ফাগুনের মন উদাসী সন্ধ্যা। রাজধানীর লালমাটিয়ার পথে হাঁটলে ফাগুনের আরো বেশি অনুষঙ্গ হৃদয়ে দোলা দেয়। বিশেষ করে শিল্পপ্রাণে। যদিও সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় এখন শিল্পের পথ অনেকটাই বাঁকাচোরা। তবু শিল্পী তার হাতের রঙ ও রেখার টানে কাঁটাঝোপের মধ্যে ফুটিয়ে তোলেন সাদা সাদা বুনো ফুল। বিস্ময় থেকে শিল্পীর সৃষ্টিতে খুঁজে ফিরি শান্তি। কিছুটা স্বস্তি মেলাতে উপস্থিত হই লালমাটিয়া ডি ব্লকের ৬/৪ নম্বর বাড়ির দোতলার শিল্পাঙ্গনের ভূমি গ্যালারিতে। এখানে ৯ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হয়েছে ১২ জন তরুণ শিল্পীর ‘১২ গল্প’ শীর্ষক দলীয় প্রদর্শনী। সিঁড়ি বেয়ে উঠলেই আগতদের প্রথমেই অভ্যর্থনা জানাবে তারেক আমিনের করা ‘কনার বন’ শীর্ষক চিত্রকর্মটি। অ্যাক্রিলিক পেপারে করা অপরূপ বিল-বাঁওড় ফুটিয়ে তোলা হয়েছে এ কাজটিতে। বিলের হিজল গাছ আর জলে গুল্মজাতীয় উদ্ভিদগুলো যেন দর্শনার্থীদের ফিরিয়ে নিয়ে যাবে অতীতে। গাঁয়ের পথে। এ শিল্পীর পাঁচটি কাজ এখানে স্থান পেয়েছে। বন্ধুর বাড়ি মহেশখালী, পারাপার, আমার গ্রাম ও নীলা চিত্রকর্মের মধ্যে নাড়ির টান অনুভব করা যায়।

12

এ গ্যালারিতে রয়েছে সৌরভ চৌধুরীর ‘অনাদি ও অনন্ত’ সিরিজের পাঁচটি কাজ। চিত্রকর্মগুলোতে রঙের খেলায় দক্ষতার পরিচয় পাওয়া যায়। সেই সঙ্গে সৃষ্টির প্রতি গভীর ভালোবাসার প্রতিফলনও লক্ষ করা যায়। এ শিল্পীর একটি কাজের সামনে দাঁড়িয়েছিলেন লালমাটিয়া মহিলা কলেজের শিক্ষার্থী শারমিন সুলতানা। এ দর্শনার্থীর কাছে অনুভূতি জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘চিত্রকর্ম নিয়ে মতামত জানানোর মতো দক্ষতা ও যোগ্যতা কোনোটিই নেই আমার। তবু এটুকুই বলতে পারি এখানে এসে অভিভূত হয়েছি। আর তাছাড়া ছবিগুলো ভিন্ন বিষয়ের ওপর। এজন্য হয়তো একজন সাধারণ দর্শক হিসেবেও একবাক্যেই বলা যায় ভালো।’

মানিক বণিকের কাজগুলোতে দর্শনার্থী খুঁজে পাবেন জ্যোৎস্নায় ভেসে যাওয়া চাঁদের গল্প। কোনোটাতে বাঁকা চাঁদ, সুডৌল চাঁদ আবার নীল জ্যোৎস্নায় ভেসে যাওয়া সবুজ বাঁশবাগান। ভিন্নতা রয়েছে এ শিল্পীর কাজে।

দলগত এ আয়োজনে আজমীর হোসেনের কাজও রয়েছে। তার ‘বর্ষা’ সিরিজের এ কাজগুলো অন্যরকম একটা দোলা দেয়। আষাঢ়ের ঘন কালো মেঘ আর কালো মহিষ, সাদা বকের দল। তার পাঁচটি কাজই জলরঙে আঁকা। একটি কাজ রয়েছে, সেখানে ঝুম বৃষ্টির মধ্যে ছইতোলা নৌকার সামনে খুনসুটিতে মেতে ওঠা এক ঝাঁক সাদা পাখি।

বাবুল হোসাইন সোহাগের করা মায়াময় দৃশ্যগুলো দর্শনার্থীদের অনেকটা মনস্ক করে তোলে। বিবেকে নাড়া দেয়। অ্যাক্রিলিক ক্যানভাসে করা ‘পৃথিবীর স্বাদ’ সিরিজের কাজ নিয়ে তিনি উপস্থিত হয়েছেন। মিশ্রমাধ্যমে কাজ করেছেন কামালউদ্দিন। ‍তিনি রিয়েলিস্টিক কাজের জন্য বেশ পরিচিতি পেয়েছেন। কাজগুলোয় তার আগের কাজ থেকে ভিন্নতা রয়েছে। নগর, মানুষ এসবই তার কাজের গল্প।

13

আজমল হোসেনের অ্যাক্রিলিক ক্যানভাসে ফুটিয়ে তুলেছেন মৎস্যজীবীদের জীবনের গল্প। এ দৃশ্যগল্প চোখের দেখাতেই বলে দেয়া যায় অসাধারণ। দর্শনার্থীদের চোখ যেন আটকে যাচ্ছে এ শিল্পীর কাজগুলোতে। নবরাজ রায়ের কাজগুলোতে স্বতন্ত্রের সুর লক্ষ করা যায়। মোয়াজ্জেম জনির কাজ বিমূর্ত। ভেতরে একটা অন্যরকম সুর তোলে।

অজয় স্যান্যাল এঁকেছেন সমুদ্রতটের সাম্পানের ছবি। তবে তার কাজগুলো শুধু যে সাম্পান তা নয়, প্রকৃতির একটা খেয়ালি তুলে ধরেছেন। তা লক্ষণীয়। দিপীকা ভূঁইয়া এঁকেছেন নারীর অবয়ব। গ্যালারি ঘুরে ছবিগুলো দেখছিলাম। কয়েকটি চিত্রকর্ম বিক্রিও হয়েছে। সে নির্দেশিকা পেলাম ছবির নিচে লাল সংকেত দেখে।

হঠাৎ উপস্থিত হলেন শিল্পী আবুল বারক আলভী। তিনিও গ্যালারির ছবিগুলো দেখতে লাগলেন। কোনো কোনো চিত্রকর্মের কাছে গিয়ে ধীর স্বরে বলছেন, ‘বাহ! কাজগুলো দেখে মনে হচ্ছে শিল্পীর ধৈর্য আছে।’

এ শিল্পী আরো বলেন, ‘এটা মূলত কনটেম্পোরারি প্রদর্শনী। এখান থেকে প্রত্যেকের ইমপ্রুভ করার সুযোগ হবে, যা শিল্পের জন্য ফলপ্রদ। তবে এদের কাজগুলোয় স্বতন্ত্রের ছোঁয়া আছে।’ কথা বলতে বলতে তিনি দাঁড়ালেন, খাইদেম সিঁথি সিনহার করা চিত্রকর্মের সামনে। খুব নিমগ্নভাবে দেখলেন। তারপর বললেন, ‘সাহস আছে শিল্পীর। দমও আছে বেশ। নিখুঁত কাজ’। সিঁথির কাজে যেন চোখ ধাঁধিয়ে দেয়, তবে ফিরিয়ে নয়। এভাবেই শিল্পী সঙ্গ আর প্রদর্শন প্রসঙ্গে কেটে গেল এক মায়াময় সন্ধ্যা। ১২ শিল্পীর ৬০টি চিত্রকর্ম নিয়ে সাজানো এ প্রদশর্নী চলবে ২০ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত। বেলা ৩টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত খোলা থাকবে শিল্পাঙ্গনের এ গ্যালারির দুয়ার।