রাফায়েল রুমের পর আমাদের গন্তব্য ভ্যাটিকানের সিসটিন চ্যাপেল। এ পর্যায়ে বিদায় নেবেন গাইড। আমরা যে যার মতো সময় কাটাব। ট্যুর শুরুর আগে বাইরে রাখা মনিটরে মাইকেলেঞ্জেলোর ‘দ্য লাস্ট জাজমেন্ট’ (শেষ বিচার) দেখিয়ে গাইড আমাদের খুঁটিনাটি সম্পর্কে জানিয়েছেন। কাজটি নিয়ে ওই সময়ই বেশ বিতর্ক শুরু হয়। ইতালির লেখক পিয়েত্রো আরেতিনো ভেনিস থেকে শিল্পীকে চিঠি লিখে সমালোচনা পর্যন্ত করেন। পিয়েত্রো বলেছিলেন, ‘মানছি যে আমি আমার লেখায় লাস্যময় জিনিসপত্র আনি, কিন্তু তা শালীন ভাষায়। আর তুমি, স্পর্শকাতর ধর্মীয় বিষয়কে অশালীনভাবে উপস্থাপন করেছ, যেখানে দেবদূত ও সাধুরা নগ্ন—তাদের সাধারণ মানুষের মতো দেখা যাচ্ছে।’
এমনকি পোপের চেম্বারলেইন (যিনি পোপের ব্যক্তিগত, প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক বিষয়গুলো দেখেন এবং পোপের অবর্তমানে দায়িত্ব পালন করেন) বিয়াজিও দা চেজেনাও প্রকাশ্যে বলেছিলেন, ‘এত বেশি নগ্নতা এভাবে প্রকাশ করাটা অমার্জনীয়, তাও আবার এ রকম একটি পবিত্র জায়গায়, যা একদমই উপযুক্ত নয়। এগুলো সিসটিন চ্যাপেলের জন্য নয়, বরং কোনো স্নানাগার বা বাজে কারবার হয়—এমন বাড়ির জন্য মানানসই।’
মাইকেলেঞ্জেলো মুখে কিছু না বললেও বিয়াজিওর ওপর মধুর প্রতিশোধ নেন। শেষ বিচার ম্যুরালের নিচের ডান কোণে আমরা বিয়াজিওকে দেখতে পাই নরকের মিনোস রূপে। প্রাচীন গ্রিক পুরাণে মিনোস ছিলেন ক্রিট দ্বীপের রাজা। মৃত্যুর পর হন পাতালপুরীর বিচারক। মিনোসের শরীর পেঁচিয়ে রাখা সাপটি তার লজ্জাস্থান এমনভাবে কামড়ে ধরে আছে যে নরকযন্ত্রণা ফুটে আছে তার চোখেমুখে। এখানেই শেষ নয়। মাথার দুপাশে গাধার মতো দুটো লম্বা কান বসিয়ে তুলে ধরেছেন মিনোসরূপী বিয়াজিওর নির্বুদ্ধিতাকেও।
কেবল বিয়াজিও কিংবা পিয়েত্রো নয়, ভ্যাটিকানের অন্য উচ্চপদস্থ ব্যক্তি আর বুদ্ধিজীবীদের কাছ থেকেও আসতে থাকে অভিযোগ। এক পর্যায়ে মাইকেলেঞ্জেলোকে বলা হয় কিছু শরীরকে পোশাক দিয়ে ঢেকে দেয়ার জন্য। নাছোড়বান্দা শিল্পী তাতে রাজি হননি। এমনকি তার জীবদ্দশায় কেউ তার ম্যুরালগুলোয় হাত দিতে পারেনি। মাইকেলেঞ্জেলোর মৃত্যুর পর, তার বন্ধু দানিয়েল দা ভোলতেররাকে পোপ পঞ্চম পল নির্দেশ দেন দ্য লাস্ট জাজমেন্টের কিছু শরীরকে পোশাক দিয়ে ঢেকে দেয়ার জন্য।
পুরো নাম মাইকেলেঞ্জেলো দি লোডোভিকো বুয়োনাররোতি সিমোনি, পরিচিত ছিলেন মূলত একজন ভাস্কর হিসেবে। পোপ দ্বিতীয় জুলিয়াস তাকে যখন সিসটিন চ্যাপেলের ছবি আঁকার দায়িত্ব দেন, ততদিনে মাইকেলেঞ্জেলো নামেই তার খ্যাতি ছড়িয়ে পড়েছে। মাত্র ২৪ বছর বয়সে ‘পিয়েতা’ আর দুই বছরের ব্যবধানে ‘ডেভিড’-এর মতো মাস্টারপিস দিয়ে সমকালীন শিল্পীদের চক্ষুশূল হয়ে উঠেছেন। তবে হাতুড়ি-বাটালি হাতে মাইকেলেঞ্জেলোর পারদর্শিতা প্রশ্নাতীত হলেও রঙতুলি হাতে তিনি কতটা সফল হবেন এ নিয়ে শত্রু আর সমালোচকরা খানিকটা দ্বিধায় ছিলেন। যদিও আজ সিসটিন চ্যাপেলের ফ্রেস্কোগুলোর জন্যই তিনি বেশি স্মরণীয়। কেননা তার চিত্রকর্মের উজ্জ্বল রঙ, আকর্ষণীয় বিন্যাস খ্রিস্টের পুনরুত্থান আর মানবতার শেষ বিচারকে চিত্রিত করে ধর্মীয় ও দার্শনিক প্রশ্ন উত্থাপন করে।

মাইকেলেঞ্জেলোর আঁকা সিসটিন চ্যাপেলের ছাদ ছবি: ভ্যাটিকান মিউজিয়াম আর্কাইভ / সিসটিন চ্যাপেল ছবি: ভ্যাটিকান মিউজিয়াম আর্কাইভ
আমাদের দলের একাংশ গেল ভ্যাটিকান জাদুঘরের অন্য কক্ষগুলো দেখতে। বাকিরা ঢুকে পড়লেন সিসটিন চ্যাপেলে। পোপ সিক্সটাস চতুর্থ ডেলা রোভারের নাম থেকে নামকরণ সিসটিন চ্যাপেলের। পনের শতকে প্রাথমিকভাবে পিটারো পেরুগিনো, সান্দ্রো বোতিচেল্লি, ডোমেনিকো গিরল্যান্ডাইও ও কোসিমো রোসেল্লির মতো চিত্রশিল্পীদের একটি দল মিলে এখানে খ্রিস্টের কাহিনী ও পোপদের প্রতিকৃতি আঁকতে শুরু করেন, যা ১৪৮১ সালের কথা। এরপর পোপ দ্বিতীয় জুলিয়াস চ্যাপেলের সাজসজ্জায় পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নেন। দায়িত্ব দেন মাইকেলেঞ্জেলোকে, যিনি ছাদ ও দেয়ালের ওপরের লুনেটগুলো (অর্ধবৃত্তাকার বা চাঁদ আকৃতির অংশ) আঁকেন। মাইকেলেঞ্জেলোর ম্যুরালের মধ্যে নয়টির মূল প্যানেল জেনেসিসের কাহিনী তুলে ধরেছে। সৃষ্টির মুহূর্ত থেকে শুরু করে মানবজাতির সূচনা। গোটা সিসটিন চ্যাপেলকে পাঁচ ভাগে ভাগ করলে হয় ছাদ, শেষ বিচার, উত্তর দেয়াল, দক্ষিণ দেয়াল ও প্রবেশদ্বার।
ভেতরে খানিকটা শোরগোল। শত শত দর্শনার্থীর ভিড়ে মিশে চার দেয়ালের চিত্রকর্ম দেখতে দেখতে হঠাৎ কর্তৃপক্ষের ঘোষণা কানে এল, কোলাহল না করার অনুরোধ। কয়েক সেকেন্ডের নীরবতা। খানিক বাদে আবারো মৃদু গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ল। ১৫০৩ সালে যখন নতুন পোপ হয়ে আসেন দ্বিতীয় জুলিয়াস, নিজেকে যুদ্ধ-শক্তি আর শিল্পের গুণগ্রাহী হিসেবে ঘোষণা দেন। ১৫০৫ সালে তিনি রোমে ডেকে পাঠান মাইকেলেঞ্জেলোকে। উদ্দেশ্য নিজের ভবিষ্যৎ সমাধির শিল্পশৈলী বর্ধন। পোপ জুলিয়াসের প্রধান স্থপতি দোনাতো ব্রামান্তে। বিষয়টিকে তিনি মোটেও ভালোভাবে নিলেন না। মাইকেলেঞ্জেলো লিখেছেন, ‘পোপ জুলিয়াস ও আমার মধ্যে যত বিরোধ তৈরি হয়েছে, সে সবের মূল কারণ ব্রামান্তে ও রাফায়েল।’
মাইকেলেঞ্জেলোর প্রথম জীবনীকার আসকানিও কন্দিভি অবশ্য ভিন্ন মত পোষণ করেন। তার মতে, সিসটিন চ্যাপেলের ছাদ আঁকার জন্য ব্রামান্তে নিজেই মাইকেলেঞ্জেলোর নাম প্রস্তাব করেন। তবে সরল মনে নয়, দুরভিসন্ধি আর শত্রুতা থেকে। ব্রামান্তে ভেবেছিলেন, ভাস্কর মাইকেলেঞ্জেলো পেইন্টিংয়ে হাঁপিয়ে উঠবেন। ব্যর্থ হবেন। ক্যারিয়ার শেষ হয়ে যাবে। ১৬ শতকের স্থপতি, শিল্পী ও লেখক জর্জিও ভাসারি তার বিখ্যাত বই ‘লাইভস অব দ্য মোস্ট এক্সিলেন্ট পেইন্টার্স, স্কাল্পচার্স অ্যান্ড আর্কিটেক্টস’-এ একই কথা লিখে গেছেন। শোনা যায়, তিনি নিজের পেইন্টিং পারদর্শিতা নিয়ে খানিকটা সন্দিহান ছিলেন। যদিও ইতিহাস অবশ্য ভিন্ন পরিকল্পনা করে রেখেছিল তাকে ঘিরে।
পোপের সমাধি নির্মাণের সময় অর্থকড়ি পরিশোধ নিয়ে তীব্র বিবাদের পর মাইকেলেঞ্জেলো রোম ছেড়ে চলে যান। পোপ জুলিয়াস ভুল বুঝতে পেরে তাকে আবার রোমে ফিরে আসতে বলেন এবং সিসটিন চ্যাপেলের ছাদে ফ্রেস্কো আঁকার প্রস্তাব দেন। ১৫০৮ সালে যখন তিনি রোমে ফিরে আসেন, ব্রামান্তে তখন সেন্ট পিটারস বাসিলিকার নতুন নির্মাণকাজ নিয়ে ব্যস্ত। আরেক প্রতিদ্বন্দ্বী রাফায়েল শুরু করেছিলেন পোপের ব্যক্তিগত কক্ষে ফ্রেস্কো আঁকার কাজ।
প্রায় ১৩২ ফুট লম্বা ও ৪৪ ফুট প্রস্থের পুরো ছাদে ম্যুরাল আঁকতে বলা হলো মাইকেলেঞ্জেলোকে। কাজের বিশালতা দ্বিধায় ফেলে দেবে ঝানু চিত্রকরদেরও। সেখানে ভাস্কর্যে পারদর্শী মাইকেলেঞ্জেলো কীভাবে নিজের মনোবল অটুট রেখেছিলেন! শুধু তা-ই নয়, তিনি কারো কথা কানেই তোলেননি। গির্জা থেকে বিভিন্ন সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিতে চাইলেও তিনি কী পরিমাণ অনড় ছিলেন তা লেখা আছে ভাসারির বইয়ে। মাইকেলেঞ্জেলোর দাবি ছিল শিল্পী হিসেবে কাজের ক্ষেত্রে তাকে পুরোপুরি স্বাধীনতা দিতে হবে, কোনো হস্তক্ষেপ তিনি সহ্য করবেন না। করেছিলেনও তাই। নিজের পূর্ণাঙ্গ স্বাধীনতা দিয়েই সাজিয়েছিলেন সিসটিন চ্যাপেল।
তবে কাজের শুরুতে বড় ধরনের প্রযুক্তিগত সমস্যায় পড়তে হয় তাকে। ভাসারি তার বইয়ে মাইকেলেঞ্জেলোর কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষার কথা উল্লেখ করেছেন। তিনি যে ফ্রেস্কো প্রযুক্তি ব্যবহার করেছিলেন, তা হলো ভেজা মাটি মাখানো প্লাস্টারে রঙ লাগানোর প্রক্রিয়া, যেখানে ভুল করে তা সংশোধনের কোনো সুযোগ নেই। সময়—যেখানে অনেক গুরুত্বপূর্ণ। একবার শুরু করলে নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই কাজ শেষ করতে হবে। আবার একবারে যদি বেশি কাজ করতে যেতেন, তখন প্লাস্টার শুকিয়ে যেত। রঙগুলোও আর বসত না।
মাইকেলেঞ্জেলো তার নিজ শহর ফ্লোরেন্স থেকে বিশ্বস্ত শিল্পীদের নিয়ে আসেন তার সঙ্গে কাজ করার জন্য। কিন্তু রোমের আবহাওয়ায় তারা খুব একটা সুবিধা করতে পারেননি। ছাঁচের ওপর দাগ পড়তে শুরু করলে রঙগুলো মুছে ফেলে পুনরায় লাগাতে হয়েছিল, যা তাদের কাজের গতিকে কমিয়ে দিয়েছিল।
এদিকে মাইকেলেঞ্জেলোর ম্যুরাল কবে শেষ হবে, তা নিয়ে অস্থির হয়ে উঠেছিলেন পোপ জুলিয়াস। শিল্পীর জীবনীকার আসকানিও কন্দিভির তথ্যানুযায়ী, রেগেমেগে পোপ তাকে ওপর থেকে ছুড়ে ফেলারও হুমকি দেন। একবার নাকি সত্যিই একটি লাঠি দিয়ে আঘাত পর্যন্ত করেছিলেন। ১৫১২ সালে চার বছরের শারীরিক ও সৃষ্টিশীল পরিশ্রম শেষে মাইকেলেঞ্জেলো তার ঐতিহাসিক কাজ শেষ করেন। ম্যুরালের মনোমুগ্ধকর ব্রাশস্ট্রোকগুলো তার সমালোচকদের চুপ করিয়ে দিয়ে রেনেসাঁর চূড়ান্ত স্বীকৃত শিল্পে পরিণত হয়। মানবদেহের প্রতি ভালোবাসা, সম্পদ ও ধর্মের মধ্যে টানাপড়েন, সর্বোপরি বাইবেলের গল্পগুলোর জীবন্ত ও আবেগপূর্ণ উপস্থাপনা দিয়ে মাইকেলেঞ্জেলো নিজেকে মায়েস্ত্রদের গুরু হিসেবে প্রমাণ করেন।










