শিল্পকলায় পরাবাস্তবতার শুরুয়াত দার্শনিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলন হিসেবে। ভিত্তি স্থাপিত ছিল সিগমুন্ড ফ্রয়েডের তত্ত্ব এবং দাদাবাদীদের কাজে। তারপর বিদ্যুতের গতিতে ইউরোপ ও আমেরিকায় ছড়িয়ে পড়ে এ নয়া প্রবণতা। পরাবাস্তব শিল্পকর্মগুলো শিল্পীমনের গভীর থেকে উৎসারিত। এক্ষেত্রে শিল্পীরা তাদের অবচেতন ও অপ্রতিরোধ্য চিন্তাকে দৃশ্যমান ভাষায় হাজির করেন। ফলে যেন কোনো স্বপ্ন দেখার অনুভূতি দেয় প্রায়ই। তৈরি করে যুক্তিহীন ও অবাস্তব প্রেক্ষাপটের গাঁথুনি।

পরাবাস্তবতার শেকড় উনিশ শতকে। জনপ্রিয় হয়েছে সালভাদর দালি ও পল ডেলভোর হাতে। তার পরও কল্পনাপূর্ণ এ শিল্পশৈলী এখনো জিইয়ে রেখেছেন শিল্পীরা। তুলনামূলক কম আলোচিত হলেও সমকালীন ইন্দোনেশিয়ার শিল্পীরা স্বতন্ত্রভাবে এগিয়ে নিচ্ছেন পরাবাস্তবতার ধারা। সেক্ষেত্রে প্রথমেই উল্লেখ করা যায় রেইনওয়াটার হার্ভেস্টিং চিত্রকর্মের কথা। চিত্রকর্মটির কেন্দ্রে রয়েছে অস্বাভাবিকভাবে বড় নারিকেলের খোল। তাতে আরোহণের জন্য রাখা মই। শিল্পী রিনালদি শ্যাম তার অ্যাক্রিলিক চিত্রকর্মটিতে বাস্তবতা এবং কল্পনাকে সাবলীলভাবে মিশিয়ে নিয়েছেন। বিষয়বস্তুকে পরাবাস্তব মেজাজে উপস্থাপন করার দক্ষতা তাকে সমকালীন ইন্দোনেশীয় শিল্পীদের মধ্যে স্বতন্ত্র অবস্থানে নিয়ে গেছে; তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ এটি। রিনালদির কাছে শিল্পকর্ম শুধু ক্যানভাসের রঙের খেলা নয়, তার চেয়ে গভীর কিছু। তবে শিল্পী ইরওয়ান গুনতার্তোর বিষয়বস্তু কিছুটা ব্যতিক্রম। দ্রুত শিল্পায়নের বিকাশে যখন অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির আলোচনা, সেখানে তিনি টেনে এনেছেন পরিবেশের ওপর নেতিবাচক প্রভাব। ইরওয়ান গুনতার্তো প্রকৃতির ওপর শিল্পায়নের নেতিবাচক দিককে এঁকেছেন ‘ইজ দেয়ার স্টিল অ্যানি স্পেস’ শিরোনামে। প্রাণীর প্রতীক ব্যবহার করে তিনি পরিবেশের অবক্ষয়ের ফলে বাস্তুতন্ত্রে সৃষ্ট বিশৃঙ্খলাকে তুলে ধরেছেন। ইরওয়ানের শিল্পকর্মগুলো মূলত রাজনৈতিক দুর্নীতি, সামাজিক ও অর্থনৈতিক সমস্যা, পরিবেশের অবনতি এবং সাংস্কৃতিক রীতিনীতির সমালোচনা হিসেবে হাজির হয়।

16

মহামারীতে নিজের ঘরে আটকে থাকলেও মারিও ভিয়ানি দেখতে চেয়েছেন পুরো দুনিয়াকে। মহামারীর সঙ্গে লড়াইয়ে তখন খাবি খাচ্ছে গোটা দুনিয়াই। নিজের ও তাবৎ দুনিয়ার সে অপ্রত্যাশিত পরিস্থিতিকে তিনি তুলে ধরেছেন লাইভ স্ট্রিমিং চিত্রকর্মে। যখন আনুষ্ঠানিকভাবে দেখা করা সম্ভব না, তখন বিশ্বপ্রযুক্তির দিকে ঝুঁকে পড়ে পরস্পরের সঙ্গে থাকতে। মারিও লক্ষ করেছেন, এ নতুন প্রবণতা আমাদের যোগাযোগের পদ্ধতিতে প্রভাব ফেলেছে। তিনি ‘লাইভ স্ট্রিমিং’ নামে নতুন বাস্তবতাকে ক্যানভাসে প্রকাশ করতে চেষ্টা করেন। রূপক চিত্রকর্মটিতে আমাদের সঙ্গে প্রযুক্তির সংযোগকে এক ধরনের সম্প্রসারণ হিসেবে প্রতিফলিত হয়। মারিও তার কাজের মাধ্যমে প্রযুক্তির প্রতি আমাদের আসক্তির বিভিন্ন দিক তুলে ধরতে এ অনুসন্ধান চালিয়ে যান। বিপরীতে শিল্পী কুসবুদিয়ান্তোকে টানে লোকজ উপাদান। তার ‘সলিডারিটি’ চিত্রকর্মে তিনি নৈপুণ্যের সঙ্গে আন্দোলন, আকার ও রঙের সমন্বয় করেছেন। চিত্রকর্মটি উজ্জ্বল চরিত্র, প্রাণী ও টেক্সচারযুক্ত প্যাটার্নে ভরপুর। এটাই ব্যতিক্রম না; তিনি প্রায়ই শক্তিময় সব চিত্রকর্ম তৈরি করেন, যেখানে ঐতিহ্যবাহী ইন্দোনেশিয়ান মোটিফ, উজ্জ্বল বাটিক প্রিন্ট ও জাভানিজ সংস্কৃতির উপাদান মিশ্রিত থাকে। অবশ্য এ গতিশীল চিত্রধারার পেছনে রয়েছে সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দুরবস্থার সমালোচনা।

সৃষ্টিশীল প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাওয়ার সময় শিল্পীকে নানা দ্বিধাকে অতিক্রম করতে হয়। সেই পরিস্থিতিকে দৃশ্যরূপ দিয়েছেন ত্রিয়ানা নুরমারিয়া তার ‘কনফিউশন’ চিত্রকর্মে। রূপকের মাধ্যমে তিনি তার উৎকণ্ঠা প্রকাশ করেন। তুলে ধরেন ক্যানভাসে স্বপ্ন ও কল্পনার পাশাপাশি অ্যাডভেঞ্চারের প্রতি তার রুচি। ত্রিয়ানা দেহের অঙ্গভঙ্গি এবং আচরণের প্রতি মনোযোগী, যা তিনি তার স্বতঃস্ফূর্ত ও শক্তিশালী তুলি চালনার মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলেন। প্রবণতা যথেষ্ট ব্যক্তিক বলেই সিদ্ধান্ত নেয়া যায়। কিন্তু শিল্পী মায়েক প্রায়িতনোর কাজ বাইরের দুনিয়া নিয়ে। ‘সিভিলাইজেশন বার্ডেন’ চিত্রকর্মে তিনি জনসংখ্যা বৃদ্ধির বাস্তবতা এবং পরিণতি প্রকাশ করেছেন। মায়েকের চিত্রকর্ম প্রায়ই সমাজে দ্রুত উন্নয়নকে প্রতিফলিত করে। তার কাজগুলো জটিল, যেখানে রয়েছে মানবদেহের বিভিন্ন অংশ, যন্ত্রপাতি এবং শহুরে কাঠামোর মিশ্রণ। বিকৃত ও অতিরঞ্জিত প্রতিচ্ছবির মাধ্যমে তিনি তুলে ধরেছেন প্রযুক্তিগত অগ্রগতি, আধুনিক সমাজের শৃঙ্খল ও অন্তহীন আকাঙ্ক্ষার উত্থানকে।

17

গ্রোইং আন্ডার দ্য শ্যাডো শিল্পী মুলইয়ো গুনারসোর স্বপ্নময় চিত্রকর্ম। এখানে তিনি একটি প্রাকৃতিক বাস্তুতন্ত্রের আদর্শ অবস্থার প্রতীককে তুলে ধরেছেন। মুলইয়ো গুনারসো পরিবেশগত স্থায়িত্বের একজন গর্বিত যোদ্ধা। তিনি শিল্পকর্মে অদ্ভুত কল্পনাকে পরিবেশগত সচেতনতার সঙ্গে মিশিয়ে হাজির করেন। গল্প বুনতে চেষ্টা করেন এবং বর্তমানে দায়িত্বশীলভাবে বেঁচে থাকার গুরুত্ব তুলে ধরার চেষ্টা করেন। মুলইয়ো সূক্ষ্ম বিবরণগুলোকে কল্পনা ও রঙের কোলাজে রূপান্তর করার প্রক্রিয়াটি উপভোগ করেন, যা শেষ পর্যন্ত চিত্রকর্মে পরিণত হয়। প্রকৃতির উপাদান ব্যবহার করেন রূপক আকারে। আধুনিক সময়ে প্রকৃতির ভারসাম্যহীনতা ও নিঃসঙ্গতা চিত্রিত করেন তিনি। এক্ষেত্রে অরোরা সান্তিকার ‘আই উইশ টু ফ্লাই’ অ্যাক্রিলিক চিত্রকর্মটির কথা উল্লেখ করা যায়। আত্মবিশ্লেষণ, একাকিত্ব, হতাশা এবং ভয়ের প্রতিফলন ঘটায়। অরোরা সায়ন্তিকা উজ্জ্বল রঙের রূপক চিত্রের মাধ্যমে প্রতীকী প্রতিবন্ধকতা থেকে মুক্ত হওয়ার লুকানো আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করেছেন। এ চিত্রকর্মে তিনি রক্ষণশীল সমাজের শৃঙ্খল থেকে পালিয়ে যাওয়া এবং স্বাধীনতার ধারণা তুলে ধরেছেন। অরোরা তার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা, বিশ্বের সামাজিক সমস্যা এবং চলচ্চিত্র, সঙ্গীত ও সাহিত্য থেকে অনুপ্রেরণা নিয়ে তৈরি করেছেন চিত্রকর্মগুলো। সবিশেষ শিল্পী আন্দি বাসকিতোর কথা বলা যায়। ব্রেক ফ্রি চিত্রকর্মে তিনি যেন কল্পনা ও বাস্তবতার মধ্যে সীমারেখা মুছে ফেলেছেন। তালাশ করেন পরাধীনতা ও স্বাধীনতার মধ্যে সাংঘর্ষিক সম্পর্ক। চিহ্নিত করেন স্বাধীনতার প্রতি আকাঙ্ক্ষাকে। বিকৃত আকার, মুখহীন চরিত্র এবং প্রায়ই কোনো প্যাটার্নের মাধ্যমে গ্রন্থিত থাকে।

ইন্দোনেশীয় শিল্পশৈলীতে পরাবাস্তবতার যাত্রায় আরো বহু নাম যুক্ত করা যায়। তাদের সম্মিলিত প্রয়াসে একীভূত হচ্ছে ঐতিহ্য ও নগরায়ণ, পরাধীনতা ও স্বাধীনতা, ঘর ও বিশ্ব, ব্যক্তি ও রাষ্ট্রের মধ্যকার বৈপরীত্য। প্রচলিত শিল্পসীমার বাইরে গিয়ে আবিষ্কার হচ্ছে নতুন মেরু।