শেষ হলো ঢাকা মেকার্সের তৃতীয় মৌসুম। কারুশিল্প ও সৃজনশীলতার সমারোহ নিয়ে রাজধানীর আলোকি কনভেনশন সেন্টারে শুরু হয় উৎসবটি। ৩০ জানুয়ারি থেকে ৩ ফেব্রুয়ারি আলোকি প্রাঙ্গণে ছিল মানুষের ঢল। শুধু কেনাকাটার জায়গা হিসেবে নয়; পরিণত হয়েছে উদ্যোক্তা, কারিগর ও শিল্পীদের মিলনভূমিতে। সুযোগ তৈরি হয়েছে সৃজনশীলতা এবং ঐতিহ্যকে সমন্বয় করে একসঙ্গে এগিয়ে যাওয়ার। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে শিল্পকর্মের বাজারে দীর্ঘদিন ধরেই শূন্যতা চলে আসছে; সে দিক থেকে ঢাকা মেকার্স শিল্পকলায় নতুন মাত্রা যোগ করল।
মূলত আর্ট মার্কেটের জন্য চিত্রকলা আহ্বান করা হয়েছিল শিল্পীদের কাছে। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগে ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানাভাবেই চালানো হয়েছে প্রচারণা। পরবর্তীতে বিচারক সভা থেকে বাছাই করা হয়েছে শিল্পকর্মগুলো। প্রায় দুই মাস সময় নিয়ে কয়েক ধাপের নির্বাচন প্রক্রিয়া শেষে আর্ট মার্কেটের জন্য প্রায় ৩০০ শিল্পীকে নির্বাচন করা হয়েছে। শিল্পকর্মের মধ্যে ছিল পেইন্টিং, স্কেচ, এমনকি ডিজিটাল আর্টও।
সাধারণত কোনো প্রদর্শনীতে দর্শক কোনো পেইন্টিং কিনতে চাইলে সঙ্গে সঙ্গে দেয়া হয় না। প্রদর্শনী শেষ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়। কিন্তু আর্ট মার্কেট ব্যতিক্রম এখানে। ঢাকা মেকার্স থেকে দর্শক কোনো চিত্রকর্ম কেনার সঙ্গে সঙ্গে তা নিয়ে বাসায় চলে যেতে পেরেছেন। দর্শক মহল থেকে সাড়াও পাওয়া গেছে ব্যাপক। আয়োজকদের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, যে শিল্পীরা অনুমতি দিয়েছেন, তাদের আর্টের প্রিন্ট সংস্করণও মার্কেটে তোলা হয়েছে। আর্ট প্রিন্ট অনেক মানুষ কিনেছে। কারণ প্রকৃত কাজ কেনা অনেকের সামর্থ্যের মধ্যে থাকে না, ফলে প্রিন্ট সংস্করণ যথেষ্ট সুলভ হয়।
আর্ট মার্কেটে নবীন ও স্বাধীন শিল্পীদের কাজগুলো প্রদর্শিত হচ্ছে, যা শিল্প সংগ্রাহকদের জন্য একটি বিশেষ সুযোগ। সরাসরি শিল্পীর সঙ্গে গ্রাহককে যোগাযোগ করিয়ে দেয়ার কাজ করেছে ঢাকা মেকার্স। বিষয়টি উপভোগ করেছেন দর্শকরা। আর এজন্যই শুরু থেকেই পরিবার, তরুণ পেশাজীবী ও শিক্ষার্থীদের ব্যাপক উপস্থিতি দেখা গেছে।

ছবি: ঢাকা মেকার্স
ঢাকা মেকার্স তৃতীয় বছরে পা রাখল। এবারের আয়োজনে বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হয়েছে কারুশিল্প ও ঐতিহ্যবাহী হস্তশিল্পকে। সেখানে প্রতিটি পণ্য শুধু হাতের কারুকাজ নয়, বরং ইতিহাসের একটি অংশ। দেখা মিলেছে ঐতিহ্যবাহী জামদানি, শোলা, শতরঞ্জি, শীতলপাটি, ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর তৈরি পণ্য, কাঠ ও বাঁশের সামগ্রী, নারিকেলের খোল দিয়ে তৈরি বিভিন্ন উপাদান, টেপা পুতুল ও শোলা দিয়ে তৈরি পণ্যসহ বিলুপ্তপ্রায় নানা কারুপণ্যের। খাওয়া-দাওয়ার জায়গা, প্রদর্শনী ও বিভিন্ন কর্মশালাও ছিল মেলায়। পূর্বঘোষিত নানা আয়োজনের পাশাপাশি ছিল প্রাণবন্ত সব উপকরণ। আয়োজন করা হয় বাংলা ক্যালিগ্রাফি ও টাইপোগ্রাফি ওয়ার্কশপ। সেখানে সব্যসাচী হাজরার তত্ত্বাবধানে শিল্পপ্রেমীরা বাংলা লেখার শৈল্পিক সৌন্দর্য আবিষ্কার করেন। পটচিত্র কর্মশালায় কিংবদন্তি নিখিল চন্দ্র দাস লোকশিল্পের ইতিহাস ও চর্চা নিয়ে আলোচনা করেন। অ্যাবস্ট্রাক্ট ট্যাপেস্ট্রি ওয়ার্কশপ দর্শনার্থীদের সৃজনশীলতা প্রকাশের সুযোগ করে দেয়।
ক্রাফট মার্কেটে ছিল ব্যতিক্রমী আয়োজন। লাইভ বডি পেইন্টিং পারফরম্যান্স ও রিকশা আর্ট অন অবজেক্ট দর্শকদের ভিন্নধর্মী শিল্পের স্বাদ দেয়। ঐতিহ্যবাহী রিকশা পেইন্টিংয়ের আধুনিক প্রয়োগ দেখে দর্শকরা মুগ্ধ হন। এতকিছুর পরও সংগীতের কিন্তু কম উত্তেজনাপূর্ণ ছিল না। সংগীতপ্রেমীদের মঞ্চ মাতিয়েছে সাবকনশাস ও পাওয়ারসার্জের মতো ব্যান্ড, যারা তাদের অনন্য সুরের মাধ্যমে দর্শকদের বিমোহিত করে।
ঢাকা মেকার্সের এবারের আসরে বরাবরের মতোই টাইটেল পার্টনার হিসেবে ছিল সিটি ব্যাংক পিএলসি। এছাড়া দ্য ডেইলি স্টার অ্যাসোসিয়েট পার্টনার এবং আলোকি ভেন্যু পার্টনার হিসেবে যুক্ত ছিল। বাংলাদেশে এভাবে শিল্পকর্মের বাজার হয়নি। ঢাকা মেকার্স এ দিক থেকে পথিকৃতের ভূমিকা পালন করেছে। আয়োজকদের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, তারা দর্শক ও চিত্রশিল্পী ও সংগ্রাহকদের সাড়ায় সন্তুষ্ট। আর্ট মার্কেটের উদ্যোগ তারা আগামী দিনগুলোতে অব্যাহত রাখবে। আর সেটা হলে দেশের শিল্পকলায় যোগ হবে নতুন মাত্রা।










