একবিংশ শতাব্দীতে প্রযুক্তি ও দৃশ্যশিল্পের মেলবন্ধনে শিল্পের চিরাচরিত সীমানা বিলুপ্তপ্রায়। ভার্চুয়াল বাস্তবতা ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মতো প্রযুক্তিনির্ভর শিল্পের সৃষ্টি, প্রদর্শন ও অভিজ্ঞতা দৃশ্যশিল্পের সংজ্ঞাকে পুনর্নির্মাণ করছে। এ পরিবর্তনের ফলে জন্ম নেয়া ‘ইমার্সিভ আর্ট’ একটি জনপ্রিয় ধারা। আজকের অভিজ্ঞতার দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে আমরা দেখতে পাই ইমার্সিভ আর্টের সূত্রপাত ঘটেছে ভার্চুয়াল দুনিয়ায় প্রবেশের অনেক আগে। তাই আলোচনার সুবিধার্থে পারসেপচুয়াল ইমার্সিভ আর্টের অভিজ্ঞতা নিয়েই আমরা প্রবেশ করব ভার্চুয়াল দুনিয়ায়।
ইমার্সিভ আর্টের ধারণা অনুধাবন করতে হলে ‘ইমার্শন (Immersion)’ শব্দটি উপলব্ধির গভীরতা অন্বেষণ প্রয়োজন। রোমান দেবতা জেইনাসের পৌরাণিক চরিত্রের মাধ্যমে ব্যাখ্যা করলে বিষয়টি বুঝতে সহজ হবে। দেবতা জেইনাস ছিলেন দুই মাথাযুক্ত এক দেবতা, যিনি একই সঙ্গে দুই দিকে দেখতে পারেন; যিনি দ্বিমুখী দর্শনের মাধ্যমে অতীত ও ভবিষ্যৎ এবং বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ—উভয় বাস্তবতা একসঙ্গে উপলব্ধি করতে পারতেন। এ প্রতীকী রূপান্তর ইমার্শনের মূল দর্শনকে তুলে ধরে, যেখানে যুক্তির একরৈখিক পথ পরিহার করে বহুমুখী ও নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গিকে গ্রহণযোগ্যতা দেয়া হয়।

এ প্রেক্ষাপটে ইমার্সিভ আর্ট প্রথাগত দৃশ্যকলায় সাধারণত দর্শকের শুধু দৃষ্টিকেন্দ্রিক শিল্পশৈলী অবলোকনের মাত্রাকে ভেঙে মাল্টিসেন্সরি বা বহু ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য তথা শ্রবণ, স্পর্শ, গন্ধ প্রভৃতি অনুভূতির সক্রিয় উদ্দীপনা ঘটায়। এর ফলে শিল্পকর্ম দর্শকের জন্য হয়ে ওঠে একটি নিখাদ, আন্তঃক্রিয়াশীল অভিজ্ঞতা, যা তাদের একটি নতুন চেতনার উন্নততর জগতে নিয়ে যায়, যেখানে দর্শক শিল্পের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হয়ে ইমার্শন অভিজ্ঞতা লাভ করে। এভাবে ইমার্সিভ আর্ট ঐতিহ্যগত দৃশ্যকলার সীমা অতিক্রম করে, একটি নতুন বাস্তবতার দিক উন্মোচন করে, যেখানে দৃশ্যশিল্প আজ ডিজিটাল জগতে একটি বহুমাত্রিক সত্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়।
ইমার্শন শব্দটি ইংরেজি কেমব্রিজ অভিধান অনুসারে কোনো কিছুতে সম্পূর্ণরূপে জড়িত হওয়াকে বোঝায়। শব্দটির উৎপত্তি লাতিন শব্দ ‘ইমারসিও (immersio)’ থেকে, যার অর্থ ‘ডুবে যাওয়া’। বাংলায় এর অর্থ করা যেতে পারে নিমগ্ন, নিবিষ্ট, বুঁদ, গভীর, ডুবন্ত বা নিমজ্জিত। এ আভিধানিক ও ব্যুৎপত্তিগত অর্থ অনুসারে, ইমার্শন অভিজ্ঞতাকে একজন ডুবুরির অভিজ্ঞতার সঙ্গে তুলনা করা যেতে পারে। ডুবুরি যেমন তার সমস্ত ইন্দ্রিয় দিয়ে জলের নিচের এক ভিন্ন জগতে নিমজ্জিত হয়, তেমনি দর্শকও এ অভিজ্ঞতার মাধ্যমে এক বিকল্প বাস্তবতায় প্রবেশ করে এবং নতুন এক উদ্দীপনায় নিমগ্ন হয়। তাই দৃশ্যশিল্পে এ ধরনের অভিজ্ঞতা সৃষ্টির শৈলীকে বাংলায় ‘নিমজ্জিত অভিজ্ঞতার শিল্প শৈলী’, ‘নিমগ্ন শিল্পশৈলী’ অথবা ‘অবগাহী অভিজ্ঞতার শিল্প শৈলী’ হিসেবে নামকরণ করা যেতে পারে।

পারসেপচুয়াল ইমার্সিভ আর্ট
‘সূর্যের নিচে নতুন কিছু নেই’—প্রবাদ বাক্যকে পাথেয় করে বলা যায়, আজকের দিনের ইমার্সিভ বা অবগাহী শিল্পের ধারণাটি কোনো আকস্মিক উদ্ভাবন নয়, বরং এর শেকড় মানবসভ্যতার অনেক গভীরে প্রোথিত। জার্মান শিল্প ইতিহাসবিদ অলিভার গ্রাউয়ের মতে, কম্পিউটার সহায়তায় তৈরি ভার্চুয়াল বাস্তবতার বহু আগেই মানুষ ইমার্শন বা অবগাহী অভিজ্ঞতার সঙ্গে পরিচিত ছিল। এর সবচেয়ে আদিম উদাহরণ পাওয়া যায় প্রাচীন মানবগোষ্ঠীর জীবনে। শিকার শেষে রাতের আগুনে সঙ্গীদের কাছে নিজেদের বীরত্বগাথা বর্ণনা করার সময় তারা যে সংবেদনশীল ও কাল্পনিক দৃশ্যপট তৈরি করতেন, সেখানেই লুকিয়ে ছিল ইমার্শনের প্রাথমিক রূপ। তবে কল্পনাপ্রসূত সেই ইমার্শন এবং আজকের ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য ইমার্শনের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। মনে রাখতে হবে, কাল্পনিক গল্প বলার ক্ষমতা ছিল মানবজাতির বিবর্তনে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উল্লম্ফন।
দৃশ্যশিল্পে ইমার্শনের প্রয়োগ কবে শুরু হয়েছিল তা নির্দিষ্ট করে বলা কঠিন। তবে খ্রিস্টপূর্ব প্রথম শতাব্দীতে রোমান স্থাপত্যে এর প্রাথমিক প্রচেষ্টা দেখা যায়। তৎকালীন স্থপতিরা ৩৬০ ডিগ্রি চিত্র ব্যবহার করে ঘরের ভৌত সীমানাকে অতিক্রম করে একটি বিভ্রম বা ইলুশন তৈরি করতে চাইতেন, যার অন্যতম উদাহরণ হলো পম্পেই নগরীর ‘ভিলা দে মিস্টারি ফ্রেস্কো’। এ ফ্রেস্কোগুলোর বিশাল আকার এবং তাতে অঙ্কিত মানব অবয়বগুলোর দর্শকের সমান উচ্চতা পর্যবেক্ষককে তাৎক্ষণিকভাবে দৃশ্যের গভীরে আচ্ছন্ন করত। চিত্রের চরিত্রগুলোর পারস্পরিক দৃষ্টি বিনিময় এবং কিছু চরিত্রের সরাসরি দর্শকের দিকে তাকিয়ে থাকা দর্শককে সেই দৃশ্যের একজন অংশীদার বা সাক্ষীতে পরিণত করত। এর ফলে চিত্রকলা ও কক্ষের মধ্যকার শারীরিক দেয়াল অদৃশ্য হয়ে যেত দর্শকের কাছে ঘরটিকে তার প্রকৃত আকারের চেয়েও বড় মনে হতো, যা ছিল ইমার্শনের এক প্রাথমিক অথচ শক্তিশালী উদাহরণ। স্থাপত্যের ক্ষেত্রেও এর প্রয়োগ লক্ষণীয়; চতুর্দশ শতাব্দীর গথিক ক্যাথেড্রালের উঁচু ছাদ ও রঙিন কাচের মধ্য দিয়ে আসা আলো দর্শকদের এক আধ্যাত্মিক জগতে নিমজ্জিত করত।
পঞ্চদশ শতাব্দীতে ইতালীয় রেনেসাঁসের সময় রৈখিক পরিপ্রেক্ষিত (Linear perspective) বা ত্রিমাত্রিক গভীরতাকে দ্বিমাত্রিক তলে ফুটিয়ে তোলার পদ্ধতির উদ্ভাবন ছিল ইমার্সিভ শিল্পের ইতিহাসে যুগান্তকারী ঘটনা। স্থপতি ফিলিপ্পো ব্রুনেলেস্কি এর ধারণা দেন এবং শিল্পী মাসাচিও ও লিওন বাতিস্তা আলবের্তি এর সফল প্রয়োগ ঘটান। আলবের্তি তার ‘দে পিকটুরা’ গ্রন্থে চিত্রকলাকে একটি ‘উন্মুক্ত জানালা’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন। ধারণাটি দর্শক ও শিল্পের মধ্যে এক নতুন দার্শনিক সম্পর্ক স্থাপন করে, যেখানে দর্শক একটি নির্দিষ্ট দৃষ্টিকোণ থেকে একটি বিশ্বাসযোগ্য ত্রিমাত্রিক জগতের দিকে তাকিয়ে থাকার সুযোগ পায়। রেনেসাঁসের এ উদ্ভাবন পরবর্তীকালে অবগাহী অভিজ্ঞতার শিল্পশৈলীর বিকাশে অপরিহার্য ভূমিকা রাখে।
সপ্তদশ শতাব্দীর মধ্যে শিল্পীরা পরিপ্রেক্ষিতের ব্যবহারে চূড়ান্ত দক্ষতা অর্জন করেন। এ সময়েই, ১৭৮৯ থেকে ১৭৯০ সালের মধ্যে, আইরিশ চিত্রকর রবার্ট বার্কার ‘ক্যালটন হিল থেকে এডিনবার্গ’ নামক একটি ৩৬০ ডিগ্রি চিত্র অঙ্কন করেন এবং এই রীতিকে ‘প্যানোরামা’ নাম দেন। একটি সিলিন্ডার আকৃতির ক্যানভাসে প্রদর্শিত এ প্যানোরামা দেখার জন্য দর্শকদের একটি কেন্দ্রীয় প্লাটফর্মে দাঁড়াতে হতো, যা তাদের চারপাশে থাকা দৃশ্যের এক বাস্তবতার অনুভূতি দিত। এ অভিজ্ঞতা দর্শকের বাস্তব জগৎ ও চিত্রের কাল্পনিক জগতের মধ্যে এক সেতুবন্ধ তৈরি করে তাকে কেবল দর্শক হিসেবে না রেখে দৃশ্যের অংশ করে তুলত। প্যানোরামার মাধ্যমে একটি কৃত্রিম অথচ সামগ্রিক বিকল্প বাস্তবতা তৈরি হয়, যা দৃশ্যশিল্পকে আজকের ইমার্শন অভিজ্ঞতার দিকে আরো এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে যায়।

ডিজিটাল যুগের বহু আগে চিত্রকলায় নিমগ্ন বা ইমার্সিভ অভিজ্ঞতার এক প্রভাবশালী রূপ প্রকাশ পায় ফরাসি ইমপ্রেশনিস্ট শিল্পী ক্লদ মনেঁর (১৮৪০-১৯২৬) ‘ওয়াটার লিলি’ সিরিজে। সিরিজটি শুধু ইমপ্রেশনিজমের একটি চূড়ান্ত নিদর্শন নয়, বরং আধুনিক ইমার্সিভ আর্টের মৌলিক পূর্বসূরি হিসেবেও চিহ্নিত করা হয়। এ চিত্রমালার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো এতে কোনো দিগন্তরেখা বা আকাশ অনুপস্থিত। শুধু জল, আলো ও রঙের ছায়া-প্রতিচ্ছায়ায় তৈরি হয় এক অদ্ভুত পরিপ্রেক্ষিতহীনতা, যেখানে দর্শকের অবস্থানগত সচেতনতা বিলীন হয়ে যায়। ফলে দর্শক যেন বাস্তবতা ও বিমূর্ততার মধ্যবর্তী এক তরল অভিজ্ঞতায় অবগাহন করে। মনেঁর ইমার্সিভ অভিজ্ঞতাকে আরো প্রগাঢ় করে তোলে চিত্রগুলোর প্রদর্শন কৌশল। প্যারিসের অরাঞ্জারি মিউজিয়ামে ওভাল দুটি কক্ষে বিশাল আকারের প্যানেলগুলো সাজানো হয়, যেখানে দর্শক এক ‘চিত্র পরিবেষ্টিত’ কক্ষে প্রবেশ করে। এ প্রক্রিয়া দর্শককে কেবল দর্শক হিসেবে নয়, বরং অংশগ্রহণকারী অভিজ্ঞতায় রূপান্তর করে। দর্শক ও চিত্রের মাঝে সম্পর্কের এ ধারণাকে সমসাময়িক গবেষক আন্দ্রেয়া পিনোত্তি ‘ইমারসিভ ডিসপোজিটিফ’ বলে ব্যাখ্যা করেছেন, যেখানে দর্শক চিত্রকর্ম দ্বারা চারপাশ থেকে আচ্ছন্ন থাকে, অনুভূতির একটি নতুন ক্ষেত্রের মধ্যে প্রবেশ করে। এখানে লক্ষণীয় যে মনেঁর ‘ওয়াটার লিলি’ সিরিজের অনুপ্রেরণা তার নিজের হাতে সাজানো গিভার্নির বাগান। বস্তুত বাগানটি নিজেই একটি কিউরেটেড ইমার্সিভ পরিবেশ। এ প্রসঙ্গে বলা যায়, মনেঁ শুধু চিত্র নির্মাণ করেননি; তিনি অভিজ্ঞতারও নির্মাতা ছিলেন। ফলে গিভার্নির বাগান ও ওয়াটার লিলি সিরিজকে ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য ইমার্সিভ ইনস্টলেশনের মৌলিক ও নীরব পূর্বাভাস হিসেবে বিবেচনা করা যায়।
প্রথাগত শিল্পকলায় দর্শক সাধারণত একটি স্থির অবস্থান থেকে শিল্পকর্ম অবলোকন করেন, যা শিল্প ও দর্শকের মধ্যে একটি সুস্পষ্ট দূরত্ব বজায় রাখে। তবে বিংশ শতাব্দীতে এসে শিল্পীরা এ প্রথাগত ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করেন এবং শিল্পকে শুধু দেখার বস্তু হিসেবে সীমাবদ্ধ না রেখে একটি সামগ্রিক অভিজ্ঞতায় রূপান্তর করার প্রচেষ্টা চালান। এ বিপ্লবী পরিবর্তনের অন্যতম পথিকৃৎ ফরাসি শিল্পী ইভ ক্লেইন (Yves Klein), যিনি ১৯৫৮ সালের ‘লে ভিডে (Le Vide)’ নামক প্রদর্শনীতে সম্পূর্ণ খালি একটি গ্যালারি উপস্থাপন করে দর্শকদের বস্তুগত শিল্পবস্তু থেকে এক আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতার দিকে চালিত করেন। অন্যদিকে অ্যালান কাপ্রোর (Allan Kaprow) হ্যাপেনিংস (Happenings) দর্শকের সক্রিয় অংশগ্রহণের সুযোগ এনে শিল্প ও জীবনের সীমারেখা মুছে ফেলতে চেয়েছে। ফ্লুক্সাস শিল্প আন্দোলনের শিল্পীরাও প্রচলিত শিল্পবস্তুর ধারণা ত্যাগ করে ঘটনা, পারফরম্যান্স ও সংবেদী অভিজ্ঞতার ওপর জোর দেন। এ আন্দোলনগুলো দর্শককে নিষ্ক্রিয় দর্শক থেকে সক্রিয় অংশগ্রহণকারীতে রূপান্তর করে, যা ইমার্সিভ বা অবগাহী শিল্পের একটি মূল বৈশিষ্ট্য।
ইমার্সিভ শিল্পের প্রবণতাকে আরো গভীরে নিয়ে গেছেন জেমস টারেল (James Turrell)। তার ইনস্টলেশনে না থাকে চিত্র, না কোনো বস্তু; থাকে কেবল আলো। এ আলো পর্যবেক্ষকের দিকচেতনা (orientation) ভেঙে দেয়, আলো হয়ে ওঠে তার কাছে দেহ-মন-চেতনার এক পূর্ণাঙ্গ নিমজ্জিত অভিজ্ঞতার রূপ। দৃষ্টি ছাড়াও ঘ্রাণ, উষ্ণতা, স্থানের অনুভব—সবকিছু মিলে গঠিত হয় এক ধরনের সংবেদনশীল চেতনানির্ভর বাস্তবতা। এসব প্রয়াস একত্রে শিল্পের ধারণাকে রূপান্তর করে, যেখানে দর্শক শুধু দেখে না, বরং শিল্পের অভ্যন্তরে নিমজ্জিত হয় এবং সক্রিয়ভাবে বাস্তবতার নতুন অভিজ্ঞতায় অংশ নেয়।
দৃশ্যশিল্পের ইতিহাস মূলত নতুন উদ্ভাবন এবং ঐতিহ্যগত চিন্তাকে চ্যালেঞ্জ করে সামনের দিকে এগিয়ে যায়। এ প্রেক্ষাপটে, ইমার্সিভ বা নিমগ্ন শিল্পকে গভীরভাবে অনুধাবনের জন্য ফরাসি দার্শনিক মরিস মার্লো-পন্তির (Maurice Merleau-Ponty) ফেনোমেনোলজি-বিষয়ক ধারণা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মার্লো-পন্তির দর্শন অনুযায়ী, আমাদের প্রত্যক্ষণের প্রক্রিয়া কেবল জ্ঞানকেন্দ্রিক নয়, বরং এটি আমাদের শারীরিক অস্তিত্বের সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িত। তিনি বিষয়টিকে ‘মূর্ত উপলব্ধি’ (embodied perception) হিসেবে উল্লেখ করেছেন, যেখানে আমাদের দেহই সব ধরনের অনুভূতি ও উপলব্ধির সূচনা বিন্দু।
মার্লো-পন্তির মতে আমাদের চেতনা সর্বদা একটি নির্দিষ্ট অভিপ্রায় বা ‘ইন্টেনশনালিটি’ দ্বারা চালিত হয়, যা কোনো বস্তুর দিকে অভিমুখী থাকে। ইমার্সিভ শিল্পে দর্শকের সক্রিয় অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে এ অভিপ্রায় বাস্তবায়ন হয়। এর ফলে দর্শক কেবল শিল্পের দর্শক থাকে না, বরং সে তার বাসিন্দা হয়ে ওঠে এবং শিল্পের ভেতরে বসবাসের অভিজ্ঞতা লাভ করে। এ অবস্থাকেই মার্লো-পন্তি ‘লিভড এক্সপেরিয়েন্স’ বা জীবিত অভিজ্ঞতা বলেছেন।
শিল্পী ওলাফুর এলিয়াসনের বিখ্যাত শিল্পকর্ম ‘দ্য ওয়েদার প্রজেক্ট’ (২০০৩) এ তত্ত্বের এক চমৎকার দৃষ্টান্ত। এ স্থাপনা শিল্পে কৃত্রিম সূর্য ও কুয়াশার মাধ্যমে দর্শকের শরীর ও ইন্দ্রিয়কে সরাসরি শিল্পের অংশ হতে উৎসাহিত করা হয়। এতে দর্শকের ব্যক্তিগত স্মৃতি ও চেতনা শিল্পের সঙ্গে একাত্ম হওয়ার মাধ্যমে তারা ‘লিভড এক্সপেরিয়েন্স’ স্তরে পৌঁছে যায়। মার্লো-পন্তির দর্শন ও এলিয়াসনের শিল্পের এ মেলবন্ধন প্রমাণ করে যে সার্থক ইমার্সিভ শিল্পকর্ম দর্শকের শারীরিক ও মানসিক অংশগ্রহণের মাধ্যমে গভীর ও অর্থবহ অভিজ্ঞতা তৈরি করে। দর্শন ও শিল্পের এ আন্তঃসম্পর্ক প্রমাণ করে যে শিল্প ও দর্শন মানুষের জীবন-বাস্তবতাকে নতুনভাবে উপলব্ধি ও অনুধাবনের পথ তৈরি করে এবং মানুষের চেতনাকে এক উন্নততর স্তরে পৌঁছে দেয়। (চলবে)
লেখক: শিল্পী ও গবেষক










