পাম অয়েলের ক্ষেত্রে ইন্দোনেশিয়া ও সয়াবিনে আর্জেন্টিনাই বাংলাদেশের প্রধান ভরসা। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বছরের বেশির ভাগ সময় দেশের ভোজ্যতেলের বাজারের উত্থান-পতনের মূল কারণ হলো এ দুটি দেশের ওপর অতি নির্ভরশীলতা। কারণ ইন্দোনেশিয়া ও আর্জেন্টিনা হলো বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় উৎপাদক। ফলে স্বাভাবিকভাবেই তাদের তেলের চাহিদাও বেশি। কোনো কারণে এ দেশ দুটির বাজারে সংকট তৈরি হলে তার প্রভাব সরাসরি এসে পড়ে বাংলাদেশের বাজারে। তাই বিকল্প আমদানি উৎস ছাড়াও দেশীয় উৎপাদনের খাতকে শক্তিশালী করার পরামর্শ দিচ্ছেন খাতসংশ্লিষ্টরা।
আমদানিকারক ব্যবসায়ীরা বলছেন, সবচেয়ে বেশি উৎপাদনকারী দেশের ওপর নির্ভরশীলতা কমানোর সুযোগ আপাতত কম। তবে দেশীয় উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন আনলে এই একক নির্ভরশীলতা কমানো সম্ভব। দেশে এখন সীমিত পর্যায়ে সয়াবিন উৎপাদন হয়। এছাড়া আমদানি করা সয়াবীজ থেকেও তেল উৎপাদন হয়। পরীক্ষামূলকভাবে পাম অয়েল উৎপাদন করছে কিছু প্রতিষ্ঠান। এসব উদ্যোগকে পৃষ্ঠপোষকতা দেয়ার পাশাপাশি আমদানির জন্য বিকল্প দেশের কথাও বলছেন তারা।
ভোজ্যতেল আমদানির জন্য বিশ্বের বেশির ভাগ দেশ সবচেয়ে কাছের উৎসকে প্রাধান্য দেয় বলে জানিয়েছেন কয়েকজন আমদানিকারক। সে হিসেবে বাংলাদেশের জন্য ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়া থেকে পাম অয়েল আমদানি সবচেয়ে সাশ্রয়ী। অন্যদিকে সয়াবিন উৎপাদনে আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিলের একক আধিপত্য থাকায় বাংলাদেশের জন্য বিকল্প আর কোনো পথ নেই। ফলে আন্তর্জাতিক ক্রয়মূল্য অনেকটা কাছাকাছি থাকলেও বাংলাদেশে পাম অয়েল ও সয়াবিনের দামের পার্থক্য থাকে। তাই বিকল্প হিসেবে ব্যবসায়ীরা দেশে উৎপাদনের সুযোগ তৈরির বিষয়টিকে গুরুত্ব দেয়ার পরামর্শ দিয়েছেন।
এ বিষয়ে নূরজাহান গ্রুপের পরিচালক মো. মিজানুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, ইন্দোনেশিয়া কিংবা আর্জেন্টিনার বিকল্প আপাতত বাংলাদেশের নেই। তবে দেশের অভ্যন্তরে সয়াবীজ ও পাম অয়েল উৎপাদনের সুযোগ রয়েছে। কিছু উৎপাদন হলেও সেটি উল্লেখযোগ্য নয়। এক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা প্রয়োজন। দেশের অভ্যন্তরে উৎপাদন বাড়ানোর মাধ্যমে দেশীয় মুদ্রা সাশ্রয় ছাড়াও কর্মসংস্থান বৃদ্ধি সম্ভব। সরকারের সহযোগিতা পেলে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোও এগিয়ে আসবে।
সয়াবিন উৎপাদনে বিশ্বে শীর্ষে রয়েছে লাতিন আমেরিকার দেশ আর্জেন্টিনা। দেশটির বৈশ্বিক শেয়ার ৭৬ শতাংশ। এছাড়া দ্বিতীয় সর্বোচ্চ উৎপাদনকারী দেশের মধ্যে রয়েছে আরেক লাটিন দেশ প্যারাগুয়ে, যার শেয়ার ১৩ শতাংশ। এছাড়া ব্রাজিল ৯ শতাংশ ও অন্যান্য দেশ উৎপাদন করে মোট উৎপাদনের ২ শতাংশ। অন্যদিকে পাম অয়েল উৎপাদনে বিশ্বে দুটি দেশ এককভাবে নেতৃত্ব দিচ্ছে। এর মধ্যে ইন্দোনেশিয়া বৈশ্বিক মোট উৎপাদনের ৮৭ শতাংশ ও মালয়েশিয়া উৎপাদন করে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ১৩ শতাংশ। ফলে সবচেয়ে বেশি উৎপাদনকারী দেশ হিসেবে সয়াবিন ও পাম অয়েলের ক্ষেত্রে যথাক্রমে আর্জেন্টিনা ও ইন্দোনেশিয়ার ওপর বাংলাদেশের নির্ভরতা প্রায় শতভাগ। যার কারণে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি ভোগকারী দেশের চাহিদা বৃদ্ধি কিংবা উৎপাদনকারী শীর্ষ দেশ দুটির উৎপাদন সংকট কিংবা মূল্যবৃদ্ধিজনিত কারণে বাংলাদেশের বাজার টালমাটাল থাকে বছরের অধিকাংশ সময়।
চট্টগ্রাম চেম্বারের সভাপতি মাহবুবুল আলম বলেন, বাংলাদেশে আমদানি করা ভোজ্যতেলের বেশির ভাগই অপরিশোধিত। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে পরিশোধিত ভোজ্যতেল আমদানি করা হলে দেশের বাজার স্থিতিশীল রাখা সম্ভব হতো। আবার পরিশোধিত ভোজ্যতেল আমদানির সুযোগ দিয়ে বাজার উন্মুক্ত করে দেয়া হলে মুষ্টিমেয় কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের ওপর একক নির্ভরশীলতা কমে যেত এবং বাজার স্থিতিশীল থাকত। এক্ষেত্রে ধীরে হলেও দেশেই ভোজ্যতেলের উৎপাদনের বিকল্প পথ তৈরির পক্ষে মত দেন তিনি।
ইন্দোনেশিয়ান অয়েল পাম রিসার্চ ইনস্টিটিউটের সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশে ২০২১ সালের হিসাবে সয়াবিন ও পাম অয়েলের মোট বাজার ২৫ লাখ টনের কিছু বেশি। এর মধ্যে ৪৬ দশমিক ৩ শতাংশ সয়াবিন ও ৫৩ দশমিক ৭ শতাংশ পাম অয়েলের। যদিও ২০১৩ সালে বাংলাদেশে এ দুটি ভোজ্যতেলের মোট চাহিদা ছিল ১৭ লাখ ৭৫ হাজার টন। যার মধ্যে সয়াবিনের পরিমাণ ছিল ২৯ শতাংশ। আট বছরের ব্যবধানে সয়াবিনের চাহিদা অনেক বেড়েছে। মূলত মোড়কজাত কোম্পানিগুলোর বিপণন কৌশল, সরকারের খোলা তেল বিক্রির ওপর কড়াকড়ি আরোপ ও দ্রুত নগরায়ণের ফলে সয়াবিনের চাহিদা বাড়ছে বলে মনে করছেন খাতসংশ্লিষ্টরা।
গবেষণায় আরো দেখা গেছে, দেশে আমদানি হয় ১৩ লাখ ৫০ হাজার টন পাম অয়েল এবং ৭ লাখ ৬০ হাজার টন সয়াবিন। এছাড়া বাংলাদেশে সয়াবীজ ক্রাশিং থেকে ৪ লাখ ৫ হাজার টন তেল বাজারে প্রবেশ করে। পাশাপাশি দেশে উৎপাদিত হয় ৮০ হাজার টন সরিষার তেল।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, আমদানীকৃত পাম অয়েল ও সয়াবিনের ওপর নির্ভরতা কমাতে সয়াবীজ ও সরিষাসহ রাইস ব্র্যান অয়েল, সূর্যমুখী তেলের উৎপাদন বাড়াতে হবে। এতে আমদানিনির্ভরতা যেমন কমবে, তেমনি স্থিতিশীল হবে নিত্যপণ্যের বাজার।
জানা গেছে, আর্জেন্টিনা থেকে বাংলাদেশে সয়াবিন পৌঁছতে শুধু জাহাজেই এক মাসেরও বেশি সময় লাগে। তারও আগে ঋণপত্র খোলা, আমদানির পর খালাস, পরিশোধন ও বাজারজাতে আরো অন্তত দুই সপ্তাহ সময় প্রয়োজন হয়। অন্যদিকে ইন্দোনেশিয়া থেকে আমদানি হওয়া পাম অয়েলের ক্ষেত্রে জাহাজে দুই সপ্তাহ ছাড়াও ভোক্তার কাছে পৌঁছতে সময় লাগে দুই সপ্তাহ। ফলে আপত্কালীন চাহিদা কিংবা আমদানিতে দীর্ঘসূত্রতায় বাজারে অস্থিরতার সুযোগ থাকে। সরিষাসহ বিকল্প কাঁচামালগুলো আমদানি কিংবা মজুদের সুযোগ থাকায় এ খাতের মাধ্যমেও দেশে ভোজ্যতেলের সংকট কিছুটা হলেও মেটানো সম্ভব। তাছাড়া শীর্ষ আমদানিকারক দেশের ওপর একক নির্ভরশীলতা কমিয়ে আমদানিতে বিকল্প উৎস তৈরি ও দেশে উৎপাদনের পরিকল্পনা ধারাবাহিকভাবে স্বস্তি আনতে সহায়তা তৈরি করবে বলে মনে করছেন খাতসংশ্লিষ্টরা।
বৈশ্বিক মূল্যবৃদ্ধিজনিত কারণে গত দুই বছরের মধ্যে দেশের বাজারে সর্বোচ্চে রয়েছে ভোজ্যতেলের দাম। আন্তর্জাতিক বুকিং বেড়ে যাওয়ায় আগামীতে ভোজ্যতেলের দাম আরো বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। দেশের অতি নিত্য ভোগ্যপণ্যের তালিকায় থাকা সয়াবিন ও পাম অয়েলের দাম নিয়ন্ত্রণে বিশ্ববাজারের স্থিতিশীলতার দিকেই তাকিয়ে রয়েছে সরকার ও বেসরকারি আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো।










