ধাতু বরাবরই তার কঠোরতা ও স্থায়িত্বের জন্য পরিচিত। কিন্তু সে শক্ত ধাতব পাতে যখন শিল্পী সৃজনশীলতার চর্চা করে তখন তা হয়ে ওঠে জীবন্ত। লোহার গায়ে ফুটে ওঠে মানুষের মুখ, শরীর, পশু-পাখি কিংবা প্রকৃতির সঙ্গে সম্পর্কের কোমল ভাষা। ধাতুর এ কঠোরতাকে অনুভূতির সূক্ষ্মতায় রূপ দেয়ার দীর্ঘ সাধনাই ভাস্কর তৌফিকুর রহমানের শিল্পভুবন। ঢাকার কলা কেন্দ্রে আয়োজিত তৌফিকুর রহমানের একক প্রদর্শনী ‘রেখা, গড়ন, স্থিতি’-তে প্রবেশ করলে চারপাশে ছড়িয়ে থাকা ভারী, শক্ত এমএস শিট আর ওয়েল্ডিংয়ের নিখুঁত শ্রমে গড়ে ওঠা ভাস্কর্যগুলোকে কেবল কোনো শিল্পকর্ম নয়, বরং স্তব্ধতা ও জীবনবোধের মহাকাব্য অনুভূত হয়।
পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে ভাস্কর্য চর্চা করা এ শিল্পী নিজের কাজ নিয়ে কথা বলতে গিয়ে এক অদ্ভুত স্বতঃস্ফূর্ততার পরিচয় দেন। কাঠের খোদাই কিংবা শান্তিনিকেতনে ক্লে মডেলিংয়ের পাঠ পেরিয়ে তিনি শেষ পর্যন্ত বেছে নিয়েছেন ধাতব মাধ্যম—এমএস শিট ও আর্ক ওয়েল্ডিং। তবে প্রচলিত মসৃণ ভাস্কর্যের বদলে তিনি লোহার পোড়া, খসখসে, চটকে যাওয়া বা ভাঙাচোরা টেক্সচারকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। এ রুক্ষ টেক্সচার যেন আধুনিক মানুষের যাপিত জীবনের খণ্ডচিত্র বা অস্তিত্বের দাগগুলোকেই ফুটিয়ে তোলে। এ মেটাল বা লোহার সঙ্গে তার সম্পর্কটা আজকের নয়। তেজগাঁওয়ের শিল্পাঞ্চলে শৈশব কাটানোর দিনগুলোয় খেলার ছলে লোহা কুড়ানোর মধ্য দিয়েই ধাতুর সঙ্গে তার যে মেলবন্ধন ঘটেছিল, চারুকলার পাঠ শেষে তা-ই রূপ নেয় তার মূল শিল্পমাধ্যমে। শিল্পীর ভাষায়, ‘কাজ শুরুর আগে আমি কোনো লেআউট করি না। লেআউট করলে মনে হয় একটা জায়গায় আটকে গেলাম।’ কোনো সহকারী ছাড়াই সম্পূর্ণ একা নিজের এ সৃষ্টিশীল জগৎ গড়ে তোলেন তিনি।

প্রদর্শনী ঘুরে দেখলে শিল্পীর এ দীর্ঘ নীরব সাধনার সাক্ষ্য মেলে। প্রদর্শিত ভাস্কর্যগুলোর মধ্যে রয়েছে ‘মার্জড’ নামের জ্যামিতিক ও বিমূর্ত মুখাবয়ব, যা কোনাকুনি ঝালাইয়ের মাধ্যমে তৈরি। তার পাশেই রয়েছে ‘ডিস্ট্রাকশন’ বা মনোযোগ বিচ্যুতি শিরোনামের কাজটি, যাতে তীক্ষ্ণ ও ধারালো কোণ ব্যবহার করে শিল্পী মানসিক দ্বিধাকে দৃশ্যমান করেছেন। ‘মাতৃত্ব’ নামাঙ্কিত একটি ছাগলের ভাস্কর্যও রয়েছে। ছাগলের স্বভাবসুলভ চঞ্চলতা, সন্তানের সুরক্ষার জন্য মায়ের সহজাত দুশ্চিন্তা এবং জীবনের প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে টিকে থাকার নিরন্তর লড়াইয়ের রূপক হিসেবে উপস্থাপিত এ ভাস্কর্য এক অনন্য মাত্রার জন্ম দিয়েছে।
এছাড়া ‘ইটারনাল পোয়েট’ বা চিরন্তন কবি নামের রবীন্দ্রনাথের বিশাল ভাস্কর্যটি বিশেষভাবে নজর কাড়ে। বিশাল উচ্চতার ভাস্কর্যটিতে ওয়েল্ডেড স্টিলের ধারালো ও খসখসে টেক্সচারের মাধ্যমে তার দাড়ি-গোঁফের টেক্সচারে জটিল ওয়েল্ডিং কৌশল প্রয়োগ করে রবীন্দ্রনাথের ব্যক্তিত্বের গভীর চিন্তাশীল প্রতিকৃতি তৈরি করা হয়েছে। এ কাজের মাধ্যমে কবির চিরন্তন সত্তাকে তুলে ধরা হয়েছে এবং শিল্পীর নিজের শৈশব থেকে গড়ে ওঠা ভালোবাসারও বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে।
ভারী ও স্থির ফর্মের বিপরীতে তার ড্রইংগুলোয়ও স্থান পেয়েছে মানুষ, প্রাণী ও শরীরের খণ্ডাংশ। এ প্রসঙ্গে শিল্পী জানান, ভবিষ্যৎ কাজগুলোয় তিনি আরো বিমূর্ততার দিকে যেতে চান।

প্রদর্শনীটির নামকরণ সম্পর্কে শিল্পী বলেন, ‘রেখা দিয়ে আকার বা গড়ন ধরা হয়, আর স্থিতি হলো কাজের এক ধরনের স্থিরতা ও ভারসাম্য।’ কিউরেটর ওয়াকিলুর রহমান জানান, শিল্পীর ভাস্কর্যের মূল চরিত্র লুকিয়ে আছে এর স্থায়িত্ব, ভার ও গভীর ভাবগাম্ভীর্যের মধ্যে। গতিশীলতার বদলে এক জায়গায় বসে থেকেই নিজের অস্তিত্ব জানান দেয়। ভাস্কর্যের এ বৈশিষ্ট্য আর প্রদর্শনীতে জায়গা পাওয়া ড্রয়িংগুলোর সমন্বয়ে এ প্রদর্শনীর নামকরণ করা হয়েছে।
ধাতুর শক্ত ও নির্দিষ্ট সীমাকে শিল্পী দুর্বলতা নয়, বরং শক্তি হিসেবে ব্যবহার করেছেন। ধাতু কেটে তৈরি করা তীক্ষ্ণ কোণ ও জ্যামিতিক কাটিংয়ের ওপর আলো-ছায়ার ভিন্ন খেলা তৈরি করে কাজগুলোর রূপক ও এক্সপ্রেশনকে বহু গুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। মাধ্যমের সীমাবদ্ধতাকে জয় করে এ আলো-ছায়াই ভাস্কর্যগুলোয় এনে দিয়েছে এক ধরনের নীরব গাম্ভীর্য ও প্রাণবন্ততা।










