বাংলাদেশের আধুনিক চিত্রকর্মে কলসি কেবল পানি রাখার একটি মাটির পাত্রই নয়, বরং এটি রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতার প্রতিচিত্র। নারী ও পানির বিষয়ভিত্তিক উপস্থাপনায় কলসির বৈচিত্র্যময় ভূমিকা এদেশের জাতি গঠনের বিষয়ে নানা ইঙ্গিত রেখে গেছে। বস্তুর মধ্যে মূর্ত স্থানের পরিচয় ও মৃৎ শিল্পের ছোঁয়া কাদাকে সংস্কৃতিতে পরিণত করে। কলসির গড়ন এমনভাবে প্রস্তুত করা যেন নারী তা তার কাঁখে রাখতে পারেন। কৃষি ঐতিহ্যের লৈঙ্গিক প্রতীক হিসেবেও কলসির গুরুত্ব আছে। এ আইকন বাংলাদেশী আধুনিক শিল্পের জন্য সংগ্রামকে প্রভাবিত করেছে। বাংলাদেশের শিল্পে লোকজ ঐতিহ্য ও আধুনিক বিমূর্ততার মধ্যে শৈল্পিক সমন্বয়ের উদাহরণ এ কলসি।

সত্তর দশক থেকে শুরু করে আজ অবধি বহু প্রখ্যাত বাংলাদেশী চিত্রশিল্পী তাদের রঙতুলিতে কলসির চিত্রায়ণ করেছেন। জয়নুল আবেদিন, কামরুল হাসান ও এসএম সুলতান তাদের চিত্রকর্মে কলসিকে গুরুত্ব সহকারে তুলে ধরেছেন। এর পরে হামিদুর রহমান ও আবদুল বাসেত কলসির আক্ষরিক উপস্থাপনা থেকে সরে এসেছেন। নাসরিন বেগম ও কাইয়ুম চৌধুরী নারী এবং পানির উপস্থাপনাকে আরো বিমূর্ত ও সর্বজনীন রূপ প্রদান করেছেন।

জয়নুল আবেদিন

বাংলাদেশী আধুনিক চিত্রশিল্পে কলসির উপস্থিতির সূচনা ঘটে শিল্পী জয়নুল আবেদিনের হাত ধরে। ১৯৭৩ সালে আঁকা তার এক চিত্রকর্মে বাঁপাশে কলসি হাতে কয়েকজন নারী এবং ডানপাশে স্নানরত নারীদের দৃশ্য দেখা যায়। এ চিত্রায়ণ ক্যানভাসের ভারসাম্য বজায় রাখে। দুটি গোষ্ঠীর সমান্তরাল উপস্থাপনা প্রবহমানতা ও বৈপরীত্যের জটিল চিত্র সৃষ্টি করেছে। তবে এখানে নারীরা স্বতন্ত্র সত্তা হিসেবে উপস্থাপিত হননি; বরং তাদের শ্রম ও সংবেদনশীলতার প্রতীকে রূপান্তর করা হয়েছে। ফলে নারীকে কেন্দ্র করে সংবেদনশীল ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের দ্বন্দ্ব উঠে আসে। চিত্রকর্মটি আধুনিক বাংলাদেশী শিল্পের সৃষ্টিশীল টানাপড়েনের প্রতিফলন, যেখানে ঐতিহ্যবাহী বিষয়বস্তু আধুনিক রূপের সঙ্গে মিশে যায়।

5

শিল্পী হিসেবে জয়নুল আবেদিনের সংগ্রাম ছিল লোকজ ঐতিহ্যের প্রতি শ্রদ্ধা বজায় রেখে আধুনিকতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখা। ১৯৭০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে তিনি জাতীয় সাংস্কৃতিক পরিবর্তনের মধ্যে ঐতিহ্য সংরক্ষণে মনোযোগী হন। তার শিল্পকর্মে স্থানীয় পরিচয়ের সঙ্গে বিশ্বজনীন আধুনিকতার সংমিশ্রণ স্পষ্ট, যেখানে লোকজ শিল্পের সংরক্ষণ ও আধুনিক শিল্পচর্চার বিকাশ একসঙ্গে ফুটে ওঠে।

কামরুল হাসান

বাংলাদেশে আধুনিক চিত্রশিল্পের প্রবর্তক হিসেবে কামরুল হাসানের স্থান অবিস্মরণীয়। ১৯৭৪ সালে তার আঁকা এক চিত্রকর্মে গাঢ় রঙ ও বলিষ্ঠ রেখার মাধ্যমে এক নারীকে কলসিতে পানি ভরতে দেখা যায়। এখানে কলসি দৃশ্যের কেন্দ্রে থাকা নারীর সঙ্গে পানির সম্পর্ককে ফুটিয়ে তোলে। চিত্রকর্মটি তার ইম্প্রেশনিজম থেকে রাজনৈতিক ও আধুনিক শিল্পধারার দিকে পরিবর্তনের প্রতিফলন হিসেবে বিবেচিত হয়।

6

১৯৮৩ সালে আঁকা ‘‌তিন কন্যা’ চিত্রকর্মে পানি অনুপস্থিত, আর কলসি হয়ে ওঠে ঐতিহ্যের একটি দৃঢ় প্রতীক। উজ্জ্বল রঙ ও নারীর হাতে থাকা কলসি সাংস্কৃতিক গুরুত্বকে তুলে ধরে। এ চিত্রকর্মে কামরুল হাসানের দক্ষতা স্পষ্ট, যেখানে তিনি আধুনিক শিল্পরীতি ও লোকজ বিষয়বস্তুকে নিপুণভাবে একত্রিত করেছেন।

এসএম সুলতান

এসএম সুলতান ১৯২৩ সালে জন্মগ্রহণ করেন। কলকাতা আর্ট স্কুলে পড়াশোনা শেষ করার পর তিনি ভারতীয় উপমহাদেশজুড়ে ভ্রমণ করেন এবং যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের গ্যালারিগুলোও পরিদর্শন করেন। তবে শেষ পর্যন্ত ১৯৫৩ সালে তিনি নিজ জন্মস্থান নড়াইলে ফিরে আসেন এবং সেখানে প্রায় নিঃসঙ্গ জীবনযাপন শুরু করেন। তার শিল্পচর্চায় বিশ্বভাবনা ও স্থানীয় ঐতিহ্যের প্রতি আনুগত্য—দুটি সমানভাবে প্রতিফলিত হয়।

8

১৯৯১ সালে তার আঁকা ‘মাছ ধরা’ শিরোনামের চিত্রকর্মটি শ্রমের ঐক্যকে উদযাপন করে। এ চিত্রকর্মে নারী ও পানি একীভূত হয়ে একটি সাম্যবাদী কল্পলোকের দৃশ্য সৃষ্টি করে। পুরুষদের পাশাপাশি ক্যানভাসের বামদিকে মাছ শিকার করতে থাকা নারীরা জাতি গঠনে নারীদের ভূমিকা তুলে ধরে। উজ্জ্বল রঙ ও শক্তিশালী গতির মাধ্যমে দৃশ্যে একটি আশাবাদী অনুভূতি ফুটে ওঠে। নারীদের পাশে একটি মাটির কলসিও রয়েছে, যা ঐতিহ্যবাহী কৃষিভিত্তিক জীবনের সঙ্গে নারীর শক্তিকে সম্পর্কিত করে। এসএম সুলতানের শিল্পশৈলী ইউরোপীয় রেনেসাঁ ও ভারতীয় ঐতিহ্যের সংমিশ্রণে গঠিত। তার চিত্রকর্মে নারীরা শক্তিশালী, অথচ একই সঙ্গে মূর্তিমান সৌন্দর্যের প্রতীক হিসেবে উপস্থাপিত হয়।

কাজী আবদুল বাসেত

7

কাজী আবদুল বাসেত তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে ঢাকা সরকারি আর্ট ইনস্টিটিউটে অধ্যাপনা করেছেন। তার শিল্পকর্মে কলসি নতুন এক মাত্রায় উপস্থাপন হয়েছে, যা পূর্ববর্তী শিল্পীদের চিত্রায়ণ থেকে ভিন্ন ও বিশেষ। তার এক চিত্রকর্মে শান্ত নীল এবং বাদামি রঙ ব্যবহার করে নারী ও কলসির বিমূর্ত অবয়ব সৃষ্টি করা হয়েছে, যেখানে পেছনের নীল কুয়াশা বাষ্পীভূত পানির ইঙ্গিত দেয়। নারীর অবস্থান—সে কি পানি আনতে যাচ্ছে, নাকি ফিরে আসছে—তা অস্পষ্ট রাখা হয়েছে। এ ধোঁয়াশাভাব একই সঙ্গে জয়নুল আবেদিনের এক নামহীন চিত্রকর্ম ও কামরুল হাসানের ‘তিন কন্যা’ চিত্রকর্মের কথা মনে করিয়ে দেয়। মাটি, পানি ও আকাশের সংযোগ এখানে আরো এক রহস্যময় বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে। এ উপস্থাপনা কাজী আবদুল বাসেতের এক স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যরূপে প্রকাশ পায়।

নাসরিন বেগম

বাংলাদেশের আধুনিক যুগের চিত্রশিল্পীদের মধ্যে নাসরিন বেগম অন্যতম। তিনি তার কাজে আধুনিক শৈলী ও স্থানীয় প্রতীকী উপাদানের সংমিশ্রণে একটি স্বতন্ত্র ভাষা গড়ে তুলেছেন। বিভিন্ন মাধ্যমের ব্যবহার তার কাজকে বিশিষ্ট করে তুলেছে। ২০০০ সালে আঁকা এক চিত্রকর্মে তিনি নারী ও পানির সংযোগকে বিশেষভাবে তুলে ধরেছেন। তবে এটি পূর্বসূরি শিল্পীদের তুলনায় ভিন্ন ব্যাখ্যা প্রদান করে।

এ চিত্রকর্মে নারীর উপস্থিতি আর প্রচলিত অর্থে কোনো পানিবাহক হিসেবে নয়; বরং সে নিজেই পানিধারার প্রতিমূর্তি হয়ে ওঠে। এখানে নারীর প্রতীকায়ন সরাসরি নয়, বরং রূপকধর্মী। আগের শিল্পীদের মতো স্থির পুকুর বা নদীর পানি নয়, বরং নারী এখানে গতিময় সমুদ্ররূপে চিত্রায়িত হয়েছে। প্রচলিত প্রতীককে উল্টে দিয়ে এখানে নারীর ভূমিকা পানি সংগ্রহকারীর নয়; বরং সে নিজেই সমুদ্রের প্রতীক হয়ে উঠেছে।

এ চিত্রে কলসির অনুপস্থিতি উল্লেখযোগ্য। এটি শুধু লৌকিক গণ্ডির বাইরে যাওয়া নয়, বরং নারীর প্রচলিত সামাজিক ভূমিকার সীমানা পেরিয়ে এক বৈশ্বিক নারীবাদী চেতনার প্রতিফলন ঘটায়। এখানে জাতীয় পরিচয়ের চেয়ে সর্বজনীন নারীত্বের পরিচয়ই প্রধান হয়ে ওঠে, যা নাসরিন বেগমের শিল্পভাবনার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক।

কলসি শুধু ঐতিহ্যের ধারকই নয়, বরং সমাজের নানা স্তরের চিত্রও প্রকাশ করে। জয়নুল আবেদিন, এসএম সুলতান, আবদুল বাসেত ও নাসরিন বেগমদের মতো শক্তিশালী চিত্রশিল্পীদের তুলির ছোঁয়ায় কলসি যেন নারীর শক্তি ও সৃজনশীলতার প্রতীক হয়ে উঠেছে। আধুনিক চিত্রশিল্পে কলসির নিত্যনতুন উপস্থাপন সমাজের পরিবর্তনশীল প্রেক্ষাপট ও নারীর ভূমিকার প্রতি গভীর মনোযোগের নিদর্শন।

[লেখকের The ‘Kolshi’ in Bangladeshi Modern Art শীর্ষক প্রবন্ধের সংক্ষেপিত অনুবাদ করেছেন মিনহাজুল আবেদীন]