ছাপচিত্র হলো একটি চিত্র বা নকশা যা কোনো ব্লক, প্লেট বা স্ক্রিন ব্যবহার করে কাগজ কিংবা অন্য পৃষ্ঠায় ছাপানো হয়। এ মাধ্যমে একাধিক কপি তৈরি করা যায়। আরো সহজ করে বললে, আগে থেকে নকশা করা কোনো ছাঁচের ওপর উপযুক্ত কালি লাগিয়ে এক টুকরো কাগজ বা অন্য কোনো পৃষ্ঠতলে প্রতিরূপকে স্থানান্তরের মাধ্যমে ছাপ তৈরি হয়। ছাপের মাধ্যমে অঙ্কিত ওই চিত্রই ‘ছাপচিত্র’। এটি সংখ্যায় এক বা তার অধিক হতে পারে। তবে মৌলিকত্ব অটুটু থাকে।

বর্তমানে ছাপচিত্র জনপ্রিয় শিল্পমাধ্যম। এটি শুরুতে চিঠিপত্র ও বই-পুস্তকের অলংকরণের জন্য শুরু হয়েছিল। পরে চিত্রশিল্পীদের মধ্যেও জনপ্রিয়তা পায়। ১৯৬৪ সালের আগে ছাপচিত্রকে গ্রাফিক আর্ট হিসেবে বিবেচনা করা হতো, কিন্তু পরে চারুশিল্পের অংশ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়।

বাংলাদেশে ছাপচিত্রের সৃজনশীল চর্চা নতুন হলেও এখানে ছাপ বা মুদ্রণের বহু লোকজ রীতি ছিল, আছে। ঢাকার মানুষ কাপড় অলংকরণ, ছাপাঙ্কিত মুদ্রা, আলপনা, কড়ির ছাপ বা হাত-পায়ের ছাপের মতো বিভিন্ন পদ্ধতি ব্যবহার করত। শখের বশে মাটি, কাঠ বা ধাতব পৃষ্ঠে নকশা আঁকা এবং তা থেকে ছাপ নেয়াও দেখা যায়। বস্ত্র অলংকরণের জন্য বাঁক বা সিলমোহর তৈরি করা হতো। সাম্প্রতিক গবেষণায় সুন্দরবন ও কুমিল্লা থেকে ধাতু খোদাইয়ের প্রাচীন নিদর্শন পাওয়া গেছে, যা স্থানীয় ছাপচিত্রের অতীত ইতিহাসের প্রমাণ।

11

উনিশ শতকের মধ্যভাগে আধুনিক মুদ্রণ পদ্ধতি কলকাতা থেকে এসে ঢাকায় ছাপাই ছবির একটি বাজার তৈরি করে। তবে এখানে সুযোগ-সুবিধা সীমিত ছিল। ঢাকার হিন্দু সম্প্রদায়ের মালিকানাধীন প্রকাশনায় কিছুটা অলংকরণ দেখা যেত, কিন্তু মুসলিম প্রকাশনায় সাধারণত সাদাসিধে লেখা বা লতাপাতার নকশা থাকত।

মোহাম্মদ নাসিরউদ্দীনের সম্পাদনায় ১৯১৮ সালে সওগাতের প্রথম সচিত্র সংখ্যা প্রকাশিত হয়। এটি রক্ষণশীল মুসলমান সমাজে প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। তবে ১৯১৮ সালে চট্টগ্রামে অনুষ্ঠিত সর্বদলীয় মুসলমান মহাসম্মেলনের ছবি তুলতে প্রথমবার আপত্তির মুখে পড়লেও পরে সেগুলো সওগাতের ১৯২৫ সালের ফাল্গুন সংখ্যায় প্রকাশিত হয়, যা বাংলায় মুসলমান সম্মেলনের সচিত্র প্রকাশনার প্রথম ঘটনা।

বিশ শতকের গোড়ার দিকে মুসলমান সমাজে চিত্রকলা ও ইসলামের বিরোধ নিয়ে বিতর্ক চলছিল। তৎকালীন প্রগতিশীল সাহিত্যিক মোহাম্মদ আকরম খাঁ ‘চিত্রকলা ও এছলাম’ শীর্ষক প্রবন্ধে ইসলামের সঙ্গে শিল্পের বিরোধহীনতার কথা তুলে ধরলেও তিনি সমালোচনার মুখোমুখি হন। ধীরে ধীরে শিক্ষিত ও মুক্তচিন্তক মুসলমানরা সচিত্র বই-পুস্তক প্রকাশে উদ্যোগী হন।

12

বাংলাদেশে ছাপচিত্রচর্চার মূলধারার সূচনা হয় ১৯৪৮ সালে জয়নুল আবেদিন এবং তার সঙ্গীদের ঢাকার আর্ট ইনস্টিটিউট স্থাপনের মাধ্যমে। শিল্পশিক্ষার এ প্রতিষ্ঠান কলকাতার গভ. স্কুল অব আর্টের অনুসরণে গড়ে ওঠে। সফিউদ্দিন আহমেদ, জয়নুল আবেদিন, হবিবর রহমানসহ প্রথম দফার শিল্পী-শিক্ষকরা পাঠ্যক্রমে ছাপচিত্র অন্তর্ভুক্ত করেন এবং এটি দেশের মূলধারার ছাপচিত্রচর্চার ভিত্তি স্থাপন করে। শুরুতে জয়নুল আবেদিন, কামরুল হাসান, সফিউদ্দিন আহমেদ, হবিবর রহমান প্রমুখ শিল্পী চিত্রশিল্পের পাশাপাশি ছাপচিত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। এছাড়া খাজা শফিক আহমেদ, হাবিবুল্লাহ খান, মুস্তফা আজিজ প্রমুখ শিল্পীও কাঠ খোদাই, এচিং ও লিথোগ্রাফ মাধ্যমে অনুশীলনধর্মী ছাপচিত্র তৈরি করেন।

পঞ্চাশের দশকের শুরুতে ঢাকার প্রথম প্রজন্মের চিত্রশিল্পীরা ছাপচিত্রচর্চায় সক্রিয় হন। ঢাকার আর্ট গ্রুপের দুটি প্রদর্শনী ছাপচিত্রকে সংশ্লিষ্টদের কাছে পরিচিত করে। শুরুতে প্রয়োজনীয় উপকরণ ও যন্ত্রের অভাবে সাদা-কালো উডকাট ও উড-এনগ্রেভিং মাধ্যমে কাজ শুরু হলেও পঞ্চাশের দশকের প্রথমার্ধে লিথোগ্রাফি মাধ্যমও অন্তর্ভুক্ত হয়। তখন ছাপচিত্র প্রধানত ঐচ্ছিক বিষয় হিসেবে শিক্ষার্থীরা চর্চা করতেন।

এ প্রজন্মের শিল্পীদের মধ্যে রশিদ চৌধুরী, আব্দুর রাজ্জাক, মুর্তজা বশীর, নিতুন কুন্ডু এবং কলকাতা থেকে ফেরা মোহাম্মদ কিবরিয়াও উল্লেখযোগ্য অবদান রাখেন। এছাড়া হামিদুর রাহমান, আমিনুল ইসলাম, দেবদাস চক্রবর্তী ও কাইয়ুম চৌধুরীও ছাপচিত্রে কিছু শিল্পকর্ম তৈরি করেন। তবে পঞ্চাশের দশকে সফিউদ্দিন আহমেদ একমাত্র ধারাবাহিকভাবে নিজেকে ছাপচিত্রে নিয়োজিত রাখতে সক্ষম হন।

13

ষাটের দশকের শুরুতে ১৯৬৩ সালে ঢাকার গভর্নমেন্ট আর্ট ইনস্টিটিউট ‘ইস্ট পাকিস্তান কলেজ অব আর্টস অ্যান্ড ক্রাফটস’-এ রূপান্তরিত হয়। এ সময় নতুন লিথোগ্রাফিক প্রেস ও এচিং যন্ত্র আগমনের সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষার্থীদের মধ্যে আগ্রহ ও উদ্দীপনা বৃদ্ধি পায়। তবে ষাটের দশকে রাজনৈতিক ও সামাজিক কারণে সামগ্রিক ছাপচিত্রচর্চার বিস্তার সীমিত থাকে। সফিউদ্দিন আহমেদ ও মো. কিবরিয়া ছাড়া আর কেউ ধারাবাহিকভাবে এ মাধ্যমের সঙ্গে যুক্ত থাকতে পারেননি। হুসনে জামাল, রঞ্জিত নিয়োগী, নাসির বিশ্বাস, হাশেম খান, দেলোয়ার হুসেন, রহিত নন্দী, প্রফুল্ল রায় প্রমুখ শিক্ষার্থী ও নবীন শিল্পীরা এ মাধ্যমের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন, যদিও অনেকেই পরবর্তী সময়ে সীমাবদ্ধতার কারণে ধারাবাহিকভাবে চর্চা চালাতে পারেননি।

পরের দশকে অবশ্য ছাপচিত্রাঙ্কনে অগ্রগতি হয়। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হয়। মুক্তিযুদ্ধের পর ঢাকার আর্ট কলেজও পুনর্গঠন করা হয়। নাম হয় ‘বাংলাদেশ চারু ও কারুকলা মহাবিদ্যালয়।’ একাত্তরের আগে-পরে আরো কিছু প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা হয়। ১৯৭০ সালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় চারুকলা বিভাগ, ১৯৭৩ সালে চট্টগ্রাম আর্ট কলেজ এবং আরো পরে ১৯৭৯ সালে রাজশাহী চারু ও কারুকলা মহাবিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। এসব প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের আগ্রহ ও প্রচেষ্টায় ছাপচিত্রের কাজের পরিধি বাড়তে থাকে। ১৯৭৪ সালে শিল্পকলা একাডেমি প্রতিষ্ঠার পর তারা একাধিকবার দেশী-বিদেশী ছাপচিত্র প্রদর্শনীর আয়োজন করে। এ আয়োজন বাংলাদেশের ছাপচিত্রের জনপ্রিয়তা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

১৯৭৯ সালে শিল্পকলা একাডেমির আয়োজন ও শিল্পী মনিরুল ইসলামের তত্ত্বাবধানে ছাপচিত্র নিয়ে একটি কর্মশালার আয়োজন করা হয়। [উল্লেখ্য, ঢাকা আর্ট কলেজের শিক্ষক মনিরুল ইসলাম ১৯৬৯ সালে বৃত্তি নিয়ে স্পেনে যান। সেখানে ১০ বছর ছাপচিত্র নিয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেন।] ছাপচিত্রের ওই কর্মশালা ছিল বাংলাদেশে প্রথম আয়োজন। সুতরাং যৌক্তিক কারণেই ছাত্র-শিক্ষকদের মধ্যে এটি ব্যাপক আগ্রহ ও উদ্দীপনা তৈরি করে। স্মৃতিচারণে শিল্পী মনিরুল ইসলাম বলেন, ‘ভারত বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমিকে ছাপচিত্রমাধ্যমের একটি মেশিন দিয়েছিল। সেটি দিয়েই প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। ব্যাচে শিক্ষকরাও ক্লাস করেছিল। ছাপচিত্রের এ প্রশিক্ষণ সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের মাঝে ব্যাপক আলোড়ন তৈরি করে। এর মাধ্যমে শিল্পমাধ্যমটি এখানে বিস্তৃত হয়।’

পরে ১৯৭৭ সালে ছাপচিত্রমাধ্যমে আলাদা বিএফএ এবং ১৯৭৮ সালে এমএফএ ডিগ্রি চালু হয়। ১৯৮৩ সালে আর্ট কলেজ ‘চারুকলা ইনস্টিটিউট’ হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত হয়। এ সময় শিক্ষার্থীদের মধ্যে ছাপচিত্র নিয়ে দলগত চর্চা বাড়তে থাকে। পরের দিকে ছাপচিত্রের অনেক শিক্ষার্থী উচ্চতর পড়াশোনার জন্য বিদেশে যান। এভাবেই একাডেমিক ভাবে বাংলাদেশে ছাপচিত্রের প্রতি আগ্রহ বাড়ে এবং এটি জনপ্রিয় হয়।

বর্তমানে ছাপচিত্রের অনেক শিল্পী দেশে-বিদেশে কাজ করছেন। অনেকে বিভিন্ন অ্যাওয়ার্ড পেয়েছেন, পাচ্ছেন। তবে বাংলাদেশে ছাপচিত্রচর্চার একটি সীমাবদ্ধতা এখনো আছে বলে জানান শিল্পী মনিরুল ইসলাম। ছাপচিত্রে যে উপযুক্ত কাগজের প্রয়োজন হয় সেটি এখনো বাংলাদেশে তৈরি হয়নি। বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের বিদেশ থেকে আমদানীকৃত কাগজে কাজ করতে হয়।

বাংলাদেশে ছাপচিত্রের যাত্রা দীর্ঘ, ধীর ও ধারাবাহিক প্রচেষ্টার ফল। লোকজ ছাপরীতি থেকে শুরু করে আধুনিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানভিত্তিক চর্চা—সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মাধ্যমটি পরিণত হয়েছে সুসংগঠিত একটি চারুশিল্পে।