জীবনধারণের জন্য মানুষের ছিল নানা সন্ধান। মূলত খাদ্যের সন্ধান। সেখানে একটা সময় গুরুত্বপূর্ণ ছিল শিকার। পশু শিকার করে তারা দীর্ঘদিন জীবন ধারণ করেছিল। এরপর কৃষির উন্মেষ হলে একটা সময় পর শিকারের প্রয়োজন ছিল না। মানে অনিবার্য ছিল না শিকার। তবে পশুর মাংসের জন্য শিকার প্রয়োজন ছিল। আরো পরে পশুকে পোষ মানিয়ে ঘরে তাদের পালন করে মাংসের চাহিদা মেটানো যেত। আবার সে সময়ও বন্যপ্রাণী শিকার হতো। এরপর একটা সময় শিকার পরিণত হয় বিনোদন ও ক্ষেত্রবিশেষে পেশায়। আরণ্যক জাতিগোষ্ঠীর জন্য যা ছিল পেশা, রাজরাজড়াদের কাছে তা ছিল অবসর বিনোদন। কখনো আভিজাত্যের পরিচয়। মধ্যযুগ, মোগল যুগে ভারতে শিকার রীতিমতো আভিজাত্যের প্রতীক হয়ে ওঠে। তাই এ নিয়ে চিত্রকর্মের সংখ্যাও কম নয়।

ভারতীয় পুরাণে শিকারের অনেক গল্প আছে। রামায়ণে তাকালে দেখা যাবে, রাজা দশরথ যদি শিকারে না যেতেন তাহলে রামকে বনবাসে যেতে হতো না। কেননা শিকারে গিয়ে তিনি ভুল করে শ্রাবণ কুমারকে হত্যা করেছিলেন। আবার রাজা পাণ্ডু ভুল করে হত্যা করেছিলেন মৃগরূপী কিন্দম ঋষিকে। তারপর তিনিও বনবাস বেছে নেন। এত কিছুর পরও শিকার ওই দুই বংশেই চলেছে। ভারতের মিথ, কিংবদন্তি ও লোকগল্প শিকার কাহিনীতে ভরা। তাই ভারতে আধুনিক, প্রাক-আধুনিক যুগে শিকার নিয়ে তৈরি হয়েছে শিল্পকর্ম। তারও আগে তৈরি হয়েছিল গুহাচিত্র।

5

ভোপালের বিখ্যাত গুহা ভীমবেটকা। সেখানে শিকারের গুহাচিত্র আছে। ধারণা করা হয় এর বয়স ৩০ হাজার বছরের বেশি। আর প্রায় এক লাখ বছর আগে থেকে এ অঞ্চলে মনুষ্য বসতিরও ইঙ্গিত দেয় এই গুহা ও গুহাচিত্র। তবে এ চিত্রগুলো যে শিকারের নিদর্শন বহন করে সেই শিকার ছিল খাদ্যের জন্য। এছাড়া নিরাপত্তার জন্যও প্রয়োজন ছিল। পরবর্তী সময়ে তা বিনোদন ও ক্ষেত্রবিশেষে বীরত্বের মানদণ্ড হিসেবেও জায়গা করে নেয়। আর রাজরাজড়ারা রীতিমতো সরকারিভাবে শিকারের আয়োজন করার পাশাপাশি তার বর্ণনা ও চিত্রকর্ম করিয়ে রাখতেন। এ কাজে পারস্যের শাহ ও মোগল বাদশাহদের তুলনা ছিল না।

এসব ছবির মধ্যে আবার ইতিহাসও পাওয়া যায়। যেমন ৫০০ বছর আগের একটি মিনিয়েচারে দেখা যায় মোগল বাদশাহ বাবর একটি গন্ডার শিকার করছেন। তিনি এ শিকার করেছিলেন পাঞ্জাবে। গ্রিক ইতিহাসে পাওয়া যায় আলেকজান্ডার ভারত আক্রমণ করার সময় সেখানে গন্ডার ছিল। অবাক হয়েই ভাবতে হয় যে ৫০০ বছর আগেও পাঞ্জাব থেকে গুয়াহাটি পর্যন্ত গন্ডার দেখা যেত। বাবর তার রোজনামচায়ও লিখেছেন গন্ডার শিকারের কথা।

7

ছবিটিতে দেখা যায় মোটামুটি বড় একটি মোগল বহর এ শিকারে গিয়েছিল। তাদের শিকারের বাহন ছিল ঘোড়া ও হাতি। কিছু লোক পায়েও চলছিল। বাবর ছিলেন ঘোড়ার পিঠে। মোগল মিনিয়েচারের সব বৈশিষ্ট্যই আছে ছবিটিতে। এটি এখন দেখা যায় দিল্লির জাতীয় জাদুঘরে। কোটার রাজা প্রথম রাও রাম সিংও গন্ডার শিকার করেছেন অষ্টাদশ শতাব্দীতে। সে ছবি মোগল মিনিয়েচারের তুলনায় সাদামাটা। তবে চিত্রকর্মে রাজপুত পোশাক, চেহারার ধাঁচ ও অঙ্কন বৈশিষ্ট্য আছে।

সথবি’সে থাকা আরেকটি মোগল মিনিয়েচারে দেখা যায় একই সঙ্গে হাতি ও গন্ডার শিকার করছে মোগলরা। সেখানে কোনো বাদশাহ নেই। তবে হাতি শিকার করতে ব্যবহার হচ্ছে আরেকটি হাতি। আগা খান মিউজিয়ামে থাকা আরেকটি ছবিতে দেখা যায় জাহাঙ্গীরের শিকার। তবে জাহাঙ্গীর শিকার করছিলেন একটি সিংহ। এ ছবিতেও মিনিয়েচারের সব বৈশিষ্ট্য আছে। পাশাপাশি ছবিতে দৃশ্যমান যে বাবরের চেয়ে বড় বাহিনী নিয়ে শিকারে গিয়েছিলেন জাহাঙ্গীর। ছবিতে একাধিক সিংহের উপস্থিতি রেখেছেন শিল্পী, যার একটি জাহাঙ্গীর শিকার করছেন এবং অন্যটি দুজন মোগল সেনাকে আক্রমণ করছে। এর মধ্য দিয়ে বাদশাহকে বড় করে দেখানোরও একটা চেষ্টা ছিল।

8

ভারতের রাজা-মহারাজারা কেবল স্থলে নয়, জলেও শিকার করেছেন। ১৭৬০ সালের একটি রাজপুত চিত্রকর্মে দেখা যায় মহারাহা ঈশ্বরী সিং পানিতে নেমে কুমির শিকার করছেন। তার সঙ্গে ছিল রাজপুত সেবক ও তার বন্ধুরা। আর কুমিরটি খাঁচায় বন্দি করার জন্য নদীর পাড়ে অপেক্ষা করছে মহারাজার পারিষদ, সেবক ও অন্যরা।

কেবল মোগল আর রাজপুত নয়, স্থানীয় রাজারাও শিকার করেছেন। ১৯১৭ সালের একটি চিত্রকর্মে দেখা যায় মেওয়ারের মহারাজা ফতেহ সিং ভালুক শিকার করছেন। প্রায় ন্যাড়া একটা জঙ্গলে বড় একটি গাছের ওপর বন্দুক নিয়ে অপেক্ষা করছেন রাজা ও তার সঙ্গী। দুটি ভালুক গুলি খেয়ে পড়ে যাচ্ছে—ছবিটি এমন।

মহারাণা জগৎ সিংয়ের শিকার করার একটি ছবিও উল্লেখযোগ্য। মোগল মিনিয়েচারের ধাঁচে আঁকা এ ছবিতে দারুণ ডিটেইলিং দেখা যায়। মহারাণা তার শিকারের জন্য রীতিমতো পারিষদদের যুদ্ধের মতো সাজিয়ে ফেলেছেন বলেই মনে হয়। শিকারে বাজপাখি ব্যবহার হতো, এ ছবিতে তারও উল্লেখ আছে। এছাড়া ওই সময় বন্য শূকর ও বন্য কুকুরও শিকার করা হতো।

9

মোগলদের শিকারে আবার ফেরা যাক। শাহজাহান হরিণ শিকার করেছেন, এমন একটি ছবিতে দেখা যায় ব্ল্যাক বাক (কালো হরিণ) শিকারের জন্য বাদশাহ চিতা বাঘকে ব্যবহার করছেন। তিনটি চিতা ছুটে যাচ্ছে। পেছনে ঘোড়ার ওপর বাদশাহ এবং পাশে গরুর গাড়িতে রসদ। কেবল বাদশাহ না, শিকার করতেন বেগমরাও। নূরজাহান নিজ হাতে গুলি চালিয়ে বা বর্শা দিয়ে বাঘ মেরেছেন, এমন কথা ইতিহাসে পাওয়া যায়। ওস্তাদ হাজি মোহাম্মদ শরীফ (জন্ম ১৮৮৯) এমন একটি ছবি এঁকেছেন। বিজাপুরের চাঁদবিবি তার সখীদের নিয়ে হরিণ শিকার করছেন, এমন ছবি আছে ভিক্টোরিয়া অ্যান্ড অ্যালবার্ট মিউজিয়ামে। মাণ্ডুর রূপমতী ও বাজ বাহাদুর একসঙ্গে হরিণ শিকার করছেন ঘোড়ায় চড়ে, এমন পেইন্টিংও পাওয়া যায়।

আবার শিকার যে সবসময় বিনোদন, বীরত্বের জন্য করা হতো এমন নয়। অনেক সময় মানুষ শিকার করতে বাধ্য হতো। শিখ গুরু গোবিন্দ সিং একটি সিংহ হত্যা করেছিলেন। তবে তিনি নিজের ইচ্ছায় নয়, গ্রামবাসীর অনুরোধে শিকার করেছিলেন সিংহটি। কেননা এর হাতে গ্রামের মানুষ মারা গিয়েছিল। শিকারের সেই স্থানটি এখন গুরুদুয়ারা শেরগড় নামে পরিচিত।