টানা বৃষ্টিতে যশোরের অভয়নগরে ভবদহ এলাকায় আবারো সৃষ্টি হয়েছে জলাবদ্ধতা। পানিবন্দি হয়ে পড়েছে প্রেমবাগ, সুন্দলী, চলিশিয়া ও পায়রা ইউনিয়নসহ নওয়াপাড়া পৌর এলাকার শত শত পরিবার। তলিয়ে গেছে সবজি ও ধানখেত। ভেসে গেছে মাছের ঘের। ভবদহ অঞ্চলের টেকা নদীসহ কয়েকটি খাল ও বিলে অবৈধ নেটা-পাটা ও চায়না জাল বসিয়ে পানিপ্রবাহে বাধা সৃষ্টি করায় এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে বলে জানিয়েছেন ভবদহ অঞ্চলের বাসিন্দারা।

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মণিরামপুর ও অভয়নগর উপজেলার ভবদহ অঞ্চলে পানি নিষ্কাশনে প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে অপরিকল্পিত স্লুইসগেট। চার ভেন্টের ওই স্লুইসগেট দুই উপজেলার বিল কেদারিয়ার মধ্যস্থলে অবস্থিত। যেটি কার্যত অকেজো হয়ে পড়ে আছে। সুতিঘাটা থেকে প্রবাহিত মুক্তেশ্বরী নদী শেষ অংশ, মশিয়াহাটীর সীমানা খাল ও বেদভিটা খালের সংযোগস্থলে টেকা নদীর ওপর নির্মাণ করা হয় স্লুইসগেটটি। পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) ২০০২ সালে টেকা-মুক্তেশ্বরী নদীর অববাহিকায় বিল কেদারিয়ায় টাইডেল রিভার ম্যানেজমেন্ট (টিআরএম) প্রকল্প চালু করে। ওই সময়ে ২৫২ কোটি টাকা ব্যয়ে ২৭ বিলের পানি নিষ্কাশনের উদ্দেশ্যে ভবদহ স্লুইসগেট থেকে যশোরের সুতিঘাটা-কামালপুর ব্রিজ পর্যন্ত উত্তরে মুক্তেশ্বরী নদীর দুই পাড়ে বেড়িবাঁধ ও প্রতিটি বিলে স্লুইসগেট নির্মাণ করে। প্রতিটি বিলে স্লুইসগেট করার কথা থাকলেও চার ভেন্টের ওই গেটটি করা হয় টেকা নদীর মুখে, যা বর্তমানে পানিপ্রবাহে মারাত্মক বাধার সৃষ্টি করছে। পরবর্তী সময়ে জলাবদ্ধতা আরো প্রকট আকার ধারণ করে। ২০২৩ সালের ২২ জানুয়ারি থেকে আপৎকালীন ব্যবস্থা হিসেবে ৩ কোটি ৮০ লাখ টাকা ব্যয়ে প্রতিটি ৩৫ কিউসেক ক্ষমতা সম্পন্ন চারটি সেচযন্ত্র বসানো হয়, যা দিয়ে এখনো প্রতিদিন পানি নিষ্কাশন করা হচ্ছে। এছাড়া এ প্রকল্পের অধীনে ২১ ভেন্টের স্লুইসগেটে ১৪টি সেচযন্ত্রের মাধ্যমে অপর পাশে নদীতে পানি ফেলা হচ্ছে। প্রায় ২০০ মিটার দূরে শ্রী নদীর অপর শাখার ওপর ৯ ভেন্টের স্লুইসগেটের ওপর পাঁচটি বৈদ্যুতিক সেচযন্ত্র বসানো রয়েছে। সেচযন্ত্র দিয়ে নদীর এপাশ থেকে ওপাশে পানি ফেলা হচ্ছে।

এ ব্যাপারে পাউবো যশোরের নির্বাহী প্রকৌশলী পলাশ কুমার ব্যানার্জী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আগামী মাসে ভবদহ এলাকায় সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে ৮১ দশমিক ৫ কিলোমিটার নদী খননকাজ শুরু হবে, যার ব্যয় ধরা হয়েছে ১৪০ কোটি টাকা টাকা। এটা বাস্তবায়ন হলে মানুষ উপকৃত হবে। এছাড়া গতকাল আমরা স্লুইসগেট খুলে এবং পাম্প দিয়ে পানি বের করেছি।’

তবে ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, সেচযন্ত্র প্রকৃতপক্ষে কোনো কাজেই আসছে না। উত্তরে নদীর প্রশস্ততা ও গভীরতা কমেছে। তার ওপর বন্ধ ওই চার ভেন্টের স্লুইসগেটে পানি আটকে গিয়ে সেচযন্ত্রের কাছে পানি পৌঁছাচ্ছে না।

অভয়নগর উপজেলার সরখোলা গ্রামের বিউটি বেগম বলেন, ‘রাস্তা থেকে বাড়ি পর্যন্ত যেতে বাঁশের সাঁকো দিয়ে চলাচল করতে হচ্ছে। এক সপ্তাহ ধরে পানিবন্দি হয়েও সরকারি কোনো সহযোগিতা মেলেনি।’

ডুমুরতলা গ্রামের নবনিতা রানী বিশ্বাস বলেন, ‘আমাদের জলাবদ্ধতার স্থায়ী সমাধন হবে কি? জন্মের পর থেকে ভবদহের একই চিত্র দেখে আসছি। সরকার আসে, যায় কিন্তু ভবদহের জলাবদ্ধতার সমস্যা সমাধান হয় না।’

উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) মুশফিকুর রহমান জানান, ভবদহ এলাকায় পানিবন্দি হয়ে পড়েছে শত শত পরিবার। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বিষয়টি জানানো হয়েছে। নির্দেশনা পেলে ত্রাণ সহায়তা দেয়া হবে।

কৃষি বিভাগ বলছে, টানা বৃষ্টিতে উপজেলার ১২৯ হেক্টর আবাদি জমি জলাবদ্ধতার শিকার হয়েছে, যার মধ্যে ২৫ হেক্টর আউশ ও ৪৫ হেক্টর আমন ধান, ৫৮ হেক্টর সবজি ও ১ হেক্টর জমির মরিচ রয়েছে। এছাড়া উপজেলার পায়রা, চলিশিয়া, শ্রীধরপুর, সিদ্ধিপাশা ও প্রেমবাগ ইউনিয়নে ২৮৪টি মাছের ঘের ভেসে গেছে।

কোটা গ্রামের মৎস্য ঘের মালিক কামরুজ্জামান তরফদার বলেন, ‘৩০০ বিঘা জমিতে পাশাপাশি দুটি মাছের ঘের ভেসে গেছে। ঘেরে অর্ধকোটি টাকার মাছ ছিল।’

এদিকে গত ২২ এপ্রিল ও ১০ নভেম্বর দুই দফা অন্তর্বর্তী সরকারের পানিসম্পদ উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান ভবদহ স্লুইসগেট পরিদর্শন করেছেন। এ সময় তিনি ব্যবস্থা নেয়ার প্রতিশ্রুতি দিলেও চার ভেন্টের স্লুইসগেটটি কার্যকর করা কিংবা অপসারণের বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নেয়া হয়নি। চলমান সেচ প্রকল্পের একটি বড় প্রতিবন্ধকতা ওই স্লুইসগেট।

ভবদহ অঞ্চলের বাসিন্দারা বলছেন, অভয়নগরের পায়রা, চলিশিয়া, সুন্দলী ও প্রেমমবাগ ইউনিয়নের নিচু এলাকায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। পানিবন্দি হয়ে পড়েছে শত শত পরিবার। এছাড়া নওয়াপাড়া পৌরসভার ৫ ও ৮ নম্বর ওয়ার্ডে পানিবন্দি হয়ে পড়েছে বেশকিছু পরিবার। বিলের মধ্যে ওই স্লুইসগেটটি বেকার পড়ে আছে, ফলে একটি নদী ও দুটি খাল দিয়ে উত্তরাঞ্চলের পানি বের হতে পারছে না।

এ বিষয়ে অভয়নগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা পার্থ প্রতিম শীল বণিক বার্তাকে বলেন, ‘পানিবন্দি পরিবারের মাঝে ত্রাণসহায়তা দেয়ার প্রস্তুতি চলছে। নদী, খাল ও বিলে অবৈধভাবে নেট-পাটা ও জাল ফেলে পানিপ্রবাহে বাধা সৃষ্টিকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে। আমডাঙ্গা খাল সংস্কারে পাউবো কাজ করেছে।’