ইট বা সুরকি নয়; ঘর আসলে তৈরি হয় প্রিয় মানুষ দিয়ে। সম্ভবত এজন্যই প্রিয়জন হারানোর সময় মানুষ ঘরহারা হওয়ার বোধ পায়। অথচ সে ঘরটাই নিমিষে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে আদিলের। ইসরায়েলি বোমা হামলায় তিনি এক রাতে হারিয়েছেন পরিবারের ১২ সদস্যকে। তার বাবা, মা, দুই ভাই, চার বোন, ভাইয়ের স্ত্রী ও তাদের তিন সন্তান। বেঁচে গেছেন কেবল তিনি ও তার এক ভাই। একসময়ের ভরা বাড়ি এখন বিরান; কেবল স্মৃতি। অথচ এখনো আদিলের চোখে-মুখে দৃঢ়তা স্পষ্ট। পেছনের দিকে তাকিয়ে তিনি বলেন, ‘শিল্পী তো সাধারণ মানুষই। তারও ভালোবাসা ও দুঃখের অনুভূতি থাকে। তবে একজন শিল্পীর অন্যদের থেকে চারপাশকে বিশেষ চোখে দেখার ক্ষমতা থাকতে হয়। নিজের অন্তর্দৃষ্টির মাধ্যমে তিনি সে অভিজ্ঞতা চিত্রকর্মে প্রকাশ করেন।

আদিল আল তাওয়িল ফিলিস্তিনি চিত্রশিল্পী। পড়াশোনা করেছেন গাজার আল-আকসা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদে। অংশগ্রহণ করেছেন নানা কর্মশালা, প্রশিক্ষণ, আর্ট রেসিডেন্সি এবং স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক শিল্প প্রদর্শনীতে। কিন্তু একজন শিল্পী হওয়া আর ফিলিস্তিনি শিল্পী হওয়ার মধ্যে পার্থক্য প্রচুর। তার সফর ছিল প্রতিবন্ধকতাপূর্ণ; অথচ এগিয়ে যাওয়ার প্রতিশ্রুতিতে দীপ্ত। তিনি বলেন, ‘একজন ফিলিস্তিনি শিল্পী হিসেবে আমি দীর্ঘদিন ধরে আমার চারপাশে যা ঘটছে তা অনুভব করি। শিল্পকর্মের মাধ্যমে বিশ্বের কাছে ঘটনাগুলো তুলে ধরতে চাই, যাতে তারা আমাদের সংগ্রামকে সহজে বুঝতে পারে। আমাদের জন্য এ দায়িত্ব কখনো থামে না। আমাদের শিল্প গল্পে ভরা। গল্পগুলো আমাদের সংগ্রাম ও বাস্তবতা বোঝার গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।’
আদিল নানা মাধ্যমেই কাজ করেছেন। পেইন্টিং, খোদাই, গ্রাফিক প্রিন্টিং, ভাস্কর্য ও ইনস্টলেশন। কাজের মাধ্যমে তিনি ইতিহাসের দ্বারা প্রায়ই উপেক্ষিত মানুষের বাস্তব অভিজ্ঞতাগুলো তুলে ধরতে চান। যুক্তরাষ্ট্র, নরওয়ে ও ফ্রান্সের মতো দেশে তার প্রদর্শনী হয়েছে। বিষয়বস্তুর দিক থেকে তিনি সমকালীন ফিলিস্তিনি শিল্পীদের কথাই বলেন। ফিলিস্তিনি শিল্প দীর্ঘদিন ধরে সংগ্রাম ও পরিচয়ের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত, যা সরাসরি ফিলিস্তিনের মধ্য দিয়ে চলা সংঘাত ও যুদ্ধ দ্বারা প্রভাবিত হয়েছে। ফিলিস্তিনি শিল্প প্রতিরোধের একটি শক্তিশালী মাধ্যম হিসেবে উদ্ভাসিত হয়েছে, যেখানে তরুণ প্রজন্ম তাদের জাতীয় পরিচয় ও মতামত প্রকাশের একটি মাধ্যম হিসেবে এ শিল্পকে গ্রহণ করেছে। যুদ্ধের সময় এ সচেতনতা আরো বাড়ে, বিশেষ করে ফিলিস্তিনের চলমান পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলার জন্য। বছরের পর বছর ধরে সংঘটিত ঘটনাগুলোর প্রভাব ফিলিস্তিনি শিল্পের ওপর ব্যাপকভাবে পড়েছে।
ফিলিস্তিনি চিত্রকলার গতিপথে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর থেকে উল্লেখযোগ্যভাবে বদল ঘটেছে। সমকালীন চিত্রশিল্পীদের কাজ দেখলেই তা প্রতীয়মান হয়। গাজার গণহত্যা, শহরের ওপর বোমাবর্ষণ, ধ্বংসযজ্ঞ, জনসংখ্যার বাস্তুচ্যুতি এবং যুদ্ধের সময় ঘটে যাওয়া নানা নির্যাতনের চিত্র ফুটে উঠেছে তাদের শিল্পকর্মে। অনেক শিল্পী তাঁবুর কাপড়, ত্রাণসহায়তার কার্টন এমনকি বর্জ্য পুনর্ব্যবহার করে তাদের কাজ তৈরি করেছেন। পরিবর্তন এসেছে শিল্পের প্রতীকী এবং ধারণাগত দিক থেকেও। এখন সরাসরি জীবন-মৃত্যু, ধ্বংস ও বাস্তুচ্যুতির মতো বিষয়গুলোকে তুলে ধরা হচ্ছে, যা অনেক বেশি নির্মম এবং স্পষ্ট। সে সম্পর্কে আদিলের মত, ৭ অক্টোবরের যুদ্ধের প্রভাব ফিলিস্তিনি শিল্পকে আরো দৃঢ় ও প্রচারমূলক করে তুলেছে, যা আন্তর্জাতিক জনমতেও ফেলছে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব। ফিলিস্তিনি শিল্প এখন আর শুধু প্রতিরোধের একটি মাধ্যম নয়, এটি সামগ্রিকভাবেই একটি ভিজুয়াল প্রতিরোধের অংশ হয়ে উঠেছে।

আদিল মনে করেন, অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ একে অপর থেকে আলাদা নয়। তারা একসঙ্গে জড়িত একটি জীবন্তসত্তার মতো। কথাটা হয়তো মিথ্যে না। কিছু মনে করার মানে তো কেবল অতীতকে পাওয়া নয়, ভবিষ্যৎকেও ব্যাখ্যা করা। কারণ অতীত কেবল অভিজ্ঞতা নয়, অতীত পরিচয়ও। এজন্যই দেখা যায়, ইসরায়েলি বাহিনী ফিলিস্তিনি পরিচয় মুছে ফেলার জন্য ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলোকে ধ্বংস করেছে। সেখানকার প্রত্নতাত্ত্বিক স্থানগুলো ছিল ভূমির প্রকৃত মালিকদের পরিচয়ের প্রমাণ। আদিলের ভাষ্য অনুসারে, শুধু প্রত্নতাত্ত্বিক স্থানই নয়, ফিলিস্তিনি শিল্পীদের ওপরও প্রচণ্ড আঘাত হানা হয়েছে। অনেক শিল্পীকে হত্যা করা হয়েছে, অনেককে বন্দি করা হয়েছে, অনেকেই গুরুতর আহত। অনেক শিল্পী তাদের পরিবার, ঘরবাড়ি, শিল্পকর্ম ও স্টুডিও হারিয়েছেন।
অজস্র প্রতিকূলতা নিয়ে ফিলিস্তিনি শিল্পীরা কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। সীমিত উপকরণ ও সংস্থান ব্যবহার করে তারা তাদের কণ্ঠ এবং দেশের কণ্ঠকে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করছেন। আদিলের বক্তব্য, ‘এটি আহতের কণ্ঠস্বর, শহীদদের স্মৃতি এবং বন্দিদের আশা। প্রতিদিন গাজার দেয়াল যেন বলে: আমরা এখানে আছি, থাকব এবং স্বপ্ন দেখব; যত বাধাই আসুক না কেন।










