ফেরাউনের হাত থেকে মুক্তি পাওয়ার পেছনে বনি ইসরায়েলের কোনো কৃতিত্ব ছিল না। তাদের উদ্ধার করেছেন স্বয়ং খোদা। কিন্তু বনি ইসরায়েলের কৃতিত্ব অন্য জায়গায়। অত্যাচারী শাসকের হাত থেকে মুক্তি পাওয়ার সে অভিজ্ঞতাকে তারা হাজার হাজার বছর ধরে জীবন্ত রাখতে পেরেছে যত্নের সঙ্গে। ধর্ম, দর্শন ও সাহিত্যের আশ্রয়ে নিজেদের গল্পকে বানিয়েছে সর্বজনীন। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে গীত হয় সে আখ্যান। যেন যতদিন জমিনে নিপীড়ন থাকবে, জীবিত থাকবে বনি ইসরায়েলের অভিজ্ঞতা। জুলাই ও আগস্টের দিনগুলোয় বঙ্গীয় জনপদে যে রক্তস্নাত মহাকাব্য জন্ম নিয়েছে, এখন প্রধান দায় সে অভিজ্ঞতাকে বাঁচিয়ে রাখা বনি ইসরায়েলের মতো। সে দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিতে চেয়েছে শিল্পকলা একাডেমি। জাতীয় চিত্রশালায় ‘২০২৪: ওই নূতনের কেতন ওড়ে’ শিরোনামে চলমান প্রদর্শনীটি তার সফল নজির।

জুলাই ঘটেছে মুক্তির তাড়না থেকে। ফ্যাসিবাদের বিপরীতে দাঁড়িয়ে বহুত্ববাদী সমাজের আকাঙ্ক্ষা থেকে। অবদমিত বহু স্বর তাই বহুভাবে নিজেদের দাবি জানিয়েছে। তার প্রতিধ্বনি শিল্পকলার এ আয়োজন। চিত্রশালার তোরণ দিয়ে প্রবেশের সঙ্গে সঙ্গে চোখে পড়ে গ্রাফিতিতে পূর্ণ দেয়াল। ‘স্টেপ ডাউন হাসিনা’ স্লোগানকে ঘিরে আছে অজস্র অভিব্যক্তি। শব্দগুলো আন্দোলনের সময় ব্যবহার করেছে আপামর জনতা। গোটা দেয়ালকে এভাবে ক্যানভাস বানিয়ে ফেলার কাজটা নান্দনিক। দ্বিতীয় তলার গ্যালারিতেও ঘটেছে ঘটনাটা। খাম কিংবা দেয়ালকে ক্যানভাস বানিয়ে শিল্পীদের দিয়ে মূল কর্মের প্রতিরূপ প্রদর্শনীতে যোগ করেছে ভিন্ন মাত্রা। তবে সবচেয়ে বড় আকর্ষণটা সম্ভবত ফটোগ্রাফি। জুলাই ও আগস্টের উত্তাল দিনগুলোয় দেশের বিভিন্ন প্রান্তের ঘটনা পেশাদার ও অপেশাদার হাতে ফ্রেমবন্দি হয়েছিল। ৫ আগস্টে উচ্ছ্বসিত জনতার গণভবনমুখী মিছিলের আগে পর্যন্ত কত ঘটনা, তার পরিসীমা নেই। একটা দেয়ালকে ক্যালেন্ডারের পাতার রূপ দেয়া হয়েছে। ভেতরের দিকটায় দেয়ালজুড়ে একসারি এক্স-রের রিপোর্ট দেখে কৌতূহল জাগতে পারে মনে। আন্দোলনে যারা আহত হয়, তাদের কাছ থেকেই সংগ্রহ করা ছবিগুলো। সারা জীবন এ ক্ষত বয়ে বেড়াতে হবে ভাবলেই অস্থিরতা দানা বাঁধে। তবে ‘লাশের মিছিল’ নামে সিরিজটার সামনে গেলে শিরশির করে ওঠে হাত-পা। নিহত সহযোদ্ধার মরদেহের পাশে আন্দোলনকারীরা, এমন একটা ফ্রেমেই প্রায় এক ডজন ছবি। দেখে কেবল একটা প্রশ্নই জাগে, পৃথিবী তো অনেক সভ্য হয়েছে। তাহলে এখনো অধিকার আদায়ের জন্য মানুষকে জীবন দিতে হয় কেন?

অভ্যুত্থান ও অভ্যুত্থানের পর গ্রাফিতির ব্যাপ্তি ছিল চোখে পড়ার মতো। সারা দেশের রাস্তা ও দেয়াল বিচিত্র সব রঙে রাঙিয়ে তুলেছে ছাত্রছাত্রীরা। তাদের আনাড়ি হাতের ছবিগুলো এবড়োথেবড়ো, বানানও কোথাও ব্যাকরণ অনুগামী নয়। ‘দড়ি ধরে মারো টান, স্বৈরাচার হবে খান খান’ স্লোগানটি লিখতে গিয়ে দুবারই পূর্ণমাত্রা হয়ে গেছে ‘খ’ বর্ণে। কোথাও ‘জোরে’ লিখতে গিয়ে ‘জোড়ে’ হয়ে গেছে। তাতে কিছু যায় আসে না আসলে। যখন বাক্যগুলো রাস্তার পাশে লেখা হচ্ছিল, আন্দোলনকারীরা অভিধান নিয়ে মাঠে নামেনি। নেমেছে রাষ্ট্র সংস্কারের দাবি নিয়ে, শিক্ষার্থীরা হাজির করেছে তাদের রাজনৈতিক বয়ান। সে দাবি সামনে আনার জন্য উপেক্ষা করতে হয়েছে পুলিশি নিষেধাজ্ঞা ও রাষ্ট্রীয় পেটুয়া বাহিনীর রক্তচোখ। যুদ্ধাবস্থায় খুব দ্রুত কিছু একটা এঁকে বা লিখে চলে যাওয়ার মতো। অবশ্য ৫ আগস্ট-পরবর্তী দেয়ালচিত্র ভিন্ন ধাঁচের। গ্রাফিতি তখন বেশ স্থির ও নান্দনিক। শিল্পনৈতিকতা আর ভাষিক নৈতিকতার পুনঃসংজ্ঞায়ন ঘটেছে যেন।

আন্দোলন দ্রুত সময়ের মধ্যে বহু দিকে ডালপালা ছড়িয়েছে। রাস্তায় চলতে থাকা মিছিলের সমান্তরালে এগিয়ে এসেছেন শিল্পীরা। সামনের সারিতে ছিলেন মেহেদী হক, রাকিব হাসান অপু, ফরিদুর রহমান রাজিব, মো. মাহাতাব রশিদ ও মনিরুজ্জামান শিপুর মতো কার্টুনিস্টরা। দেবাশিষ চক্রবর্তীর পোস্টারে তো সয়লাব হয়ে গিয়েছিল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। প্রাসঙ্গিক ছিল সোহরাব রাব্বি, গরিব আনজু, আকাশ ও চৌ সিংয়ের সৃষ্টিকর্ম। স্বাভাবিকভাবেই তাদের সৃষ্টিকর্মও ঠাঁই পেয়েছে প্রদর্শনীতে। ফটোগ্রাফি, গ্রাফিতি, কার্টুন ও পোস্টারের বাইরে আছে রাসেল রানার পারফরম্যান্সের আলোকচিত্র। রাসেল রানা জুলাইয়ের আন্দোলনে সক্রিয় ছিলেন। এই তো দিন কয়েক আগেই জুলাইয়ের সৃষ্টিকর্ম নিয়ে তার নাইটমেয়ার সিরিজ প্রদর্শিত হয়ে গেল। হাজির হয়েছেন এখানেও। ২০২৪ সালের আন্দোলনে শহীদ আর ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের নাম পাশাপাশি রেখে তিনি কি দুটি সময়ের মধ্যে সাদৃশ্য খুঁজতে চেয়েছেন? হতে পারে। প্রতিটি মুক্তির মধ্যেই অদৃশ্য একটা সুতা থাকে। এর বাইরে আল-জাজিরায় যে ডকুমেন্টারি আলোচনা তৈরি করেছিল, বিশেষ অনুমতি নিয়ে সেটাও প্রচার হচ্ছে। কীভাবে ছাত্রদের ওপর রাষ্ট্রীয় পেটুয়াবাহিনী হামলা করেছে, তার সাক্ষী।
শেখ হাসিনাই বাংলাদেশের প্রথম ফ্যাসিবাদী শাসক নয়। ফ্যাসিবাদ কায়েম হওয়ার অনুঘটক গত দেড় দশকের আগেও ছিল। স্বাধীনতার পর থেকেই জড়িয়ে ছিল বহুমাত্রিক শেকড়। ‘মেধাবীরা মুক্তি পাক’ স্লোগানের ওপর চোখ বুলাতে বুলাতেই সামনে চলে আসে নুর হোসেনের ‘স্বৈরাচার নিপাত যাক’ স্লোগান। যেন একাকার হয়ে যায় স্বাধীনতা-পরবর্তী পাঁচ দশকের বিদ্রোহ আর বিপ্লব। যেন জুলাইকে আরো বড় পরিসরে নিয়ে যেতে চাইছে প্রদর্শনী। এ কথা সত্য হলে মাথায় একটা প্রশ্ন খোঁচা দেয়। আমরা কি গত দেড় দশকের জুলুমের ইতিহাসকে সমকালীন বিশ্বের জুলুম কিংবা মানবজাতির জুলুমের ইতিহাসের সঙ্গে পাঠ করতে পারি। যদি নাৎসিবাহিনী ও বিশুদ্ধ বাঙালিবাদীদের তৎপরতায় সাদৃশ্য থাকতে পারে, তাহলে তাদের কাছাকাছি ক্যানভাসে রেখে জুলাইকে আরো বড় পরিসরে দেখাটা হয়তো খুব বেশি বেখাপ্পা হবে না।

প্রদর্শনীর কিউরেটর হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন সমকালীন বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ শিল্পী ও শিল্পসমালোচক মোস্তফা জামান। নব্বইয়ের দশক থেকেই তিনি জাতীয় দৈনিকে শিল্প সমালোচনা ও শিল্পকলাবিষয়ক প্রবন্ধ লিখে স্বতন্ত্র অবস্থান তৈরি করে নিয়েছেন। সেদিক থেকে জুলাইয়ের কথা প্রকাশের দায়িত্বটা উপযুক্ত হাতেই পড়েছে বলা যায়। প্রদর্শনীর উদ্দেশ্য নিয়ে তিনি বলেছেন, ‘আমাদের উদ্দেশ্যের মধ্যে বহুত্ববাদী স্বর ছিল। অনেকে বহুত্ববাদী স্বরকে একমুখী করে দিতে চাচ্ছে। আমরা একটা বহুমুখীনতার মধ্যে থাকতে চাই। বহু স্বরকে আমরা স্বীকৃতি দিতে চাই। যে কোনো জায়গায় আমাদের উপস্থিতিতে যেন সেই রকম মনে হয়।’ প্রদর্শনীর কো-কিউরেটর ও শিল্পী মো. বজলুর রশিদ শাওন বলেছেন, ‘এটা একটা নির্মীয়মাণ প্রদর্শনী। স্বৈরাচার পতনের পর দেয়াললিখন ও আলোকচিত্রে আন্দোলনের বহুমাত্রিক আর্কাইভ গড়ে তোলার প্রাথমিক প্রয়াস।’ অর্থাৎ সামনে আরো অনেক কিছু যুক্ত হবে। বিষয়টা জুলাইকে জনপরিসরে ছড়িয়ে দেয়ার পথে জরুরি পদক্ষেপ হতে যাচ্ছে বলেই বিবেচনা করা যায়।
প্রদর্শনী শুরু হয়েছে ১৬ ডিসেম্বর, চলবে ১৫ জানুয়ারি পর্যন্ত। খুব অল্প সময়ের প্রস্তুতিতে এমন হাজিরা সত্যিই প্রশংসনীয়। ছাত্র ও জনতার ত্যাগের স্মৃতি জেগে থাক জনমানসে। জাগিয়ে রাখুক সামনের দিনগুলোয়। ফ্যাসিবাদ থেকে মুক্তি পাক এখানকার সমাজ ও সংস্কৃতি।










