পৃথিবীতে সুরের আধার প্রকৃতি। নগরজীবনে যানবাহনের হর্নের শব্দে বাতাসের সুর শোনা না গেলেও আজও নদীর কাছে, গহিন অরণ্যে গেলে শোনা যায় জলের কলরব, বাতাসের গান। প্রকৃতির সুরই যেন কাঠের টুকরোয় ওঠানোর কাজ করেন বাদ্যযন্ত্রের কারিগররা। এ দেশের মানুষ যেমন জারি, সারি, ভাটিয়ালি, ভাওয়াইয়া, মুর্শিদি, মারফতি, মাইজভাণ্ডারি, সাঁওতালি, বাউল, ঝুমুরসহ আরো নানা গান বেঁধেছে, সেই গানের সুরের বাহনও তৈরি করেছে। কোনো কোনো গ্রামীণ জনগোষ্ঠী সেটাকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করেছে। তেমনই এক জনগোষ্ঠীর বাস মানিকগঞ্জের ঘিওর উপজেলার বালিয়াখোড়া গ্রামে মনিদাশ পাড়ায়। পাড়াটি সুপরিচিত ঢাক-ঢোল পাড়া নামে। এ পাড়ার ৩৫টি পরিবারের শতাধিক ব্যক্তি ঢাক, ঢোল, খোল, ডুগি, একতারা, দোতারাসহ নানা ধরনের বাদ্যযন্ত্র হাতে তৈরি করেন। তাদের জীবনযাপনের অন্যতম অনুষঙ্গ ও জীবিকার প্রধানতম উৎস বাদ্যযন্ত্র তৈরি। তাদের জীবন ও যাপনকে ক্যামেরার লেন্সে ফুটিয়ে তুলেছেন আলোর ইশকুল আলোকচিত্র চক্রের দশম ব্যাচের সদস্যরা। সেসব আলোকচিত্র নিয়েই সাজানো হয়েছে ‘বাদ্যযন্ত্রে বাঁধা জীবন’ শীর্ষক প্রদর্শনী। প্রদর্শনীটি চলছে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের চিত্রশালায়; চলবে ২০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত।
মোট ৬৫ জন নবীন আলোকচিত্রীর লেন্সে উঠে এসেছে ঢাক-ঢোল পাড়ার মানুষের জীবনের গান। আলোকচিত্রে দেখানো হয়েছে কীভাবে ধাপে ধাপে বাদ্যযন্ত্র তৈরির কাজ করা হয়। অর্থাৎ কারিগরদের কার্যক্রমের ধারাবাহিকতা উঠে এসেছে। কেউ ব্যস্ত আছেন ঢাক-ঢোলের খোল তৈরিতে, কেউ প্রস্তুত করছেন পশুর চামড়া। কেউ কাঠ কেটে নির্দিষ্ট আকার দিচ্ছেন, কেউ হারমোনিয়ামে কিবোর্ড বসাচ্ছেন। কারো কাজ কেবল রঙ করা ঘিরে। প্রস্তুতকৃত বাদ্যযন্ত্র রোদে শুকাতে দিয়ে অনেকেই জিরিয়ে নিচ্ছেন। অনেকে কাজের ফাঁকে ফাঁকে গল্পও বুনছেন। বয়সের ভারে নুয়ে পড়া মানুষ বাড়ির দাওয়ায় বসে এসব দৃশ্য দেখছেন। একজন বয়োজ্যেষ্ঠ পেছনে তবলা, করাত রেখে টেলিভিশন দেখতে বসে গেছেন। তার পিঠে রয়ে গেছে ঐতিহ্যবাহী চড়ক পূজার ছাপ। মনিদাশ পাড়ায় নারী-পুরুষ, ছোট-বড় নির্বিশেষে বাদ্যযন্ত্রের কাজে নিয়োজিত, সেটিও দেয়ালে বাঁধানো ছবিগুলো দেখা বোঝা যায়।
প্রান্তিক জীবনধারাও সহজেই ছবিগুলো দেখে অনুমান করা যায়। বেশির ভাগ বাড়ি মাটির তৈরি। মাথার ওপরে টিনের চালা। নগরায়ণের আতিশয্য এখনো সেই গ্রামে পৌঁছেনি। ধারণা করা যায়, নগরের সুযোগ-সুবিধাও পৌঁছেনি সেখানে। তবু সচ্ছলতায় না হোক, জীবন যে স্বাচ্ছন্দ্যে কাটিয়ে দেয়া যায় সেই ছাপ মনিদাশ পাড়ার মানুষের চোখে-মুখে স্পষ্ট। এখানে নিরলস পরিশ্রম করে যাওয়াই যেন জীবন-ধর্ম।
মানুষের জীবনকে নিবিড়ভাবে দেখতে চাইলে তাদের কাছে যাওয়া প্রয়োজন। যখন যাওয়া সম্ভব হয় না, তখন মানুষ আশ্রয় নেয় শিল্প-সাহিত্যের। শিল্প-সাহিত্য যুগে যুগে, প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে সংস্কৃতির ধারক ও বাহক হয়ে থাকে। আলোকচিত্র সেই শিল্পের বাইরে নয়। প্রদর্শনীটি দেখে বলা যায়, বাদ্যযন্ত্রের সুতোয় যাদের জীবন গাঁথা, তাদের একাংশের গল্প বেশ ভালোভাবে আলোর ক্যানভাসে সাজিয়েছেন নবীন আলোকচিত্রীরা।










