বিশ্বের নানা প্রান্তের শিল্পী, কিউরেটর, সমালোচক ও শিল্পপ্রেমীরা এখানে একত্র হন নতুন শিল্পভাবনা, রাজনৈতিক বাস্তবতা এবং মানবিক সংকট নিয়ে আলোচনা ও সৃজনশীল প্রকাশের জন্য।

এ আয়োজনের যাত্রা শুরু হয় ১৮৯৫ সালে। এবারের আসরটি ৬১তম। গত ৯ মে শুরু হয়েছে। চলবে ছয় মাসব্যাপী। পর্দা নামবে আগামী ২২ নভেম্বর। আয়োজকদের তথ্য অনুযায়ী, ছয় মাসব্যাপী এ শিল্পমেলায় পাঁচ লাখেরও বেশি দর্শক অংশ নেবেন। ৯৯টি দেশের শিল্পকর্ম ছড়িয়ে রয়েছে ৩১টি স্থায়ী জাতীয় প্যাভিলিয়ন, জিয়ারদিনি, আর্সেনাল ও শহরের বিভিন্ন প্রদর্শনী স্থানে।

এবারের বিয়েনালে শুরু থেকেই ছিল নাটকীয়তা ও বিতর্কে ভরপুর। প্রধান কিউরেটরের আকস্মিক মৃত্যু, রাশিয়ার অংশগ্রহণ ঘিরে রাজনৈতিক বিরোধ, ইসরায়েলি প্যাভিলিয়ন নিয়ে বিতর্ক এবং জুরির পদত্যাগ—সব মিলিয়ে শিল্পের পাশাপাশি আলোচনায় উঠে এসেছে বৈশ্বিক রাজনীতি ও নৈতিকতার প্রশ্নও।

শেষ পর্যন্ত উদ্বোধনী সপ্তাহে সবচেয়ে বেশি আলোড়ন তোলে অস্ট্রিয়ার প্যাভিলিয়ন। ফ্লোরেন্তিনা হোলজিঙ্গার ও কিউরেটর নোরা-স্ভান্টিয়ে আলমেসের যৌথ আয়োজন ‘সি-ওয়ার্ল্ড ভেনিস’ যেন পুরো বিয়েনালের প্রতীকী কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। এ প্রদর্শনীতে দর্শকদের ব্যবহৃত টয়লেটের পানি পরিশোধন করে একটি বিশাল অ্যাকুয়ারিয়ামে পাঠানো হয়, যেখানে পারফরমাররা ঘণ্টার পর ঘণ্টা ভেসে থাকেন। অন্যদিকে মঞ্চজুড়ে ছিল কাদা, বর্জ্যপানি, প্লাবিত পুল ও নগ্ন পারফরম্যান্স। বিশুদ্ধতা ও দূষণ, মানবদেহ ও পরিবেশ বিপর্যয়—সবকিছুকে একসঙ্গে এনে শিল্পীরা এখানে আধুনিক সভ্যতার সংকটকেই তুলে ধরেছেন।

অস্ট্রিয়ার এ প্যাভিলিয়নের ভিড়ের বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার প্যাভিলিয়নে দর্শক উপস্থিতি তুলনামূলক কম। ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে ২০২২ সালে বিয়েনালে নিষিদ্ধ হওয়া রাশিয়াকে আবার অংশগ্রহণের সুযোগ দেয়ায় ব্যাপক সমালোচনা হয়। এমনকি ইউরোপীয় কমিশন অনুদান প্রত্যাহারের হুমকিও দেয়।

রাশিয়ার প্যাভিলিয়নের সামনে প্রতিবাদ জানায় রুশ ভিন্নমতাবলম্বী সংগঠন পুসি রায়ট এবং ইউক্রেনীয় নারীবাদী সংগঠন ফেমেন। সংশ্লিষ্টদের মতে, সেই প্রতিবাদই হয়ে ওঠে প্যাভিলিয়নের প্রদর্শনীর চেয়েও বেশি প্রাণবন্ত ও অর্থবহ।

1

‘সি-ওয়ার্ল্ড ভেনিস’ ছবি : মারিয়ানা

অন্যদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্যাভিলিয়নে শিল্পী আলমা অ্যালেনের ভাস্কর্য প্রদর্শিত হলেও সেখানে প্রত্যাশিত দর্শক ভিড় দেখা যায়নি। অথচ এ প্যাভিলিয়ন অতীতে লুইস বুর্জোয়া, জ্যাসপার জনস ও সিমোন লির মতো শিল্পীদের স্মরণীয় কাজের সাক্ষী ছিল।

বিয়েনালের আনুষ্ঠানিক প্রদর্শনীর বাইরেও পুরো ভেনিস শহর যেন রূপ নিয়েছে এক বিশাল সাংস্কৃতিক উৎসবে। গ্র্যান্ড ক্যানালের ধারে অবস্থিত গ্যালারি দেল একাডেমিয়ায় পারফরম্যান্স শিল্পী মারিনা আব্রামোভিচ আয়োজন করেছেন ‘ট্রান্সফরমিং এনার্জি’ নামের ইন্টারঅ্যাকটিভ প্রদর্শনী। এখানে মোবাইল ফোন ব্যবহার নিষিদ্ধ। দর্শকদের ধীর হতে, নীরব থাকতে এবং শিল্পের সঙ্গে সরাসরি সংযোগ তৈরি করতে উৎসাহিত করা হয়।

৮০ বছরে পা দেয়ার আগমুহূর্তেও মারিনা আব্রামোভিচ নতুনভাবে শিল্পের সীমা ভাঙছেন। তার ভাষায়, ‘টেলিফোন এখন আমাদের শরীরের অংশ হয়ে গেছে।’ প্রযুক্তিনির্ভর পৃথিবীতে মানুষের মনোযোগ ও উপস্থিতির সংকট নিয়েই তিনি প্রশ্ন তুলেছেন।

এছাড়া ফন্দাজিওনে প্রাদায় আয়োজিত ‘হেলটার স্কেলটার’ প্রদর্শনীতে আর্থার জাফা ও রিচার্ড প্রিন্স যুক্তরাষ্ট্রের এমন এক বাস্তবতা তুলে ধরেছেন, যা দাসপ্রথা, কৃষ্ণাঙ্গ সংস্কৃতি, প্রতিবাদ ও উপসংস্কৃতির ইতিহাসে গড়ে উঠেছে।

এবারের ভেনিস বিয়েনাল কেবল একটি শিল্প প্রদর্শনী নয়, বরং সমকালীন বিশ্বের অস্থিরতা, সংঘাত, পরিবেশ সংকট ও মানবিক প্রশ্নের এক বহুমাত্রিক প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠেছে। এখানে শিল্প শুধু নান্দনিকতার অনুশীলন নয়; বরং প্রতিবাদ, প্রতিরোধ, স্মৃতি ও ভবিষ্যৎ কল্পনার ভাষা। কখনো প্লাবিত প্যাভিলিয়নের ভেতরে, কখনো নীরব পারফরম্যান্সে, আবার কখনো রাস্তায় উচ্চারিত রাজনৈতিক স্লোগানে শিল্পীরা তুলে ধরেছেন এ সময়ের গভীর অনিশ্চয়তা এবং এ থেকে উত্তরণের আকাঙ্ক্ষাকে।

খালি প্যাভিলিয়ন, কূটনৈতিক বিতর্ক ও রাজনৈতিক উত্তেজনার মাঝেও কিছু কাজ সবচেয়ে আলো ছড়িয়েছে। পাশাপাশি দর্শককে অস্বস্তির মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে এবং নতুন করে ভাবতে বাধ্য করেছে। বিশেষ করে নারী শিল্পীদের নেতৃত্বে নির্মিত বহু প্রকল্প প্রমাণ করেছে, সমকালীন শিল্প এখন আর শুধু প্রদর্শনের বিষয় নয়; এটি ক্ষমতার কাঠামো, রাজনীতি, পরিবেশ এবং মানবিক অস্তিত্ব নিয়ে গভীর সংলাপের ক্ষেত্র। আর সেই কারণেই ভেনিস বিয়েনালে এখনো শিল্পজগতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চগুলোর একটি, যেখানে পৃথিবীর পরিবর্তিত বাস্তবতা প্রথমে ধরা পড়ে শিল্পের ভাষাতেই।

সিএনএন অবলম্বনে বাশার খান