হামজানামা। প্রায় হাজার বছর ধরে তুরস্ক থেকে ইন্দোনেশিয়া পর্যন্ত বিস্তৃত এক আখ্যানের নাম। নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর চাচা হামজা ইবন আবদুল মুত্তালিবের জীবন থেকে অনুপ্রাণিত। তবে সেখানে ঐতিহাসিক উপাদান তালাশ করা ভুল হবে; বরং নায়কোচিত এ বীরোপাখ্যানের অবয়ব গড়ে উঠেছে লোকগাথা, কিংবদন্তি, ধর্মীয় আলোচনা ও গুপ্তচরবৃত্তির কাহিনীর সমন্বয়ে। রয়েছে জাদুকর, দৈত্য, পরীসহ কল্পনাপ্রসূত অনেক চরিত্রের কাহিনী। কাহিনীটি আগে মুখে মুখে চর্চিত হতো; বর্তমানে সবচেয়ে পরিচিত রূপ হলো একটি হাতে আঁকা চিত্রকর্মের পাণ্ডুলিপি। ১৫৬২-৭৭ সালে সম্রাট আকবরের আমলে এটি তৈরি হয়েছিল। একদিকে এটি যেমন মোগল আমলের সূক্ষ্ম চিত্রশৈলীর প্রথম দিকের উদাহরণ হিসেবে বিখ্যাত; অন্যদিকে আকারেও চিত্রকর্মগুলোর মাঝে এটিই সবচেয়ে বড়।

44

প্রায় ১ হাজার ৪০০ চিত্রে সজ্জিত এ পাণ্ডুলিপি অত্যন্ত বৃহৎ আকারের। বেশির ভাগ চিত্রই আঁকা হয়েছে বড় আকারের কাপড়ের টুকরোয়, যা পরে কাগজের সঙ্গে যুক্ত করা হয়। চিত্রকর্মের লেখাগুলো পারস্যের নাস্তালিক লিপিতে। কিছু ক্ষেত্রে পাণ্ডুলিপির শুরুতে চিত্র ও লেখা একত্রে বা পৃষ্ঠার দুইপাশে সাজানো। পুরো পাণ্ডুলিপিটি মোট ১৪টি খণ্ডে বিভক্ত। পাণ্ডুলিপিটি পার্সিয়ান শিল্পী মির সায়্যিদ আলি ও আবদ আল-সামাদের তত্ত্বাবধানে তৈরি হয়েছিল; প্রথমজনকে পরবর্তী সময়ে প্রতিস্থাপন করে আবদ আল-সামাদকে আনা হয়। পাণ্ডুলিপিটি তৈরি করতে শতাধিক চিত্রকর, স্বর্ণকার এবং বই বাঁধাইকারী নিযুক্ত করা হয়েছিল। এর মধ্যে বাসাওয়ান ও দাশবন্তের মতো উল্লেখযোগ্য নাম রয়েছে। পুরো চিত্রকর্মটি সম্পন্ন করতে প্রয়োজন হয় ১৪ বছর। হামজানামা পারস্য ও ভারতীয় চিত্রশৈলীর সমন্বয় ঘটানোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল। তবে কাজটি সম্ভব হয়েছিল আকবরের আমলের ক্রমবর্ধমান শিল্পশালার ফলে। ভারতে কাজ করা চিত্রকর ও শিল্পীদের অনেকেই এ চিত্রকর্ম তৈরিতে অংশ নিয়েছিলেন। হামজানামার কারুকাজ এবং সাহসী রঙের ব্যবহার, পূর্ববর্তী পারস্য চিত্রকর্মগুলোর চেয়ে আলাদা। সম্ভবত এর কারণ পারস্যে অত্যন্ত সূক্ষ্ম গ্রাউন্ড রঙ ও কাগজের অভাব, যা ছিল ভারতবর্ষের শিল্পীদের জন্য সহজলভ্য। কাব্যিক দিক থেকে পাণ্ডুলিপিটি তুতিনামার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত, যেখানে চরিত্রগুলো একটি কেন্দ্রীয় ঘটনার ওপর ভিত্তি করে চিত্রায়ণ করা হয়। মূলত কোনো একটি পর্বকে কেন্দ্র করে এ-জাতীয় চিত্রকর্মের সব চরিত্র গড়ে ওঠে এবং কাহিনী এগোতে থাকে। সব মিলিয়ে পাণ্ডুলিপিটি মোগল আমলের সূক্ষ্ম চিত্রশৈলীর একটি অনন্য উদাহরণ হয়ে টিকে আছে।

হামজানামা কাব্যটি এমন একটি ঐতিহ্যের অংশ, যেখানে চিরায়ত সাহিত্য উপভোগ করতে শিক্ষাগত যোগ্যতার খুব একটা প্রয়োজন ছিল না। মোগল সম্রাট আকবর নিজেই নিরক্ষর ছিলেন, কিন্তু তিনি হামজানামার মতো বিভিন্ন মহাকাব্যের চিত্রিত রূপ তৈরিতে উৎসাহ দিয়েছিলেন। বাস্তবে ব্যক্তির নিরক্ষরতা মাঝে মাঝে এ-জাতীয় শিল্পকর্ম উপভোগ করতে প্রয়োজনীয় হয়ে ওঠে। কারণ সেক্ষেত্রে দর্শক ও শ্রোতার কল্পনা বক্তার শব্দ বা শিল্পীর চিত্রে আবদ্ধ না হয়ে মুক্তভাবে চিন্তা করতে পারে। এ কাব্যসাহিত্যের বর্ণনাকারী বা গীতিকাররা সে সময়ের মানুষ, যখন দিনের আকার ছিল দীর্ঘ এবং রাতে মানুষের ঘর আলোকিত হতো প্রদীপের আলোয়। গীতিকারের কাজ ছিল এমনভাবে বর্ণনা করা, যাতে শ্রোতাদের মনোযোগ ধরে রাখা যায় এবং তারা পরের অংশ শুনতে আগ্রহী থাকে। যদিও গীতিকারদের কবি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়, তারা স্বাধীনভাবে আরো উপাদান ব্যবহার করতেন, যা তাদের আবৃত্তিকে আরো প্রাসঙ্গিক বা পরিবেশের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ করে তুলত।

এখন পর্যন্ত যেসব পুরো পাণ্ডুলিপির চিত্রকর্ম অবশিষ্ট রয়েছে, সেগুলো পৃথিবীজুড়ে বিভিন্ন জাদুঘরে রাখা আছে। এর মাঝে ৬০টি চিত্র ভিয়েনার অ্যাপ্লাইড আর্টস মিউজিয়াম (Österreichisches Museum für Angewandte Kunst বা MAK) এবং ২১টি চিত্র লন্ডনের ভিক্টোরিয়া অ্যান্ড অ্যালবার্ট মিউজিয়ামে (VA) সংরক্ষিত রয়েছে।