শাসকমাত্রই নিজের ক্ষমতা প্রকাশ করতে পছন্দ করেন। এজন্য তারা বেছে নেন নানা মাধ্যম। শিল্প-সংস্কৃতি এক্ষেত্রে বড় ভূমিকা পালন করে। গল্প, কবিতা, গান, চিত্রকর্ম এক্ষেত্রে ক্ষমতার বার্তা দেয়ার হাতিয়ার। গোত্রপতি থেকে শুরু হওয়া শাসন ব্যবস্থা একসময় রাজা-বাদশায় পৌঁছায়। তাদের গুণকীর্তন করে কবিরা কবিতা লিখতেন, গান বাঁধা হতো। রাজার থাকত নিজস্ব সভাকবি। তারা রাজার প্রশস্তি করে কবিতা লিখতেন। কখনো সেসব ছড়িয়ে দেয়া হতো রাজ্যময়। তবে মোগল বাদশারা ছিলেন আরেকটু এগিয়ে। ভারতে মোগল শাসনামলে তারা ইতিহাস রচনা (ঘটনাবলি লিপিবদ্ধ রাখা), দেশী-বিদেশী গ্রন্থের অনুবাদের পাশাপাশি চিত্রকর্মে পৃষ্ঠপোষকতা করেছিলেন। কিছু ক্ষেত্রে তারা ফরমায়েশি চিত্র আঁকাতেন শিল্পীদের দিয়ে। এসব চিত্রকর্মের অনেকগুলোর মধ্যে মূলত ক্ষমতার বার্তা দিয়েছেন তারা। বাদশা জাহাঙ্গীর তাদের মধ্যে অন্যতম।
ফরমায়েশি ছবি আঁকানো নতুন কোনো বিষয় নয়। চিত্রকর্ম শুরু হওয়ার পর থেকেই ক্ষমতাবানরা ভবিষ্যতে নিজেদের ধরে রাখার জন্য শিল্পীদের ডেকে এনে তাদের ছবি তৈরি করাতেন। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দেখা গেল এতে যুক্ত হচ্ছে নতুন নতুন উপাদান। মোগল আমলে এমন অনেক ছবি পাওয়া যায় যা বাদশা, শাহজাদা, মোগল বংশের জৌলুস ও ক্ষমতা প্রকাশ করে।

১৬০৩ খ্রিস্টাব্দ। সেলিম তখনো শাহজাদা। এ সময় তিনি একটি ছবি আঁকতে নির্দেশ দেন মোগল চিত্রকর মোহনকে। ছবিতে দেখা যায় হুমায়ূন (সেলিমের দাদা) নীল রঙে নকশা করা একটি দামি গালিচায় বসে আছেন। তিনি সাদীর বোস্তাঁ পড়ছেন। আর তার চারপাশ এমনভাবে তৈরি যাকে পারস্য ধারার জান্নাত বলা চলে। আর হুমায়ূনের চারপাশে রাখা আছে বেশকিছু জিনিস। এর মধ্যে আছে একটি কলমের বাক্স, একটি পাণ্ডুলিপি, একটি পোর্টফোলিও গোছের বস্তু। কিন্তু মন দিয়ে লক্ষ করলে চোখ পড়বে একটি ধাতব চাকতির দিকে। জিনিসটি আসলে অ্যাস্ট্রোল্যাব। মোগল-পরবর্তী সময়ে ছবিটি নতুন করে তৈরি করা হয়েছে এবং এখন তা হুমায়ূনের সমাধিতে প্রদর্শিত হয়।
হেলেনিস্টিক পিরিয়ডে তৈরি হয়েছিল অ্যাস্ট্রোল্যাব। এটি জ্যোতির্বিদ্যাচর্চায় ব্যবহার করা হতো। এর দুটি ভাগ ছিল যা নিয়মানুযায়ী ক্রমাঙ্কন করে নক্ষত্র পর্যবেক্ষণ, দিক্নির্ণয় ইত্যাদি করা যেত। মোহনের এ ছবিতে অ্যাস্ট্রোল্যাব ব্যবহার করে হুমায়ূনকে তার জ্ঞান ও চর্চার ক্ষেত্রে আলাদা মাত্রা দেয়া হয়েছে।
আবুল ফজল তার ‘আকবরনামা’য় হুমায়ূনের প্রশংসা করতে গিয়ে তাকে ‘তত্ত্ব ও অনুশীলনের ক্ষেত্রে অ্যাস্ট্রোল্যাবের অ্যালিডেড’ বলে অভিহিত করেছেন। অ্যালিডেড মূলত অ্যাস্ট্রোল্যাবের পেছনে থাকা একটি নির্দেশক। এটি ঘুরিয়েই নক্ষত্র ও আকাশ পর্যবেক্ষণ করা হতো। হাতের তালুতে অ্যাস্ট্রোল্যাব নিয়ে নক্ষত্র ও আকাশ পর্যবেক্ষণ করা আকাশকে হাতের তালুতে নিয়ে আসার শামিল কল্পনা করা হয়। আর হুমায়ূনের ছবিতে অ্যাস্ট্রোল্যাব রাখার মাধ্যমে বোঝানো হলো এ সার্বভৌম মোগল শাসক আকাশকেও শাসন করেন। তবে অন্য কোনো মোগল বাদশাকে অ্যাস্ট্রোল্যাবসহ চিত্রিত করা হয়নি। সেদিক থেকে বলা যায় এটি বৌদ্ধিক নানা বিষয়ে হুমায়ূনের আগ্রহকে নির্দেশ করে। জাহাঙ্গীরের আমলের আরো অনেক চিত্র ক্ষমতার প্রকাশকে নির্দেশ করে। তবে তার আগে এ ছবি নিয়ে আরেকটু বিশ্লেষণ প্রয়োজন।

বিজ্ঞান ইতিহাসবিদ শ্রীরামুলা রাজেশ্বর শর্মা তার ১৯৯৪ সালের প্রবন্ধ ‘দ্য লাহোর ফ্যামিলি অব অ্যাস্ট্রোল্যাবিস্টস অ্যান্ড দেয়ার ওভারেজ’-এ লেখেন যে উপমহাদেশে এখন পর্যন্ত টিকে থাকা প্রাচীনতম অ্যাস্ট্রোল্যাবগুলোর সঙ্গে হুমায়ূনের সম্পর্ক রয়েছে। এ যন্ত্রগুলো সবই লাহোরভিত্তিক একটি পরিবারের দ্বারা নির্মিত। এর প্রধান ব্যক্তি ছিলেন দ্বিতীয় মোগল বাদশার রাজকীয় অ্যাস্ট্রোল্যাববিদ। ওই বংশের কর্তা উস্তাদ আল্লাহদাদ অ্যাস্টারলুবি লাহোরির স্বাক্ষরযুক্ত দুটি অ্যাস্ট্রোল্যাব এখনো টিকে আছে। এর একটি ১৫৬৭ সালের, হায়দরাবাদের সালার জং মিউজিয়ামে সংরক্ষিত এবং অন্যটি ১৫৭০ সালের, অক্সফোর্ডের হিস্ট্রি অব সায়েন্স মিউজিয়ামে সংরক্ষিত। শর্মা উল্লেখ করেন, উভয়টিই সাফাভি প্রভাবিত হলেও একটি স্বতন্ত্র ভারতীয় নকশাশৈলী উপস্থাপন করে।
দুটি বৈশিষ্ট্য বিশেষভাবে চোখে পড়ে: একটি হলো উঁচু কুরসি বা সিংহাসন, যা অ্যাস্ট্রোল্যাবের মূল দেহকে ঝোলানোর রিংয়ের সঙ্গে যুক্ত করে (হায়দরাবাদ অ্যাস্ট্রোল্যাবে এটি নিশ্ছিদ্র, আর অক্সফোর্ডটিরটিতে ছিদ্রযুক্ত); অন্যটি হলো রেটের (অ্যাস্ট্রোল্যাবের অংশ) জটিল কারুকার্য (হায়দরাবাদ অ্যাস্ট্রোল্যাবে বাঘের থাবার নকশা এবং অক্সফোর্ডটিরটিতে পুষ্প ও পাখির আরবেস্ক)। এ উপাদানগুলো একত্রে একটি ইন্দো-পারসিক নান্দনিকতা তুলে ধরে।
অনেকে বলতে চান হুমায়ূনের ছবিতে অ্যাস্ট্রোল্যাব থাকলেও বৈজ্ঞানিক যন্ত্রটি তার সময়ের পরে নির্মিত। তবে আল্লাহদাদের পুত্র ইশা এর একটি সংস্করণের নাম ‘হুমায়ূনী’ রেখেছেন, যা থেকে বোঝা যায় এটি হুমায়ূনের আমলেই তৈরি। যদি তা না-ও হয়, এতে বাদশা হুমায়ূনের সরাসরি পৃষ্ঠপোষকতা ছিল।
জাহাঙ্গীর এ ছবি নির্দেশ দিয়ে তৈরি করিয়েছিলেন। তার শাসনামলে এমন আরো কিছু ছবি তৈরি হয়েছিল। এর মধ্যে একটি ছবি খুবই বিখ্যাত। এতে তাকে একটি গ্লোব হাতে নিয়ে বসে থাকতে দেখা যায়। তার মাথার পেছনে দেখা যায় সূর্য। এ ছবির মধ্য দিয়ে জাহাঙ্গীরকে পৃথিবীর বাদশা বলে প্রকাশ করা হয়। ছবিটি মোগল মিনিয়েচারের বিখ্যাত চিত্রকর আবুল হাসান এঁকেছেন।
এখানেই শেষ নয়। জাহাঙ্গীরের মৃত্যুর পর আবুল হাসানকে দিয়ে আরেকটি ছবি তৈরি করিয়েছিলেন শাহজাহান। এ ছবিতে দেখা যায় জাহাঙ্গীর একটি আসনের ওপর দাঁড়ানো। তার কোমরের বাম দিকে ঢাল ও তলোয়ার ঝোলানো। তার ডান হাতে একটি গ্লোব। এতে নানা ধরনের প্রাণী অঙ্কিত। এ গ্লোব যে পৃথিবী তাতে কোনো সন্দেহ নেই। ছবি দিয়ে বোঝানো হলো জাহাঙ্গীর তার হাতের মধ্যে পৃথিবীকে রাখেন।
আবুল হাসান ও জাহাঙ্গীরের সম্ভবত গ্লোব নিয়ে অবসেশন ছিল। তার আঁকা ছবি দেখলে এমনটাই মনে হয়। আগে উল্লিখিত ছবিটি জাহাঙ্গীরের মৃত্যুর পর তৈরি হলেও তিনি বেঁচে থাকতে নিজেই একটা ছবি তৈরি করিয়েছিলেন। মূলত ছবিটি তিনি মালিক অম্বরের বিরুদ্ধে রাগ থেকে তৈরি করিয়েছিলেন।
১৬২০ খ্রিস্টাব্দে আবুল হাসানের আঁকা এ ছবিতে দেখা যায় ছবির সবচেয়ে নিচের অংশে আছে একটি মাছ, তার গায়ের ওপর একটি ষাঁড়। ষাঁড়টি বহন করছে পৃথিবীকে। মূলত পৃথিবীকে ধরে রাখার এ বয়ান পৌরাণিক। নানা পুরাণে নানাভাবে এ বর্ণনা আছে। সেটি নিয়ে জাহাঙ্গীর নিজেকে উপস্থাপন করেছেন। গ্লোব তথা পৃথিবীর ওপর নিজেকে তুলে নেয়ার মানে হলো তিনি পৃথিবীর চেয়েও বড়। জাহাঙ্গীর শব্দের অর্থও বিশ্বজয়ী। এ ছবির গ্লোবে একটি সিংহ ও একটি ছাগল অঙ্কিত। এর মধ্য দিয়ে শিকার ও তার শিকারিকে বোঝানো হয়েছে। আর সেটাই চিত্রিত হয়েছে সম্পূর্ণ ছবিতে।
দেখা যায় জাহাঙ্গীর ধনুক দিয়ে তীর ছুড়তে উদ্যত। তার নিশানা একটি দীর্ঘ দণ্ডের শীর্ষে রাখা একটি মুণ্ডুতে। মুণ্ডুটি মালিক অম্বরের। মালিক অম্বর ছিলেন আহমদনগর সালতানাতের উজির। দীর্ঘদিন চেষ্টা করেও জাহাঙ্গীর আহমদনগরের ওপর নিজের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে পারেননি। এর কারণ ছিলেন মালিক অম্বর। তার ক্ষুরধার বুদ্ধি, সমরকৌশল আহমদনগরকে বাঁচিয়েছিল। কিন্তু জাহাঙ্গীরের কোপ থেকে বাঁচতে পারেননি। তবে অন্যদিক থেকে বলতে গেলে এ ছবি জাহাঙ্গীরের অক্ষমতারই প্রকাশ।
এ নিবন্ধে আলোচিত ছবিগুলো সরাসরি ক্ষমতাকে প্রকাশ করেছে। এর বাইরেও মোগল আমলে বিভিন্ন চিত্রকর্মে নানা মোটিফ, প্রতীক এমনকি চরিত্রকে যে অবস্থানে রাখা হয়েছে তার মাধ্যমেও ক্ষমতা ও অবস্থানের প্রকাশ রাখা হয়েছে।










