শিল্প কী—এ কথার পরিপ্রেক্ষিতে যদি বলি কোনো জিনিস প্রত্যক্ষ দর্শনের পর মানুষের মননে যখন প্রভাব ফেলে তখন সেটিই হয়ে ওঠে শিল্প। হতে পারে সেটি কোনো প্রচলিত জিনিস, যা দীর্ঘদিন ধরে দেখে আসছে। কিন্তু তার উপস্থাপনশৈলীর গুণে আপনার ভাবনার দুয়ারে এসে আঘাত করছে কিছু প্রশ্ন। উদ্রেক হচ্ছে নানা কৌতূহল। চিন্তা রেখায় ভাঁজ ফেলে দিচ্ছে। মূলত এটাই শিল্পের নমুনা।

সেদিন এমনই স্বতঃসিদ্ধের মুখোমুখি হয়েছিলাম রাজধানীর লালমাটিয়ার দ্বীপ গ্যালারির প্রবেশমুখে বসানো একটি ডিভাইস দেখে। এ ইনস্টলেশন বা যন্ত্রের সামনে দাঁড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে নিজের প্রতিবিম্ব চোখে পড়ল। আবার আরেক পাশে দেখা যাচ্ছে আমাকে ওপাশ থেকে কেউ একজন তদারক করছেন। কী অদ্ভুত! যন্ত্রটি দেখে যেন বিপন্ন বিস্ময় ভর করল শরীরজুড়ে। ব্যক্তিগত গোপনীয়তা বলে আর কিছু্ নেই আমাদের। তা স্পষ্ট প্রতীয়মান এ যন্ত্রের মাধ্যমে। যদিও করপোরেটের করাল শাসনে আমাদের গোপনীয়তার যবনিকাপাত ঘটেছে বহু আগে। তবু কাজটি দেখে মনের মধ্যে ধাক্কা দিল। প্রশ্ন ছুড়ে দিতে ইচ্ছে করল। যন্ত্রটিও এ আয়োজনের পার্ট! হ্যাঁ। এটির ধারণা শিল্পী বজলুর রশিদ শাওনের। গ্যালারিতে চলছে পাঁচ শিল্পীর কাজ নিয়ে ‘জিজ্ঞাসার সিলসিলা’ শীর্ষক প্রদর্শনী। মূলত সে উদ্দেশ্যেই উপস্থিত হয়েছি এ প্রাঙ্গণে। প্রদর্শনীর শিল্পীদের মধ্যে শাওনও একজন। তারও বেশকিছু কাজ এখানে ঠাঁই পেয়েছে।

9

গ্যালারির দরজা ঠেলে প্রবেশ করতেই নজরে এল ধীমান সরকারের পাশাপাশি দুটি ক্যানভাস, যার শিরোনাম ‘রিকনসিলেশন’। দুটি চিত্রকর্মের প্রথমটি কালো কাপড়ে মোড়ানো মানুষ, যারা জগতের আলো দেখতে পারছে না। বদ্ধ অবস্থায় আছে। পাশের চিত্রকর্মটি নীল-সাদা শালুতে মোড়ানো। বিষয় অবয়ব এককই। শুধু রঙটি পরিবর্তিত, এই যা। দুটি চিত্রকে সংযোগ ঘটিয়েছে মাঝখানে বসানো তকতকে একটি আয়না। এটি কোনো বিমূর্ত চিত্র নয়। খুব সহজে বোধগম্য। শিল্পীর বক্তব্য স্পষ্ট। তার এ চিত্রকর্ম দেখছিলাম। একটি ড্রয়িং সিরিজের পাশে দাঁড়িয়ে এক তরুণীর আওয়াজ—‘দেখেন, দেখেন, ওই যে ছবির মুঠোবন্দি ইঁদুর। এ ইঁদুরটা কে জানেন?’ পাশের যুবক নির্বিকার। তরুণীটির এবার তাচ্ছিল্যের হাসি। বললেন, ‘আরে পারলেন না। ওইটা আমি। আর ওই হাতগুলো সমাজ।’ কৌতূহল জাগল তার কথা শুনে। খুব সাধারণ দৃষ্টিতে, অকপটে মনের কথাগুলো বলে দিলেন তরুণীটি। কিন্তু তার সঙ্গে কথা বলতে চাইলে তিনি পরিচয় প্রকাশে অনাগ্রহ জানালেন। তবে তার বলা কথাগুলো প্রকাশ করার অনুমতি দিলেন। প্রদর্শনী গৃহে আপনমনে কথাগুলো বলে যাওয়া তরুণীর ছদ্মনাম ধরুন নৈরিতা। নৈরিতার মনের কথা তুলে ধরা ড্রয়িং সিরিজের নাম ‘শিরোনামহীন।’ কাজটি করেছেন শেখ ফাইজুর রহমান। ফাইজুরের এ সিরিজে অনেক কিছু নির্দেশনা পাওয়া যায়। প্রত্যেকটি ড্রয়িংয়ে গলা চেপে ধরা হয়েছে। একটি কাজে দেখা যাচ্ছে একটি মোরগের গলা চেপে ধরা হয়েছে। চিৎকার করছে মোরগটি। এখানে গুজব বোঝানো হয়েছে। ড্রয়িংটির ঠিক নিচেই ‍মুঠোবদ্ধ সংবাদকর্মীর বুম। এ চিত্রকর্মে দুটি জিনিস উপলব্ধি করা যায়—একটি মিডিয়া গুজব ছড়াচ্ছে, অন্যটি চেপে ধরা হয়েছে গণমাধ্যমের টুঁটি। এ শিল্পীর কাজও বক্তব্যধর্মী।

একটি ডিভাইসে দেখা যাচ্ছে চাঁদ। ক্ষয়িষ্ণু চাঁদটিকে দেখে মনে হবে, ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময়, পূর্ণিমার চাঁদ যেন ঝলসানো রুটি। কাজটি করেছেন মং মং শে। বাস্তবতা তুলে ধরেছেন প্রতীকীর মাধ্যমে। এখানকার প্রত্যেকটি কাজের মধ্যে দর্শনার্থীর সঙ্গে শিল্পী ভাবনার সংযোগ ঘটেছে।

প্রথম দৃষ্টিতে দর্শনার্থীর ভালো লাগা নির্ভর করে চিত্রকর্মের রঙ ব্যবহারের ওপর। উজ্জ্বল রঙের মধ্যে শিল্পী এ. এছেন তার বক্তব্য এত ধারালোভাবে উপস্থাপন করেন, যা তার শিল্পীসত্তার বিশেষ মুন্সিয়ানার পরিচয়। তিনিও প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছেন। তার চিত্রে হয়তো কোনো নির্দিষ্ট রূপ নেই, আকার নেই, অন্ত নেই। কিন্তু বক্তব্য আছে। প্রকৃতির বিনাশ নিয়ে এ শিল্পীর প্রতিবাদ লক্ষণীয়।

10

বজলুর রশিদ শাওনের ‘চিরন্তন সত্য’ শিরোনামের শিল্পকর্মে বোঝা যায়, আমাদের পরিচয় গিয়ে দাঁড়ায় কয়েকটি নম্বরে। মানুষের ব্যক্তি পরিচয় থাকে না। সংখ্যার মাধ্যমে বিবেচিত হয়, যা গ্যালারির মেঝেতে রাখা শাওনের করা দুটি কফিন দেখে অনুমেয় হয় আরেকবার। শব বহন করা কফিন দুটি দর্শনার্থীদের ভেতরে ঝড় তোলে। এছাড়া তার ‘স্পিল্ট ইন সেলফডিলিমা’ শিরোনামের কয়েকটি কাজ রয়েছে গ্যালারির দেয়ালে।

বিক্ষিপ্ত সময়কে ধারণ করা এ প্রদর্শনী। কাজগুলো নিয়ে সহযাত্রীদের সঙ্গে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করছিলেন শিল্পী ফারজানা আহমেদ উর্মি। তার কাছে প্রদর্শনী সম্পর্কে জানতে চাইলে বলেন, ‘এখানে পাঁচটি শক্তি একত্র হয়েছে। এদের প্রত্যেকের কাজ সম্পর্কে আমার পূর্ব পরিচয় ও ধারণা আছে। তাদের প্রত্যেকের কাজের মধ্যে আলাদা পরিচয় পাওয়া যায়। এ শিল্পীদের নিজস্ব সত্তা আছে। এখানে যে কাজগুলো আছে, সবই তো সাম্প্রতিক সময়ের ভাবনা। তারা খুব জোরালো এবং সাহসের সঙ্গে উচ্চারণ করছেন।’

শিল্পী ও সমালোচক মোস্তফা জামান বলেন, ‘এগুলো তো এক্সপেরিমেন্টাল কাজ। আধুনিক এক্সপেরিমেন্টেশনের কিছু প্রক্রিয়া থাকে। যেমন ম্যাটেরিয়াল দিয়ে করে, আবার অনেক সময় আনরিলেটেড বস্তুও ব্যবহার হয়। আনরিলেটেড ভাবনা থাকে, যা আপাতদৃষ্টিতে মনে হয় আনরিলেটেড। কিন্তু দুটি বিষয়কে পাশাপাশি রেখে একটি জিনিস তৈরি করা হয়। বলা যায় এটি বিভিন্ন রকমের ভাব-ভাবনার এক ধরনের মেলবন্ধন। এটাই এক্সপেরিমেন্টেশন। এ প্রদর্শনীর কাজগুলোও তাই। এজন্য তারা প্রদর্শনীর শিরোনাম দিয়েছে “‍প্রশ্নের সিলসিলা বা জিজ্ঞাসার সিলসিলা”। আমরা নানাভাবে প্রশ্ন করে করে এগোই। সেটার কিছু সলিউশন হয়তো আমরা পাই। আবার কোনো উত্তরই মেলে না। তবু প্রশ্ন করে যাই। এটাই জীবনের প্রক্রিয়া। শিল্পের প্রসেসটাও ঠিক অনেক দিন ধরেই এ রকমভাবে চলছিল, যেটাকে ইংরেজিতে বলে ‘প্রক্সিমাল প্রসেস’। অর্থাৎ যেটা চেয়েছি সেটার কাছাকাছি পৌঁছানো। কিন্তু এখন তো নানা ধরনের প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড়াতে হচ্ছে। এআইয়ের মাধ্যমে আমরা এমন এক জায়গায় পৌঁছলাম, কোনটা সত্য এবং কোনটা অসত্য—এ প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছি, যাকে অনেকে পোস্ট-ট্রুথ সোসাইটি বলছেন। এ কারণে প্রশ্ন মানুষকে করতে হয় এবং মানুষের উত্তরও খুঁজতে হয়। শিল্পের ক্ষেত্রে আমার মনে হয় এটি আরো বেশি প্রয়োজন। এ শিল্পীরাও সেসব জায়গায় মনোযোগ দিয়েছে।’

২১ জুন শুরু হওয়া প্রদর্শনী চলবে আগামী ৫ জুলাই পর্যন্ত। দর্শনার্থীদের জন্য প্রতিদিন বিকাল ৪টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত উন্মুক্ত গ্যালারির দুয়ার। সুযোগ থাকলে একবার ঘুরে আসুন শিল্পের এ প্রাঙ্গণ থেকে। এখানে শিল্পকর্ম সংগ্রহেরও সুযোগ রয়েছে।