কবির আহমেদ মাসুম চিশতির জন্ম ১৯৭৬ সালে। ভাস্কর্য নিয়ে পড়াশোনা করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। তার সৃষ্টিতে থাকে বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক শেকড়ের ঘ্রাণ। রাজধানীর কলা কেন্দ্রে সম্প্রতি চলছে তার ৩৮টি শিল্পকর্ম নিয়ে বিশেষ প্রদর্শনী ‘মেঘনাদবধ’। মাইকেল মধুসূদন দত্তের মহাকাব্যের দৃশ্যরূপ দিয়েছেন তিনি। সেই দীর্ঘ সফরের অভিজ্ঞতা ও চিন্তা নিয়ে শিল্পী কথা বলেছেন বণিক বার্তার সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আহমেদ দীন রুমি—

কলা কেন্দ্রে আপনার প্রদর্শনী চলছে মেঘনাদবধ শিরোনামে। শিল্পীজীবনের বড় একটা সময়ের সাধনার ফল। এ সফরের শুরুটা যদি আমাদের বলতেন। 

যখন উচ্চ মাধ্যমিকে পড়ি, তখন পাঠ্যপুস্তকে মেঘনাদবধ মহাকাব্যের একটা অংশ ছিল। তখন পড়তে গিয়ে একটা টান তৈরি হয়। তবে তখনো চিন্তা করিনি কাজ করার। মায়ের কাছ থেকেও তখন মধুসূদন দত্তের জীবন নিয়ে গল্প শুনেছি। তারও একটা প্রভাব ছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ে এলে বাংলা সাহিত্যের প্রতি আগ্রহ বাড়ে। গ্র্যাজুয়েশন শেষে শিল্পচর্চায় দীর্ঘদিন ছিলাম। কিন্তু তখনো চিন্তা হয়নি। মেঘনাদ নিয়ে এভাবে কাজ শুরু করি ২০১৫ সালে। তখন  আমি টোকিওতে আর্টিস্ট রেসিডেন্সি প্রোগ্রামে। পড়াশোনা করার জন্য প্রচুর সময় পাওয়া যাচ্ছে। জাপানি সংস্কৃতি ও শিল্প নিয়ে জানলাম। দেখলাম ওদের জনপ্রিয় সংস্কৃতি। মাঙ্গা বইগুলো অনেক বিক্রি হয় সেখানে। ভেতরে এক ধরনের আগ্রহ তৈরি হলো। ড্রয়িংগুলো দেখতাম। মনে হলো এ ধরনের কোনো কাজ করা যেতে পারে। বাংলাদেশে ফিরে এসে বন্ধুর সঙ্গে মিলে নারায়ণগঞ্জে একটা স্টুডিও দিই। মূলত সেখানেই আমি মেঘনাদবধ সিরিজটা শুরু করি। আস্তে আস্তে এগোতে থাকে কাজ। শেষ ড্রয়িংটা করা হয়েছে ২০১৯ সালে। মহামারী শুরু হওয়ায় তারপর আর এগোতে পারিনি। দীর্ঘদিন ধরে শো করতে চাচ্ছিলাম। সবার সহযোগিতা ও সাহসেই সম্ভব হলো।

5

মাইকেলের মেঘনাদ ও পৌরাণিক মেঘনাদ তো আদর্শিক ও দার্শনিকভাবে আলাদা। আপনি আঁকার সময়ে কোনটায় প্রভাবিত হয়েছেন?

আমি মাইকেল মধুসূদনের মেঘনাদকেই নিয়েছি। তার মেঘনাদের প্রতিই দরদ বেশি। মাইকেল মধুসূদন অনেকটা মানবিক। মিল্টন কিংবা হোমারের কথা মনে করিয়ে দেয়। মেঘনাদ এখানে সামরিক নেতার চেয়ে অনেক বেশি কাছের। মনে হয় পাশের বাড়ির ছেলেটা। 

সাহিত্যকে উপজীব্য করে বাংলাদেশে এভাবে শিল্পচর্চার নজির খুব কম। সম্ভবত আব্দুস শাকুর শাহ করেছেন মৈমনসিংহ গীতিকা নিয়ে। এ শূন্যতা নিয়ে কিছু বলেন। 

বিভিন্ন দেশের শিল্পীদের শিল্পচর্চার ক্ষেত্রটা আমি দেখেছি। যে কলেবরে তারা চর্চা করে, তা এখনো আমাদের এখানে হয়নি। সুযোগ হয়নি কিংবা হওয়ার অপেক্ষায় আছে। কিছুদিন আগেও শিল্পকলাচর্চা চারুকলাকেন্দ্রিক ছিল। এখন কিন্তু ক্রমান্বয়ে বাড়ছে। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা থেকে কাজ হচ্ছে। চারুকলার চর্চাটা জনগোষ্ঠীর তুলনায় খুব ছোট। সাহিত্যচর্চার সঙ্গে তুলনা করলেও পরিসীমা খুব ক্ষুদ্র। এ ক্ষুদ্র পরিসীমার মধ্যেও সক্ষমতা কিন্তু বেশ ভালো। যদি শিল্পীদের অর্থনৈতিক ও পারিবারিক প্রতিন্ধকতা না থাকে। প্রতিবন্ধকতা বলব না, মানুষ এটা নিয়েই এগোয়। হয়তো এখন ছোট লাগছে, পরবর্তী প্রজন্মে ভালো করবে। তার পরও সুযোগ থাকলে শিল্পীরা আরো ঢের কাজ করতে পারতেন। 

তার মানে কিছু প্রতিষ্ঠান থাকলে শিল্প পরিস্থিতি ভিন্ন রকম হতো?

আরো অনেক কিছু করা যেত। আমার একটা দুঃখ আছে। জাপান আমাকে একটা সুযোগ দিয়েছে। সেখানে বিভিন্ন দেশের আর্টিস্টরা আসত। তারা জানতে চাইত আমার দেশের অবস্থা। এ রকম কোনো সুযোগ আছে কিনা। তখন অসহায় অনুভব করতাম। শিল্পীদের যে খুব বেশি টাকা দিতে হয় তেমন না। পৃথিবীর সব শিল্পী প্রায় এক রকম। একটু কাজ করার জায়গা পেলে আর বিরক্ত না করলেই হলো। অল্প পয়সাতেই তারা খুশি। এশিয়ান বিয়েনালে ছাড়া তো এদিকে সুযোগ খুব একটা নেই। তাও সেখানে থাকা যায় না। দু-একটা যে প্রতিষ্ঠান আছে, তারাও বিদেশী ফান্ড নিয়ে বিদেশী শিল্পী আনে। সরকার যদি রেসিডেন্সি প্রোগ্রাম চালু করে বা তহবিলের ব্যবস্থা করে তাহলেও হয়। তবে বিষয়টা শুধু সরকারেরও না। যদি দুই-দশজন মানুষ মিলে পৃষ্ঠপোষকতা দেয়; তাহলেও শিল্পী ও শিল্পের জন্য ভালো হয়। 

6

মেঘনাদবধ নিয়ে করা কাজগুলো কি একটানা? নাকি মাঝখানে বিরতি দিতে হয়েছিল?

২০১৫ সালে টানা কাজ করেছি। খুব অল্প সময়ই দিয়েছি অন্য কিছুতে। একটানা কাজ করেছি ২০১৬ সালেও। তবে কাজের মাত্রাটা কমে গেছে। আমার টাকা যত শেষ হয়েছে, তত মাত্রা কমেছে। নারায়ণগঞ্জের স্টুডিওতে তখনো থাকি। একদিন মনে হলো শিগগিরই টাকার অভাব শুরু হবে। স্টুডিও ছেড়ে দিয়ে নিজের ঘরে জায়গা নিলাম। যেন স্টুডিও ভাড়া ও মেইনটেন্যান্স নিয়ে ভাবতে না হয়। ঘরে এসে যখন দুয়ার বন্ধ করলাম, পরিবার দেখল ঘর বন্ধ করে থাকা। চিন্তায় পড়ে গেল আমার মানসিক অবস্থা নিয়ে। তখন খুব কম বের হতাম। মেঘনাদ নিয়ে কাজ মোটামুটি ২০১৯ সাল পর্যন্ত ছিল। তবে এর মধ্যে অন্য কাজ যে করিনি, তা না। ছোটখাটো কাজ করতাম; বিভিন্ন সফরে গিয়েছি।

মেঘনাদবধ সিরিজে এখন পর্যন্ত মোট ড্রয়িংয়ের সংখ্যা কত?

আমি মোট ৪০টি ড্রয়িং করেছি সিরিজটিতে। তার মধ্যে দুটো ড্রয়িং উপহার দিয়েছি একটা চ্যারিটিতে। ওরা বিক্রি করে টাকাটা চ্যারিটিতে রেখেছে। কলা কেন্দ্রের প্রদর্শনীতে ৩৮টি রাখা। তবে আরেকটা নতুন শুরু করেছি। আমার স্বপ্ন হলো মেঘনাদবধ নিয়ে আরো কাজ করা। সত্যি বলতে যা এখন সামনে, তা সিরিজের বিশ ভাগের এক ভাগ। আরো উনিশ ভাগ আমাকে শেষ করতে হবে। 

পুরো সফরে উল্লেখযোগ্য কোনো স্মৃতি যদি উল্লেখ করতেন...

কাজের সময়কার স্মৃতি বলতে পরিবারের সবার কাছে আমার পাগল হয়ে যাওয়াটাই। আমি যে কাজ করছি, এটা কাউকে বোঝাতে পারছিলাম না। কৈফিয়ত দিতে হয়েছে, বিব্রত হয়েছি তখন। কাজটা নিয়ে এতটাই বুঁদ ছিলাম যে তাদেরও বুঝতে পারতাম না। তারা ভেবেছিল মানসিক কোনো সমস্যার মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। এখন ভাবলে মজা লাগে; কিন্তু সময়টা তখন বেদনাদায়ক ছিল। একদিক থেকে বলতে গেলে, কাজের মধ্যে থাকার সময় আনন্দেও ছিলাম। মধুসূদনের লেখায় সবকিছু বোঝা যায় না। শব্দের অর্থ বুঝতে নানা সূত্র ঘাঁটতে হয়। টীকা বুঝতে হয়। কবিতার সমান্তরালে আঁকার জন্য খুব মনোযোগী হওয়া দরকার। 

আরেকটা স্মৃতি মনে পড়ে। ২০১৫ সালের ডিসেম্বরে আরেকটা সুযোগ পাই আমি। মেঘনাদবধ বই নিয়ে যাই যুক্তরাষ্ট্রের কোহেগেনে। জায়গাটা বনের মতো। স্টুডিওর পাশে একটা ম্যাপল ট্রি ছিল। তার নিচে আমি টেবিল ও চেয়ার বসাই। সেখানে বাংলা অভিধান ও পৌরাণিক অভিধান নিয়ে পড়াশোনা করতাম। তখন গ্রীষ্মকাল। একদিন দুপুরে লাঞ্চে গেছি। এক আমেরিকান বন্ধু হন্তদন্ত হয়ে এসে জানাল, ‘তোমার সব বই গরুতে খেয়ে ফেলছে। মাত্র একটা বাঁচানো গেছে।’ আসলে পাশেই গরুর খামার ছিল। ওইখানে গরু ঢুকে কিছু পাতা খেয়ে ফেলেছে।

সামগ্রিকভাবে আঁকাআঁকির শুরুটা কীভাবে?

ছোটবেলা থেকেই বন্ধুরা আমাকে আর্টিস্ট বলত। হাই স্কুল ও হোস্টেলেও পরিচিতি ছিল। নাইনে ওঠার পর তো বন্ধুদের খাতা আমার করা লাগত। আমার বান্ধবী বলল, ‘ছবি এঁকে তুই টাকা নিবি।’ আমি বললাম, ‘আমি তো টাকা চাইতে পারব না।’ পরে বলল, ‘আমার কাছে পাঠায় দিবি।’ সেটাই আমার প্রথম আয়।

তবে কখনো মনে হয়নি আমি চারুকলায় পড়ব। নারায়ণগঞ্জের এক ছোট ইনস্টিটিউটে পড়তাম। আমরা তিন-চারজন পরীক্ষা দিলাম। একদিন গ্রাফিক ডিজাইনের গিয়াস ভাই বললেন, ‘তোমাদের ক্লাস শুরু হয়ে যাচ্ছে, যাও না কেন’? বললাম, ‘যাই না মানে’? বলল, ‘তোমার নাম আমি দেখছি।’ তার পরই আমি গেলাম চারুকলায়। বোর্ডে নিজের নাম দেখলাম। চার-পাঁচদিন দেরি হয়ে গিয়েছিল।

বাংলাদেশের আর্ট মার্কেট এখনো সেভাবে দাঁড়ায়নি। ব্যাপারটা নিয়ে আপনার বক্তব্য জানতে চাই।

আর্ট মার্কেট আলাদা একটা শিল্প। আমরা কয়েকজন শিল্পী মিলে আমরা ক্যাফে দিয়েছিলাম কাকরাইল মোড়ে। যেন টাকা-পয়সার চিন্তা করতে না হয়। কাজটা করতে গিয়ে মনে হয়েছে, টাকা উপার্জন করাও আরেকটা শিল্প। এটার জন্য তেমন মাপের শিল্পী দরকার। আর্টিস্টরা এটা করতে পারবে বলে মনে হয় না। এমন কাউকে লাগবে, যিনি আর্টও জানেন এবং টাকা-পয়সা উপার্জনের শিল্পও জানেন। 

নতুনদের উদ্দেশে কিছু বলবেন কি?

যারা সাহিত্য নিয়ে কাজ করতে চান, তাদের উৎসাহ দিতে চাই। তাদের আসা উচিত সামনে। এখন জীবন অনেক অবমুক্ত। বাংলাকে আরো সমৃদ্ধ করার দিকে সবাই নজর দিলে ভালো হয়। শব্দ ইমাজিনেশন তৈরি করতে পারে, বহুমাত্রিক ইমাজিনেশন। একটা শব্দ একজন শোনার পর যা হবে; আরেকজনের ওপর সেটা হবে না। যদি শব্দের চর্চা সবাই করে, তাহলে নিজেও সমৃদ্ধ হবে; ভাষাও।