কেবল নববর্ষ নয়। বাংলাদেশে খুব কম মেলাই আছে যেখানে পুতুল গরহাজির থাকে। গ্রাম থেকে শহর পর্যন্ত বিস্তৃতি পুতুলের। অধিকাংশ উৎসবে থাকে পুতুল। পূজা-পার্বণ ও মেলার সঙ্গে যেমন যোগ, তেমনি সংযোগ ঈদ ও ওরস উপলক্ষে জমায়েতেও। মূলত ধর্মীয় বিশ্বাস ও লোকাচারকে কেন্দ্র করে হাজার বছর ধরে উৎসব পালিত হয় এ অঞ্চলে। বৈশাখ থেকে চৈত্র পর্যন্ত সিলেট থেকে চট্টগ্রাম অবধি অনুষ্ঠিত হওয়া সে মেলার সংখ্যা ঠিক কত তার হিসাব করা কঠিন। বর্ষা ও গ্রীষ্মে মেলার সংখ্যা কিছুটা কম। শরৎ, হেমন্ত, শীত ও বসন্তে মেলার সংখ্যা অনেক বেশি। এসব মেলাকে কেন্দ্র করে কুমাররা হরেক কিসিমের সামগ্রী তৈরি করে। হাঁড়ি, পাতিল ও নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের পাশাপাশি থাকে পুতুল।

8

পুতুল বাংলার প্রাচীন লোকশিল্পের উপাদান। এখানে এখনো এমন পুতুল পাওয়া যায়, যা প্রাচীন ঐতিহ্যের অনুসারী। প্রায় সব অঞ্চলেই পুতুল তৈরি হয়। তবে ঢাকা, রাজশাহী, ফরিদপুর, খুলনা, রাজবাড়ী, চট্টগ্রাম, টাঙ্গাইল, জামালপুর, রংপুর, বরিশাল প্রভৃতি অঞ্চলে পোড়ামাটির পুতুল সবচেয়ে বেশি। মাটির পুতুল ছাঁচের মাধ্যমে তৈরি করেন শিল্পীরা। কাঠের পুতুল তৈরি হয় বাটালির সাহায্যে। শোলা, কাপড়, কাগজ, ধাতব ইত্যাদি উপকরণ দিয়েও শিল্পীরা নানা কায়দা, কারুকাজ ও রঙ ব্যবহার করে চমৎকার পুতুল তৈরি করেন। পুতুল ছোট-বড় সবার আনন্দের খোরাক জোগায়। শিশুরা খেলা করে পুতুল নিয়ে। পুতুলনাচ এখনো সুপরিচিত ঐতিহ্য। পহেলা বৈশাখে বাংলার অধিকাংশ অঞ্চলেই পুতুলনাচের আসর বসে।

11

দেশের জাতীয় জাদুঘরের গ্যালারিতে প্রদর্শিত হচ্ছে পুতুল। পোড়ামাটির পুতুলের মধ্যে রয়েছে নানা প্রজাতির পাখি, হাঁস, বধূ, সন্ন্যাসী, সেতারবাদক, শিশু, পুরুষ, হাতি, ঘোড়া ইত্যাদি। রয়েছে রাখাল ও ছাগল, গাভী ও বাছুর, বানর ও বেদেনী। বাংলার পুতুলগুলোকে বিষয়বস্তুর দিক থেকে মোটামুটি তিনটি ভাগে ভাগ করা যায়। ধর্মীয় পুতুল, পশু-পাখির পুতুল অথবা মানুষের পুতুল। পৌরাণিক পুতুলের মধ্যে রয়েছে রাধা-কৃষ্ণ, শ্রীচৈতন্য, লক্ষ্মী, সরস্বতী, শিব ও গণেশ। লোকজ উপাদানের মধ্যে আছে বনবিবি, আটেশ্বর, ওলা, চণ্ডী, বড়খাঁ গাজি, করম ও সত্যপীর। পশু-পাখির পুতুলের মধ্যে বেশির ভাগই নেহাত ছোটদের খেলনার জন্য। সেগুলোর মধ্যে রয়েছে ভালুক, বাঁদর, মাছ, ঘোড়া ও অন্যান্য। এর বাইরে নানা রকম নারী-পুরুষের পুতুল রয়েছে। তবে তুলনায় নারীর পুতুল সবচেয়ে বেশি।

10

নববর্ষের সময়ে সবচেয়ে বেশি দেখা যায় টেপা পুতুল। কুমাররা এঁটেল মাটি দিয়ে টিপে টিপে তৈরি করেন। হাত দিয়ে টিপে তৈরি করার কারণেই মূলত এমন নাম। দেশে মেয়েরাই টেপা পুতুল তৈরি করেন; যদিও বর্তমানে পুরুষরাও জড়িত হচ্ছেন। হাতের সাহায্যেই তৈরি করা হয় পুতুলের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ। কাঠির রেখা দিয়ে ফুটিয়ে তোলা হয় অলংকার ও পোশাক। পরে রোদে শুকাতে দেয়া হয়। শুকানো হয়ে গেলে পোড়ানো হয় আগুনে। সাধারণত শিশুদের খেলনাসামগ্রী হিসেবে টেপা পুতুল বানানো হয়। শৌখিন ব্যক্তিরা গৃহসজ্জার জন্য এ পুতুল সাজিয়ে রাখেন। গ্রামবাংলার মেলায় টেপা পুতুলের পসরা সাজানো থাকে। বর্তমানে শহুরে মেলায়ও এ পুতুল দেখা যায়।

চার চাকাওয়ালা কাঠের ঘোড়া এবং হাতির পুতুলও বেশ জনপ্রিয়। সাধারণত কাঠ খোদাই করে ঘোড়া বা হাতির অবয়ব তৈরি করা হয়। উজ্জ্বল রঙের সাহায্যে সেসবের অঙ্গসজ্জাও করা হয়। পরে চারটি চাকা লাগানো হয়। এ ধরনের পুতুল তৈরিতে সোনারগাঁর শাহ্পুর গ্রাম প্রসিদ্ধ। নাচের পুতুল মাটি ও কাঠের তৈরি। এসব পুতুলের ওপরের অর্ধাংশে রঙের সাহায্যে চোখ, নাক, মুখ ইত্যাদি ফুটিয়ে তোলা হয় এবং নিচের অংশে ব্যবহার করা হয় কাপড়ের পোশাক। সাধারণত পাট দিয়ে চুল বানানো হয়। নাচের পুতুলের পোশাক-পরিচ্ছদ দৃশ্য অনুযায়ী তৈরি হয়। এ ধরনের পুতুল তৈরির প্রধান উপকরণ ভাঁটশোলা, ন্যাকড়া, কাদামাটি, লোহার তার, কাঠ, রঙ ইত্যাদি। নাচের পুতুল তৈরিতে একসময় ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কান্দিপাড়া গ্রাম প্রসিদ্ধ ছিল। সেখানকার কারিগররা প্রধানত হিন্দু সম্প্রদায়ের হলেও বর্তমানে কিছু মুসলমানও এ ধরনের পুতুল তৈরি করে। পুতুল তৈরি একটা বংশপরম্পরা ধরে চলমান পেশা। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে খাবি খেতে খেতেই টিকে আছে।

12

বৈশাখী মেলাসহ বিভিন্ন গ্রাম্য মেলা উপলক্ষে শোলার পুতুল তৈরি ও বেচাকেনা হয়। কাপড়ের পুতুল শিশুদের কাছে অধিক জনপ্রিয়। এ ধরনের পুতুল তৈরি হয় হাতে। বর্তমানে বিভিন্ন সংস্থা গৃহসজ্জার জন্য নানা ধরনের কাপড়ের পুতুল তৈরি করছে। পোশাক-পরিচ্ছদ ও অলংকারে বৈচিত্র্য থাকায় এসব পুতুল শুধু দেশে নয়, বিদেশেও সমাদর লাভ করছে। এগুলোর মধ্যে বর-কনে, বেদেনী, উপজাতীয় ও মণিপুরি নাচের পুতুল উল্লেখযোগ্য। পাটের তৈরি পুতুল বর্তমানে গৃহসজ্জার নিদর্শন হিসেবে জনপ্রিয়তা লাভ করেছে। এগুলো প্রায় প্রতি জেলায় পাওয়া যায়। কাগজের মণ্ড দিয়েও পুতুল তৈরি হয়। কাগজ ভিজিয়ে মণ্ড তৈরি করে ছাঁচের সাহায্যে এ ধরনের পুতুল তৈরি হয়। বর্তমানে বিভিন্ন সিরামিক প্রতিষ্ঠান চীনামাটির পুতুল তৈরি করছে। এসব পুতুল প্রধানত গৃহসজ্জার কাজেই ব্যবহৃত হয়। ঢাকার লালবাগ, ধামরাই ও সাভারে ধাতু দিয়ে বিভিন্ন ধরনের পুতুল ও দেব-দেবীর মূর্তি তৈরি হচ্ছে। একসময় এগুলোর প্রধান কারিগর হিন্দু সম্প্রদায় থাকলেও বর্তমানে মুসলমান কারিগরও এ ধরনের ধাতব পুতুল তৈরি করছেন।

13

পুতুল বাংলার নিজস্ব ঐতিহ্যের অংশ। এর ইতিহাস প্রাচীন বাংলার কৃষিজীবী জীবনের সঙ্গে জড়িত। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে কারিগররা হাতের কাছে যেসব উপকরণ পেয়েছেন, সেগুলোকেই ব্যবহার করেছেন পুতুল তৈরির জন্য। মাটি ও কাঠ দুটিই লোকশিল্পের প্রধান উপকরণ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। সঙ্গে এসেছে দড়ি, বেত, বাঁশ, ঘাস ও কাপড়ের মতো সহজলভ্য বস্তু। নানা বিবর্তন ঘটেছে। কিন্তু এখনো বাংলার মানুষের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের দলিল হিসেবে টিকে রয়েছে পুতুল।