দক্ষিণ আফ্রিকার অন্যতম খ্যাতিমান শিল্পী ইরমা স্টার্ন। তার স্মরণে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ইরমা স্টার্ন মিউজিয়াম। গত বছর এ জাদুঘর বন্ধ হয়ে যায়। বিষয়টি নিয়ে এখনো চলছে তীব্র বিতর্ক। জাদুঘরটি কবে বা আদৌ আবার খুলবে কিনা তা নিয়ে এখনো অনিশ্চয়তা রয়েছে। তবে ইরমা স্টার্ন জাদুঘর ও ইরমা স্টার্নের সংগ্রহ টিকিয়ে রাখার সর্বোচ্চ চেষ্টা হচ্ছে।
ইরমা স্টার্ন (১৮৯৪-১৯৬৬) দক্ষিণ আফ্রিকা ও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে স্বীকৃত একজন শিল্পী। ১৯৫০-এর দশকে তার কাজ একাধিকবার ভেনিস বিয়েনালে প্রদর্শিত হয় এবং গত বছর বার্লিনের ব্রুক মিউজিয়ামে তার কাজের একটি প্রদর্শনী হয়। ইরমার বাবা-মা ছিলেন জার্মান-ইহুদি। তবে ইরমা জন্মগ্রহণ করেন ট্রান্সভালে। জীবনের বিভিন্ন সময় তিনি ব্যাপক ভ্রমণ করেন, বিশেষ করে জার্মানিতে, যেখানে তিনি সেই সময়ের জার্মান এক্সপ্রেশনিস্ট শিল্পীদের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
ইরমার জাদুঘরটি তৈরি হওয়ার ইতিহাস আগ্রহজাগানিয়া। ১৯২০-এর দশকে দক্ষিণ আফ্রিকায় স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন ইরমা। পরে তিনি কেপটাউনের রন্ডেবশ এলাকায় দ্য ফার্স নামের একটি বাড়িতে চলে যান এবং মৃত্যুর আগ পর্যন্ত সেখানেই ছিলেন। ইরমা তার সংগ্রহগুলো একটি ট্রাস্টের অধীনে রেখে যান, যার উদ্দেশ্য ছিল শিল্পকলার উৎসাহ ও প্রসার। এর মধ্যে ছিল তার সংগৃহীত নানা নিদর্শন ও তার নিজের শিল্পকর্ম। বাড়ির কিছু কক্ষ প্রায় সেই অবস্থাতেই রাখা হয়েছিল, যেভাবে তিনি সেখানে বসবাস করতেন, বিশেষ করে তার স্টুডিও, যেখানে রঙ-তুলি, ইজেল, কাপড় ও শিল্পকর্ম রাখা ছিল। এ সংগ্রহ ট্রাস্টের মালিকানায় ছিল এবং ট্রাস্টিদের পক্ষে কেপ টাউন বিশ্ববিদ্যালয় মিউজিয়ামটি পরিচালনা করত।
গত অক্টোবরে বিশ্ববিদ্যালয় ও ইরমা স্টার্ন ট্রাস্ট একটি যৌথ বিবৃতিতে তাদের ৫৬ বছরের অংশীদারির সমাপ্তি ঘোষণা করে। তাদের ভাষায়, এ সিদ্ধান্ত ‘নবায়নের পথ প্রশস্ত করবে’। বিবৃতিতে বলা হয়, সংগ্রহগুলো অন্য একটি সংরক্ষণাগারে সরিয়ে নেয়া হবে এবং দ্য ফার্স ভবনটি ‘নতুনভাবে ব্যবহার’ করা হবে।
পরদিনই মিউজিয়াম বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঘোষণায় তীব্র ক্ষোভ সৃষ্টি হয়। ঐতিহ্য গবেষক ফিলিপা ডানকানের ভাষায়, এ সিদ্ধান্ত ‘মানুষকে ক্ষুব্ধ ও গভীরভাবে সন্দিহান করে তুলেছে’। তিনি বলেন, ‘কর্মীদের ভবিষ্যৎ নিয়ে কোনো স্পষ্টতা ছাড়াই মিউজিয়াম থেকে সরিয়ে দেয়া হয়েছে, জনসাধারণকে অন্ধকারে রাখা হয়েছে, আর চাপের মুখে পড়ার পরই আনুষ্ঠানিক ঘোষণা এসেছে। এখানে সম্পূর্ণ স্বচ্ছতার অভাব রয়েছে।’
ইউসিটি তখন জানায়, মিউজিয়াম বন্ধের কারণ ছিল ‘পরিচালনাগত’। তবে বিস্তারিত কিছু জানানো হয়নি। তারা আরো বলে, চুক্তি বাতিল ও সম্পত্তি বিক্রি হওয়া ‘দুঃখজনক বিষয়’। এ বিষয়ে আরো মন্তব্য চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ের এক মুখপাত্র জানান, দুঃখজনকভাবে এ পর্যায়ে আমরা বিষয়টি নিয়ে আরো মন্তব্য করতে পারছি না। ইউসিটি এবং/অথবা ইরমা স্টার্ন ট্রাস্ট প্রয়োজন অনুযায়ী ভবিষ্যতে যৌথভাবে বা আলাদাভাবে হালনাগাদ তথ্য দেবে।
বন্ধের ঘোষণার পর দক্ষিণ আফ্রিকার নিলাম সংস্থা স্ট্রাউস অ্যান্ড কোম্পানির চেয়ারম্যান ফ্রাঙ্ক কিলবোর্ন এক বিবৃতিতে বলেন, ‘স্ট্রাউস অ্যান্ড কোম্পানির পক্ষ থেকে এবং বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের বহু কেপটাউনের বাসিন্দা ও শিল্পপ্রেমীর মতো আমরাও ইরমা স্টার্ন মিউজিয়াম বন্ধের সাম্প্রতিক অপ্রত্যাশিত ঘোষণায় বিস্মিত ও হতবাক হয়েছি।’
এখন ইরমা স্টার্ন মিউজিয়ামের এ শিল্পকর্মগুলো সংরক্ষণের জন্য তহবিল সংগ্রহ হচ্ছে। ২০২২ সালে স্ট্রাউস আয়োজিত একটি শিল্পকর্ম বিক্রির মাধ্যমে প্রায় ২২ মিলিয়ন র্যান্ড (প্রায় ১৩ লাখ মার্কিন ডলার) সংগ্রহ করা হয়, যা মিউজিয়াম সংরক্ষণের উদ্দেশ্যে বরাদ্দ ছিল।
এ ট্রাস্ট বর্তমানে নেড গ্রুপ প্রাইভেট ওয়েলথ নামে পরিচিত একটি আর্থিক পরিষেবা প্রতিষ্ঠানের অধীনে রয়েছে। জনরোষ, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির দাবিতে একটি পিটিশনের মুখে পড়ে নেড গ্রুপ নভেম্বরে একটি জনপরামর্শ সভার আয়োজন করে। পরে তারা জানায়, ২০২৫ সালের শেষ নাগাদ একটি ব্যবস্থাপনা কমিটি ও উপদেষ্টা বোর্ড গঠন করা হবে। তবে তার অগ্রগতি কম।
এক বিবৃতিতে বলা হয়, ‘শিল্পকর্ম স্থানান্তরের প্রক্রিয়া চলছে, তবে এখনো সম্পূর্ণ হয়নি। মিউজিয়ামটি সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করতে কয়েক মাস সময় লাগতে পারে। নতুন সংরক্ষণাগারটি কেপটাউনের ভি অ্যান্ড এ ওয়াটারফ্রন্টে অবস্থিত নেডব্যাংক ক্লকটাওয়ার ভবনে।’
নেড গ্রুপ জানায়, ২০২২ সালে বিক্রির অর্থ বিনিয়োগ করা হয়েছে এবং তা দ্য ফার্সের ব্যবস্থাপনা ও রক্ষণাবেক্ষণে ব্যবহৃত হবে। বিবৃতিতে বলা হয়, ‘ইরমা স্টার্নের সংগ্রহ ও দ্য ফার্স নতুন রূপে টিকে থাকবে। নতুন প্রদর্শনী ও ব্র্যান্ডিং অংশীদারত্ব এবং দ্য ফার্সের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা বর্তমানে তৈরি করা হচ্ছে এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা ও চুক্তি সম্পন্ন হলে তা ঘোষণা করা হবে।’
ইরমা স্টার্ন মিউজিয়াম কমিটির সাবেক সহসভাপতি ফ্রাঙ্ক কিলবোর্ন বলেন, মিউজিয়াম বাঁচানোর জন্য ট্রাস্টি ও ইউসিটির উচিত ছিল অনেক আগেই বৃহত্তর জনসাধারণের সঙ্গে যোগাযোগ করা।
তিনি বলেন, ‘আমি মনে করি, এ পরিস্থিতিতে নেডব্যাংক ও ইরমা স্টার্ন ট্রাস্টের ট্রাস্টিদের উচিত শিল্পজগতের সংশ্লিষ্ট অংশীজন ও নেতাদের সঙ্গে সংলাপে বসা, যাতে তারা যে চ্যালেঞ্জগুলোর মুখোমুখি হচ্ছে সেগুলো মোকাবেলার বিকল্প পথগুলো গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করা যায়।’
দি আর্টনিউজপেপারে প্রকাশিত প্রতিবেদন অবলম্বনে মাহমুদুর রহমান










