসলামী শিল্পের ইতিহাসে এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ মূল্যে বিক্রি হয়েছে একটি গালিচা। প্রায় নয় ফুট লম্বা এ গালিচা তৈরি হয়েছিল সপ্তদশ শতাব্দীর শুরুর দিকে। ইরানের শাহর সিংহাসনের জন্য তৈরি করা হয়েছিল এটি। ২০১৩ সালে নিউইয়র্কে সদবি’জের নিলামে এটি প্রায় ৩ কোটি ৪০ লাখ ডলারে বিক্রি হয়। কিন্তু বাজারের এ দৃশ্য বদলে গেছে। ইরানের ওপর নানা ধরনের নিষেধাজ্ঞার কারণে দেশটির শিল্পকর্ম মূল্য পাচ্ছে না। ক্রেতারা বরং ঝুঁকছেন ভারতের—বিশেষত মোগল আমলের শিল্পকর্মের দিকে।
শাহর গালিচা নিলামের প্রায় ১০ বছর পরের কথা। লন্ডনের ক্রিস্টি’জ নিলামঘরে সাফাভি আমলে একটি গালিচা ২০-৩০ লাখ পাউন্ড মূল্যে তোলা হয়েছিল। প্রায় নিশ্চিতভাবে সাফাভি রাজাদের জন্য বোনা ৫৫০ বছর পুরনো এ গালিচার উজ্জ্বলতা আজও বিস্ময়কর। ইসলামী বিশ্বের শ্রেষ্ঠ কারিগররা এতে পাখি আর পাকানো লতার নকশা এঁকেছিলেন। লাল উলের ওপর নানা রঙে রাঙানো গালিচাটি সিল্ক রোড পেরিয়ে উত্তর ইরানের কাজভিনে রাজকীয় কারখানায় পৌঁছেছিল। তবু এটি ন্যূনতম মূল্য অর্জনে ব্যর্থ হয়। ঘটনাটি ‘ইসলামী শিল্প’ নামে পরিচিত বিভিন্ন ধারা, শৈলী ও তাৎপর্যের বাজারে পরিবর্তিত পরিস্থিতির ইঙ্গিত দেয়।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বেশকিছু ঘটনার কারণে এ প্রতিক্রিয়া হয়েছে। যেমন সংগ্রাহকদের বয়স বেড়ে যাচ্ছে। কোনো জাদুঘর হয়তো বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে শিল্পের বাজারের পুরনো সংজ্ঞা ও বাস্তবতা বদলে গেছে। এ নমনীয়তাই এখন বাজারকে নতুনভাবে তৈরি হতে সাহায্য করছে। পারস্য প্রভাবিত চিত্রকলার ধারার, যা আধুনিক ইরাক থেকে ভারত পর্যন্ত ফারসিভাষী নানা রাজদরবারের সঙ্গে যুক্ত—গুরুত্ব ও বাজারে প্রভাব হ্রাস পাচ্ছে। সে জায়গায় ভারতের চিত্র ও শিল্পকলার বাজার বড় হচ্ছে।

গত এপ্রিলে সদবি’জের নিলামে ২৭টি ইরানি শিল্পকর্ম তোলা হয়েছিল। এর মধ্যে ১৪টিই অবিক্রীত থেকে গেছে। মূল্য কমে যাওয়ার চেয়েও এটি বড় কোনো বিষয়ের ইঙ্গিত করে। বোঝায় যে মূল্যের সঙ্গে চাহিদা ও গুরুত্বও কমে গেছে। একই সংস্থার অক্টোবর ২০২৪-এর নিলামে (কিছুটা ছোট আকারে আয়োজিত) ২২টি ইরানি অ্যান্টিক (মূলত পাণ্ডুলিপি ও প্রাচীন ধাতব শিল্পকর্ম) তোলা হয়। এর মধ্যে নয়টি বিক্রি হয়নি।
লন্ডনভিত্তিক ইসলামী শিল্প ব্যবসায়ী মেহমেত কেস্কিনারের মতে, এ ঘটনার মূল নেপথ্য কারণ ভূরাজনীতি। ইরানের ইসলামিক প্রজাতন্ত্রের ওপর নিষেধাজ্ঞার কারণে ‘ইরানি উৎস’র শিল্পকর্ম যুক্তরাষ্ট্র বা সংযুক্ত আরব আমিরাতে আইনত রফতানি করা যায় না (এমনকি ইউরোপ থেকে কেনা হলেও)। এ নিয়ে তিনি বলেন, ‘ফেডএক্সের মতো প্রতিষ্ঠান পারস্যের শিল্পকর্ম পরিবহন করতে চায় না। তাই এগুলো ক্রেতাদের কাছে কম আকর্ষণীয় হয়ে পড়ছে।’
সদবি’জের মধ্যপ্রাচ্য বিভাগের সাবেক উপচেয়ারম্যান রোকসানে জান্ড বলেন, ‘ইরানের বর্তমান পরিস্থিতির কারণে ইরানি শিল্প সংগ্রাহকরা সতর্ক। ফলে পারসিক শিল্পের বিক্রি মন্দায় পড়েছে।’
শিল্পকর্ম ব্যবসায়ী ড্যামিয়েন হোর মনে করেন ইরানিদের প্রজন্মগত পরিবর্তনও এর কারণ। তিনি বলেন, ‘অতীতে যারা নিজেদের ঐতিহ্য রক্ষায় নিবেদিত ছিলেন, সেসব উৎসাহী ও রসজ্ঞ ইরানি সংগ্রাহকদের সংখ্যা কমে যাচ্ছে।’
এদিকে কেস্কিনারের পর্যবেক্ষণ হলো তরুণ প্রজন্ম ক্ল্যাসিকের চেয়ে সমকালীন শিল্পে বেশি আগ্রহী। যার কারণে মোটের ওপর বাজার অনেকটা সংকীর্ণ হয়ে গেছে। একে তো ক্রেতারা দুর্বল ও অস্থিতিশীল বাজারে আগ্রহী নন। অন্যদিকে জাদুঘরগুলো এরই মধ্যে অনেক গুরুত্বপূর্ণ অ্যান্টিক শিল্পকর্ম কিনে ফেলেছে। এখন বেশির ভাগ ক্ষেত্রে মাঝারি মানের আকর্ষণীয় কাজগুলো কেবল মালিকের মৃত্যু হলে বিক্রির সুযোগ পায়। তবে হোর বলেন, ‘শাহ তাহমাসপের শাহনামার ক্ষুদ্র চিত্রগুলোর মতো শ্রেষ্ঠ মানের কাজ এখনো ভালো দাম পাচ্ছে।’
উল্লেখ্য, এমন একটি পাণ্ডুলিপি ২০২২ সালে লন্ডনে ৮০ লাখ পাউন্ডে বিক্রি হয়েছিল এবং আরো কয়েক ডজন এখনো ব্যক্তিগত সংগ্রহে রয়েছে।
একই সঙ্গে মোগল শিল্পের মূল্যও ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। এটি আন্তর্জাতিক শিল্পবাজারে দক্ষিণ এশীয় পুঁজির উত্থানের প্রতিফলন। গত বছরের এপ্রিলে সদবি’জের একটি নিলামে বাবুরের একটি ক্ষুদ্র চিত্র (মিনিয়েচার পেইন্টিং) ৫ লাখ ৩০ হাজার পাউন্ডেরও বেশি দামে বিক্রি হয়েছে (এটি ছিল অনুমানের প্রায় ২০ গুণ)। ছবিটি সপ্তদশ শতাব্দীতে খুররম অ্যালবামের অন্তর্ভুক্ত।
তবে ইসলামী শিল্পের সবকিছুই হারিয়ে যায়নি। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সৌদি পৃষ্ঠপোষকতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। তারা ধর্মীয় তাৎপর্যসম্পন্ন শিল্পকর্মকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। এ বছরের ইসলামিক আর্ট উইকে রাজা তৃতীয় চার্লস প্রতিষ্ঠিত অলাভজনক সংস্থা টারকয়েজ মাউন্টেন সৌদি আরবের কিং আবদুল আজিজ সেন্টার ফর ওয়ার্ল্ড কালচারের (ইথরা) জন্য তৈরি কিছু শিল্পকর্ম সদবি’জে প্রদর্শন করবে। এর মধ্যে রয়েছে আফগান কাঠের কাজ ও সিরিয়ান মারকেট্রি।
ইসলামী শিল্প যখন ক্রমে সমকালীন ধারার দিকে এগোচ্ছে—জেদ্দা ও বুখারার নতুন বিয়েনালে ইসলামী বিশ্বের চিত্রশৈলীর নতুন দৃষ্টিভঙ্গিকে আলোকিত করছে—তখন সেটি বাজারেও প্রতিফলিত হবে বলে আশা করা হচ্ছে। জান্ড বলেন, ‘এটি অঞ্চলভিত্তিক ঐতিহ্যনির্ভর শিল্পচর্চার বৃদ্ধি নির্দেশ করে। একসময় ইসলামী শিল্প আর শুধু প্রাচীন শিল্পকর্মকে বোঝাবে না।’










