প্রকৃতিতে বইছে বৈশাখের তপ্ত হাওয়া। গ্রীষ্মের এমন এক ছুটির বিকাল। রাজধানীর ধানমন্ডির লেক ধরে রিকশাযোগে যেতে যেতে কনকচূড়া গাছ থেকে পুষ্পবৃষ্টি ঝরা দেখে সংগত কারণে মনপ্রাণ জুড়িয়ে গেল। ছিল কিছুটা তাড়াহুড়ো। উদ্দেশ্য, যাব লালমাটিয়া ডি ব্লকের ৬/৪ নম্বর বাড়িতে। সেখানে চলছে শিল্পী প্রদ্যোত কুমার দাসের একক শিল্পকর্ম প্রদর্শনী। যথাসময়ে পৌঁছে যাই কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে। সিঁড়ি বেয়ে দোতলায় উঠেই ফটক ঠেলে প্রবেশ করি শিল্পাঙ্গনের ‘ভূমি’ গ্যালারিতে। গ্যালারির প্রবেশ পথের দেয়ালে ঝোলানো দুটি চিত্রকর্ম দেখে দাঁড়িয়ে যাই। ‘বাংলার মুখ’ শিরোনামের শিল্পকর্ম দুটি রাখা হয়েছে বুঝি দর্শনার্থীদের অভ্যর্থনা জানাতে। হলুদ রঙের সঙ্গে সবুজ প্রলেপে তুলা ধরা হয়েছে বাংলার প্রকৃতিকে। আরেকটি ছবিতে কালো মহিষের পিঠে চড়ে আছে সাদা একটি বক। চিত্রকর্মটিতে রঙ ব্যবহারের সঙ্গে ফুটে উঠেছে প্রকৃতির উপাদানের সহাবস্থান। এ যেন প্রকৃতির দিব্য বিভা।
১০০টি শিল্পকর্ম নিয়ে চলমান এ প্রদর্শনী গৃহ। চিত্রকর্ম রয়েছে ৬৫টি। ভাস্কর্য ৩৫টি। ঘুরে ঘুরে সেগুলো দেখতে লাগলাম। চোখ থমকে গেল ‘কম্পোজিশন ৩’ শিরোনামের এক চিত্রকর্মে। একটি পোড়া বোর্ডের নিচে ক্ষয়ে যাওয়া একটি ভবন। চিত্রকর্মটি শিল্পের একটি চ্যালেঞ্জিং প্লট বলে সহজেই অনুমেয় হয়।

‘মধ্যবিত্ত-৪’ শিরোনামের একটি ভাস্কর্য দর্শনার্থীদের অনেকখানি ভাবায়। এটি নিয়ে একটু বলা যাক। কী আছে এর বিষয় আঙ্গিকে? মাথার ওপর একটি ভাঙা ছাতা ধরে আছে একজন মানুষ। বৃষ্টিতে ভিজছে। তবু মানুষটি তার ছাতা ছাড়ছে না। হেরে যাচ্ছে। তা জেনেও হাল ‘না’ ছেড়ে দেয়ার নামই তো মধ্যবিত্ত। সেই বিষয়টিই প্রতীয়মান হচ্ছে এ কাজটির মধ্যে। সমাজের এ শ্রেণীগোষ্ঠী হেলতে পারে না বলে কি এর নাম মধ্যবিত্ত! প্রকৃত অর্থে তাই। তারা নিজের অবস্থান ধরে রাখতে মরিয়া। মধ্যবিত্তের জীবনের রঙ নিয়ে গ্যালারিতে ঠাঁই পাওয়া কয়েকটি কাজ দেখে আবারো তাই প্রমাণিত হলো। প্রদ্যোত কুমার দাসের আবেগী প্রকাশ ভঙ্গিতে যা বাঙ্ময় হয়ে উঠেছে।
জীবনের গূঢ়ার্থ ফুটে উঠলে তা তখন শিল্পে রূপ নেয়। এ কথা নতুন করে আর বলার অপেক্ষা রাখে না। একখানি আয়না ধরে আছে এক নারী। ধাতব পাতে গড়া এ শিল্পকর্মের চরিত্রটি আরশিতে তার মুখখানি দেখছে। এ কাজটিতে আপাতদৃষ্টিতে দেখা যাচ্ছে, নিম্নমধ্যবিত্ত শ্রেণীর আহ্লাদমাখা এক নারীর অবয়ব। প্রত্যেকে তার নিজের চরিত্রটি যদি নিজে দেখে নিত। তাহলে কি সমাজের মধ্যে এ বিদ্বেষ, হানাহানি থাকত! যেকোনো শিল্প প্রসঙ্গে তো নানা কথাই বলা যায়। তবে শিল্পের ব্যাখ্যা একেকজনের দৃষ্টিতে একেক রকম। এ শিল্পীর কর্মের বেলাতেও তাই। ‘জীবন ও অবস্থান’ শিরোনামের একটি চিত্রকর্মের সামনে দাঁড়িয়ে ছিলেন শিল্পী। তার অনুভূতি জানতে চাইলে বলেন, ‘জীবন ভ্রমণের পথে পথে আমি আমার পারিপার্শ্বিক অভিজ্ঞতা ও অনুভূতিগুলো আঁকি। মাটি আর মানুষের সোঁদা গন্ধমাখা স্বপ্ন ও সংগ্রামের গল্পগুলো আমাকে যে গভীর উপলব্ধি দেয় তা আঁকতে চেষ্টা করি। এ কাজগুলো মূলত জীবনবোধের সীমাহীন যাত্রায় আমার সীমিত প্রকাশ মাত্র।’
জেলে, দিনমজুর নিয়ে ভাস্কর্য গড়েছেন, যা অনেকখানি এ প্রদর্শনীকে এনে দিয়েছে ভিন্ন এক মাত্রা। শৈশব, গ্রামীণ কুতকুত, দড়ি লাফ খেলার ভাস্কর্যও গড়েছেন তিনি। প্রত্যেকটি কাজই নিঃসন্দেহ শ্রমসাধ্য। শত শিল্পের পসরা নিয়ে সাজানো শিল্পাঙ্গনের গ্যালারিজুড়ে স্থান পেয়েছে প্রাণ-প্রকৃতির জয়গান। আবার শিল্পী পারিপার্শ্বিক অবস্থার সংকট তুলে ধরেছেন সুরের ছন্দে। এজন্যই হয়তো প্রদর্শনীর শিরোনাম দেয়া হয়েছে ‘রুদ্র আলোক’! অর্থাৎ জেগে ওঠার প্রয়াস।
গ্যালারি ঘুরে দেখছিলেন লালমাটিয়ার ভূইয়া একাডেমির শিক্ষার্থী মাইশা ফাহমিদা সরকার। এ শিক্ষার্থীর কাছে প্রদর্শনীর কাজগুলো সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘খুব সুন্দরভাবে উঠে এসেছে বাংলাদেশের গ্রামীণ চিত্র। শিল্পীর রঙের বিন্যাস ইউনিক। রঙের ব্যবহার ও আবহমান বাংলার ঐতিহ্যকে সংযুক্ত করেছেন মুন্সিয়ানার সঙ্গে।’
এ প্রদর্শনী সম্পর্কে কথা হয় শিল্পী মোহাম্মদ ইউনুসের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘অনেক দিন ধরে কাজ করছে প্রদ্যোত। অনেকগুলো কাজ রয়েছে এ প্রদর্শনীতে। দেখলাম। বিশেষ করে ওর গড়া ভাস্কর্যগুলো ভালো লেগেছে, যা নতুন আঙ্গিকে ও শিল্পের ভিন্ন মাত্রা যুক্ত করেছে বলে আমার বিশ্বাস। পেইন্টিংয়ের ক্ষেত্রে নিজস্ব একটা ধারা সে তৈরি করেছে, যা অন্যদের কাজ থেকে আলাদা করা যায়। ওর কাজের আরেকটা ব্যাপার লক্ষণীয়, তা হলো বোর্ডে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে একটা টেক্সচার তৈরি করা, যা বিমূর্ত নয় তবে বিষয় উপস্থিত থাকে। এটা বলা যায় ওর একটা দক্ষতা।’
চিত্রকর্ম ও ভাস্কর্যের যুগপৎ সম্মিলন এ প্রদর্শনী। ‘কাক’, ‘বক’, ‘নারী’, ‘জীবন সায়াহ্নে’, ‘রাখাল’ ও ‘খেলাঘর’ শিরোনামের চিত্রকর্ম দেখে যেমন হৃদয়ে নাড়া দেয় তেমনি পণ্যবোঝাই গাড়ি টেনে নিয়ে যাওয়া প্রাণান্তকর এক শ্রমিকের ভাস্কর্য বিবেককে অনেকখানি ঝাঁকি দেয়। সরল সূত্রে গাঁথা এ কাজগুলো শিল্পের স্বমহিমা বহন করছে বলে আমার ধারণা। ছোট ক্যানভাসে বিশাল জীবনের কথকতা বহন করা প্রত্যেকটি শিল্পকর্ম। দেখলাম, কিছু কাজে গায়ে পরানো হয়েছে লাল টিপ। অর্থাৎ কাজগুলো শিল্প সমঝদার কিনে নিয়েছেন। শিল্পকর্মগুলোর দামও সাধ্যের মধ্যে রাখা হয়েছে। কেননা চিত্রকর্মগুলো আকারে ছোট। এর উদ্দেশ্য, যাতে মধ্যবিত্ত শ্রেণী সংগ্রহ করতে পারে। ২৬ এপ্রিল শুরু হওয়া এ প্রদর্শনীর পর্দা নেমেছে গতকাল।










