খ্যাতিমান চিত্রশিল্পী মনিরুল ইসলামের জন্ম ১৯৪৩ সালের ১৭ আগস্ট। তিনি ১৯৬০-এর দশকের অন্যতম প্রভাবশালী শিল্পী হিসেবে বিবেচিত। তার বিচরণ শুধু বাংলাদেশেই নয়, সমকালীন বিশ্বশিল্পেও গভীর পরিবর্তন সৃষ্টি করেছেন। চিত্রকর্মে বিশেষ অবদানের জন্য তিনি স্পেনের ‘অ্যাকসেসিত ন্যাশনাল অ্যাওয়ার্ড ১৯৯৩’, ‘ক্রস অব অফিসার অব দ্য অর্ডার অব কুইন ইসাবেলা ২০১০’ এবং দেশটির সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা ‘রয়্যাল মেরিট অ্যাওয়ার্ড ২০১৮’ অর্জন করেন। ১৯৯৯ সালে বাংলাদেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মাননা একুশে পদকেও ভূষিত হন। ষাটের দশকে তার শিল্পী হয়ে ওঠা, সমকালীন সমাজ বাস্তবতা, ইউরোপের তুলনায় বর্তমানে বাংলাদেশের আর্ট অঙ্গনসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয়ে কথা বলেছেন নভেরার সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন বাশার খান

আপনার জন্ম ও বেড়ে ওঠা...

আমার জন্ম বর্তমান জামালপুর জেলার ইসলামপুরে। তিন মাস বয়সে বাবা কিশোরগঞ্জে স্বাস্থ্য বিভাগে স্যানিটারি ইন্সপেক্টর হিসেবে বদলি হন। তখন দেশে কলেরা ও বসন্তে বহু মানুষ মারা যেত, বাংলা ছিল এ দুটি রোগের রাজধানী। কিশোরগঞ্জেই আমার দীর্ঘ ২২ বছরের শৈশব ও তরুণ বয়স কেটেছে। আমরা তিনজন শিল্পীর বাবা—সমরজিৎ বাবু (সমরজিৎ রায় চৌধুরী), শিল্পী হাশেম খান এবং আমার বাবা—স্বাস্থ্য বিভাগে একই চাকরি করতেন। শিক্ষাজীবন শুরু করি কিশোরগঞ্জ শহরের রামানন্দ হাইস্কুলে। তখনকার হেডমাস্টার ছিলেন জগদীশচন্দ্র রায়। তিনি খুবই মার্জিত, স্মার্ট ভদ্রলোক ছিলেন। সাদা ধুতি পরতেন। ম্যাট্রিক পাস করতে আমাকে তিনবার চেষ্টা করতে হয়েছে। পরে বাবার চাকরির কারণে পরিবার নিয়ে চাঁদপুরে চলে যাই। ১৯৬১ সালে চাঁদপুরের হাসান আলী হাইস্কুল থেকে ম্যাট্রিক পাস করি। সে বছরই ঢাকা আর্ট কলেজে ভর্তি হই। আমার সিনিয়র ছিলেন হাশেম খান, রফিকুন নবী প্রমুখ। রফিকুন নবী বয়সে ছোট হলেও একাডেমিকভাবে সিনিয়র ছিলেন, কারণ ম্যাট্রিক পাসে আমার দেরি হয়। কিন্তু আর্ট কলেজে এসে আর পেছনের ফিরে তাকাতে হয়নি, ফার্স্ট ইয়ার থেকে ফাইনাল পর্যন্ত প্রতিবারই প্রথম শ্রেণীতে প্রথম হয়েছিলাম।

8

ছবি আঁকা শুরু এবং এর পেছনে প্রেরণা হিসেবে কী কাজ করেছে?

স্কুলে হাতের কাজ, কাগজের ঝালর কাটা, উৎসবের সাজসজ্জা, সিনেমার ব্যানার ও পোস্টার আঁকতে গিয়েই শিল্পকলার প্রতি আগ্রহ জন্মায়। রবীন্দ্রনাথ ও নজরুলের ছবি কপি করে আঁকতাম। সাইনবোর্ড ও ব্যানার আঁকতে গিয়েই প্রথম রঙ, তেলরঙ, পেন্সিল ইত্যাদি হাতে আসে। তখনকার সিনেমা হলের ব্যানারগুলো ছিল অসাধারণ—আজকের ডিজিটাল যুগে সেগুলো আর নেই। এগুলো আর্ট পড়া লোকজন আঁকতেন না, সাধারণ স্থানীয় শিল্পীরা আঁকতেন। অসাধারণ কাজ হতো। পরে ক্যানভাস, অয়েল পেইন্ট, চারকোল, ইচিং ইত্যাদির মাধ্যমে নিজের ভাষা খুঁজতে থাকি। আমার কাছে শিল্প শুধু ছবি নয়, বরং এক ধরনের জীবনদর্শন। হাঁটা, কথা বলা, খাওয়া-দাওয়া, পোশাক—সবকিছুতেই শিল্পের ছোঁয়া থাকে।

ষাটের দশকে সমাজ ছিল অনেকটা রক্ষণশীল। তখনকার সমাজ বাস্তবতা আপনার ছবি আঁকার নেশা ও পেশাকে কীভাবে গ্রহণ করেছিল?

41

আমাদের পরিবারে কেউ শিল্পী ছিলেন না। ছবি আঁকা পাপ, জীবজন্তুর ছবি আঁকা নিষিদ্ধ—এসব শুনে ভয় পেতাম। কিন্তু হাতের কাজের আনন্দ আমাকে শিল্পের দিকে টেনে নিয়েছিল। আমার শৈশবে বাবার কড়া নিয়ন্ত্রণ ছিল। বাবা ছিলেন একরকম সূর্যের মতো—প্রখর, কঠোর। পড়াশোনা না করলে শাসন দিতেন, মারতেন। তখন মনে প্রশ্ন জাগত, তিনি কেন এমন করছেন। কিন্তু বড় হয়ে বুঝেছি, সেটা আমার ভালোর জন্যই ছিল। আমি তো চুরি করে ছবি আঁকতাম। তাতে বাবা ভয় পেতেন, ছেলের ভবিষ্যৎ নষ্ট হবে এই ভেবে। ম্যাট্রিক পাস করতে তিনবার ফেল করলাম। বাবা ভেবেছিলেন আমাকে হয়তো ইলেকট্রিশিয়ানের কাজে লাগাতে হবে—বাড়ি বাড়ি গিয়ে বিদ্যুতের কাজ করব। কিন্তু মায়ের কাছ থেকে ছাড় পেতাম, স্বাধীনতা পেতাম। মায়েরা আসলে এমনই। সবসময় সন্তানকে ছাড় দেন, আগলে রাখতে চান।

মানুষ তখন চিত্রশিল্পীর ভবিষ্যৎ নিয়েও সন্দিহান ছিল। এ কাজে চাকরি নেই, স্থায়ী জীবিকা নেই, সমাজের বাইরে একা হয়ে থাকা, মদ বা গাঁজায় ডুবে থাকা—সমাজে এমন এক ধরনের ইমেজ ছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে দৃশ্যপট বদলেছে। আজ প্রত্যেকটা বড় কোম্পানিতে শিল্পীর প্রয়োজনীয়তা তৈরি হয়েছে। জুতার কোম্পানি, গাড়ির কোম্পানি, ফার্নিচার, টেক্সটাইল—সব জায়গাতেই ডিজাইনার ও শিল্পীর কাজ আছে। এমনকি বিস্কুট কোম্পানিতেও শিল্পী লাগে। টেক্সটাইল ডিজাইন তো একেবারেই শিল্পীর ক্ষেত্র। এখন আর্ট হয়ে গেছে জীবনের প্রতিটি জায়গার অংশ।

আমার এক লাতিন আমেরিকান বন্ধু বলেছিল, ‘আর্টিস্ট মানে হলো এ লাইফ ইউ নিড।’ মানে জীবনের প্রতিটি কাজে শিল্প আছে—খাওয়া, পরা, হাঁটা, কথা বলা, সাজসজ্জায়। চেয়ার সরিয়ে ভেতরে রাখা, গ্লাস ব্যবহার শেষে পরিষ্কার করা, যেখানে-সেখানে থুতু না ফেলা—এসব ছোট ছোট কাজেও সৌন্দর্যবোধ ও শৃঙ্খলা দরকার। এটাই আর্ট। যদিও আমাদের সমাজে এ চর্চা এখনো পুরোপুরি তৈরি হয়নি। ইউরোপ-আমেরিকায় আছে।

অনেক সময় আমরা দেখি, বড় শিল্পীরা কোনো আর্ট কলেজে পড়েননি। কবিতা, গান, নাচ, ছবি আঁকা—এসবের মৌলিক প্রতিভা শেখানো যায় না। টেকনিক শেখানো যায়, কিন্তু মৌলিক শক্তি জন্মগত। যেমন কাজী নজরুল ইসলাম—তিনি কোনো প্রথাগতভাবে তেমন লেখাপড়া করেননি, কিন্তু তার কবিতার মধ্যে ফারসি, আরবি, বাংলা শব্দ মিশে এক অনন্য ধারা তৈরি করেছে। এটা হলো আল্লাহপ্রদত্ত প্রতিভা। তবে শুধু গড-গিফটেড প্রতিভা থাকলেই হয় না, তার চর্চাও করতে হয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে যোগদানের স্মৃতি...

১৯৬৬ সালে আমি আর্ট কলেজে শিক্ষক হিসেবে যোগ দিই। জয়নুল আবেদিন স্যার আমার কাজ দেখে উৎসাহ দেন। পাস করার পর বললেন, মিয়া কী করবা? উনি এভাবেই কথা বলতেন। আমি বললাম, ছবি আঁকব স্যার। স্যার বললেন, ছবি আঁকতে চাইলে এখানেই থাকো। এরপর একদিন ক্লাসে নিয়ে গিয়ে বললেন, আজকে থেকে উনি তোমাদের পড়াবেন। তার অনুপ্রেরণাতেই শিক্ষকতার পেশায় আসি। আমার বেতন ছিল মাত্র ২০০ টাকা। তখন ফ্যামিলি প্ল্যানিং ও টেলিভিশনে আর্টিস্ট পদে লোক নিয়োগ করছিল মাসে ৬০০ টাকা বেতনে। আমি ২০০ টাকা বেতনের শিক্ষকতায় যোগ দেই।

স্পেনের গল্পটা জানতে চাই...

বিদেশযাত্রার ঘটনাটাও নাটকীয়। ১৯৬৯ সালে স্পেনে কালচারাল ইন্টারচেঞ্জ স্কলারশিপ পেয়ে যাই। অর্থাৎ স্পেন থেকে একজন শিল্পী পাকিস্তান আসে, আর আমি যাই স্পেনে। তখন এ ধরনের স্কলারশিপ পাওয়া ছিল কঠিন ব্যাপার। হঠাৎ একদিন টেলিগ্রাম এল—আমাকে অবিলম্বে যাত্রা করতে হবে। তখনকার গভর্নরের সেক্রেটারি নুরুল ইসলাম আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন, তার সহায়তায় টিকিটের ব্যবস্থা হয়। যাত্রার মুহূর্তে বুঝতে পেরেছিলাম—১ সেকেন্ড বা ২ সেকেন্ডের সিদ্ধান্ত একজন মানুষের পুরো জীবন ১৮০ ডিগ্রি বদলে দিতে পারে।

ন’মাসের জন্য স্পেনে গিয়েছিলাম, কিন্তু সেখানে থাকতেই মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলো। তখন আমি বাংলাদেশের পক্ষ নিয়ে ছবি আঁকি ও প্রদর্শনীর আয়োজন করি। আমার ছবিগুলো ছিল সাদা-কালো, যুদ্ধের বীভৎস দৃশ্যকেন্দ্রিক। স্প্যানিশ শিল্পী ফ্রান্সিসকো গয়ার যুদ্ধচিত্র আমাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল। প্রবাসী বাঙালি ও আন্তর্জাতিক মহল তখন মুক্তিযুদ্ধের পাশে দাঁড়িয়েছিল। কনসার্ট ফর বাংলাদেশ-এর মতো আয়োজন আমাদের কণ্ঠস্বর হয়ে উঠেছিল। আমার একটি নৈতিক দায়বদ্ধতা ছিল যে, আমি সে সময় দেশে ছিলাম না। বিভিন্ন পত্রপত্রিকা থেকে বাংলাদেশের খবর রাখি।

শিল্পের ভাষা ও মাধ্যম নিয়ে আপনার চিন্তা বা মন্তব্য...

11

আমার কাছে শিল্পের ভাষা হলো নির্বাক ভাষা, যা সরাসরি চোখ ও অনুভূতিকে নাড়া দেয়। ছবির সমাপ্তি বলে কিছু নেই; একটি ছবি সবসময় চলমান থাকে। শিল্পকে আমি দেখি মানবিক চেতনা, নন্দনচর্চা এবং ভবিষ্যতের কল্পনা হিসেবে।

আমি সাধারণভাবে বলি, শিল্পীর কাজ সাধারণ মানুষকে বোঝানোর জন্য নয়। এটি শিল্পীর ব্যক্তিগত অভিব্যক্তি। প্রতিটি শিল্পীর ভেতরে একটি অদৃশ্য জগৎ থাকে, যা আল্লাহ দিয়েছেন। এ জগতের সঙ্গে শিল্পীর প্রত্যাশা, আনন্দ, হতাশা এবং অবসেশন জড়িত। একজন শিল্পী তার অনুভূতি নিজের ভাষায় প্রকাশ করে। এটি ক্যানভাসে হোক বা সিরামিক মাটিতে, শিল্পী নিজস্ব মিডিয়ায় নিজের সৃষ্টিশীলতা প্রকাশ করে।

শিল্পীর কাজের ক্ষেত্রে মিডিয়া গুরুত্বপূর্ণ। সিরামিকস এখনো সবচেয়ে পিওর মিডিয়া, কারণ এটি মাটি, বাতাস, আগুনের মিশ্রণ। অন্যান্য মিডিয়া যেমন পেইন্টিং, গ্রাফিক্স বা মিক্স মিডিয়া নানা পদ্ধতিতে কাজ হয়। বাংলাদেশী ছবি উজ্জ্বল ও বৈচিত্র্যময় রঙের জন্য পরিচিত। আমাদের প্রকৃতি, ঋতু এবং খাদ্যাভ্যাস শিল্পীকে রঙের ব্যবহার শেখায়। বাংলা ঋতুবৈচিত্র্যের দেশ। প্রকৃতির রঙ একেক সময় একেক রকম হয়। অন্যদিকে, ইউরোপে বেশির ভাগ শীত, বরফে ঢাকা থাকে। রঙ বলতে ওই সাদা বা ধূসর। এ কারণে ওখানকার আর্টে রঙের ব্যবহার কম।

ইউরোপে শিল্পের বাজার বহু বছর ধরে গড়ে উঠেছে। সেখানে বড় বড় নিলাম, গ্যালারি এবং চিত্রকর্ম সংগ্রহকারীরা সক্রিয়। শিল্পী ও তাদের কাজের মূল্যায়ন ধারাও স্থিতিশীল। কিন্তু বাংলাদেশে শিল্পের বাজার সেভাবে গড়ে ওঠেনি। এর কারণ কী?

এক সময় আর্টকে রক্ষা করতেন রাজারা। রাজ-রাজাদের পেইন্টাররা বিভিন্ন প্রাসাদের ছবি আঁকতেন। আর্ট মূলত বুর্জোয়াদের সৃষ্টি। আর্ট এখন প্রডাক্ট হিসেবে বড় কোম্পানি বা ধনী কালেক্টরের হাতে আসছে। বাংলাদেশে শিল্পকর্ম কিনে থাকেন ব্যবসায়ী বা যারা আন্তর্জাতিক ট্রেন্ড দেখেন। তারা বিদেশে মিউজিয়াম দেখেন, সেগুলো দেখে দেশের কাজ সংগ্রহ করেন। এটি ধীরে ধীরে ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে। দেশটা কতটুকু ধনী, চিত্রকর্মের বাজারের ক্ষেত্রে এটি গুরুত্বপূর্ণ। কেননা আর্ট ক্যান নট সারভাইভ উইদাউট মানি। ইউরোপের সঙ্গে এখানকার তুলনা করলে চলবে না। এখানে আর্ট পড়ানোর যে সিলেবাস, সেটা ইউরোপের অনুসরণে করা। সুতরাং পার্থক্য তো আছেই। আমাদেরকে আরো অপেক্ষা করতে হবে।

তবে বাংলাদেশের আর্ট মার্কেট বর্তমানে খুবই আশাব্যঞ্জক অবস্থায় আছে। আমাদের শিল্পীরা বিভিন্ন আন্তর্জাতিক আর্ট ফেয়ার, প্রদর্শনী ও ইভেন্টে অংশগ্রহণ করছেন, যা আমাদের শিল্পী সমাজের জন্য এক বড় অর্জন। এখন আর্টিস্টরা ভালো জব করছেন। আর্টিস্টদের কারো কারো দু-তিনটা ফ্ল্যাট আছে। আমাদের সময়ে এ সুযোগগুলো ছিল না। তখন কোনো গ্যালারি ছিল না। আর্ট ম্যাগাজিন পর্যন্ত ছিল না। কিন্তু আজকে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। এখন দেশে বেশকিছু বড় গ্যালারি আছে। শুধু ঢাকার লালমাটিয়াতেই আটটি গ্যালারি হয়েছে। এগুলো আশার খবর। বাংলাদেশের অর্থনীতি গত ৫৪ বছরে অনেক উন্নতি করেছে। আগে মানুষ ছবি কিনত না, কিন্তু এখন ক্রমে ছবি কেনার প্রবণতা বেড়েছে।

বাংলাদেশের কোনো শিল্পীর সঙ্গে আপনার কোনো অপ্রত্যাশিত আচরণ বা কারো কাছ থেকে কষ্ট পাওয়ার কোনো স্মৃতি আছে কি?

সে রকম কোনো স্মৃতি নেই। আমি সবসময় আমার পথ, আমার ভিশন অনুসরণ করি। সব জায়গায় মানুষের প্রতিহিংসা বা সমালোচনা থাকবে। এটা পৃথিবীর সব জায়গায় হয়। সাধারণত এটা হয় হতাশা থেকে। যখন কেউ নিজের কাজ করতে পারে না, তখন অন্যকে ছোট করার চেষ্টা করে। আমার পরামর্শ হলো এগুলোকে কেয়ার না করা। আপনি নিজের কাজ না করে অন্যের বিষয়ে বেশি মনোযোগ দিচ্ছেন, এটাই ফ্রাস্ট্রেশন। ধরুন, কারো ছবি ২০ লাখ টাকায় বিক্রি হলো, আর আপনার ছবি বিক্রি হলো না—এটা স্বাভাবিকভাবেই ক্ষোভ বা কষ্ট দেবে। কিন্তু এসব সব দেশে সবসময় থাকবে।

আপনার সমসাময়িক শিল্পী কারা?

আমার সমসাময়িক শিল্পীরা হলেন রফিকুন নবী, হাশেম খান, শাহাবুদ্দিন ও ওয়াকিল ইউনুস জুনিয়র। তারা সক্রিয় এবং ভালো কাজ করছেন। শিল্পী শাহাবুদ্দিন আমার ছাত্র। সে প্যারেসি আছে।

আমরা জানি, শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের সঙ্গে আপনার অন্তরঙ্গ সম্পর্ক ছিল...

এটা আমার জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ ছিল। তার প্রকৃত চরিত্র এবং জ্ঞান আমাকে অনেক কিছু শিখিয়েছে। তিনি নিজের অভিজ্ঞতা থেকে পরামর্শ দিতেন। তার সঙ্গে আমি চাঁদপুর ও খুলনায় ছবি এঁকেছি। তখন তার ছবির দাম ছিল ৫-১০ হাজার টাকা, সমকালে এটি ছিল বিপুল অংক।

বর্তমানে কী নিয়ে কাজ করছেন?

বর্তমানে আমি বিভিন্ন ধরনের কাজ করছি। বেশি কাজ অভ্যাসের বাইরের। জীবন অভিজ্ঞতা এবং শিল্পচর্চার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রেখে কাজ করে যাচ্ছি। শিল্পীর কাজের জন্য কোনো লাক্সারি জীবন প্রয়োজন হয় না। আমি চেষ্টা করি প্রতিটি কাজের মাধ্যমে নৈতিক ও সৃষ্টিশীল দিক বজায় রাখতে।

ছবি আঁকাকে যারা পেশা হিসেবে নিতে চান, সেই তরুণদের উদ্দেশে আপনার বক্তব্য বা পরামর্শ কী?

প্রথমত, কথাই হলো সততা ও নৈতিকতা নিয়ে কাজ করতে হবে। এটাকে অনেস্ট আর্ট বলে। দ্বিতীয়ত, আর্টে অবসেশন (আসক্তি), অ্যামবিশন, ড্রিম—এগুলো আছে। সেটাকে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। এর মধ্যে পাওয়ার, ফেইম ও মানি সবই আছে। পাওয়ার, মানি, ফেইম ক্যান ডেস্ট্রয় ইউ। সুতরাং এগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।

শিল্পী বাজার বা খ্যাতির জন্য নয়, নিজস্ব সৃষ্টিশীলতা বজায় রেখে কাজ করুন। বিখ্যাত হওয়া এবং অর্থের জন্য নয়, নিজের ক্রিয়েটিভিটি এবং আবেগের জন্য কাজ করুন। আর্টিস্টকে জানতে হবে রাজনীতি, অর্থনীতি এবং দেশের আশপাশে কী ঘটছে—সব। স্টুডিওতে শুধু থাকলে হবে না। আর্ট বা ছবি এখন ইমোশন থেকে ইন্টেলিজেন্সের দিকে চলে গেছে। আগে ইমোশন কাজে লাগাও, তারপর ইন্টেলিজেন্স। ঠিক যেমন তুমি ধান বোনো, ধানই পাবে—সেখানে কলা পাওয়ার আশা করলে হবে না।