নভেল করোনাভাইরাসের সংক্রমণ মোকাবেলায় সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করাসহ নানাবিধ কার্যক্রম নিয়ে ব্যস্ত সময় পার করতে হচ্ছে পুলিশকে। এতে  আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় তৈরি হয়েছে ঢিলেঢালা ভাব। আর এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে বিভিন্ন উপায়ে রাজধানীসহ সারা দেশে মাদকের মজুদ বাড়াতে শুরু করেছে কারবারিরা। পাশাপাশি ঘটতে শুরু করেছে গৃহনির্যাতনের নানা ঘটনাও। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দ্রুত এ ধরনের অপরাধ নিয়ন্ত্রণে আনতে না পারলে পরবর্তী সময়ে এর ভয়াবহ প্রভাব সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে ঝুঁকিতে ফেলতে পারে।

বাংলাদেশে কভিড-১৯ রোগী প্রথম শনাক্ত হয় গত ৮ মার্চ। এরপর থেকে দেশে ফেরা প্রবাসীদের অবস্থান শনাক্তে কাজ শুরু করে পুলিশ। পাসপোর্টে দেয়া তথ্য অনুযায়ী প্রবাসীদের শনাক্তের পর তাদের হোম কোয়ারেন্টিন নিশ্চিত করার দায়িত্ব পড়ে মাঠ পর্যায়ের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের ওপর। পাশাপাশি রাজধানীসহ সারা দেশে সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করা ও জনসাধারণের মাঝে স্বাস্থ্যবিধিবিষয়ক সচেতনতা তৈরির কাজটিও দেয়া হয় পুলিশ সদস্যদের। এসব দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার নিয়মিত ডিউটিতে পড়েছে ভাটা।

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) হিসাবমতে, দেশে প্রথম কভিড-১৯ রোগী শনাক্ত হওয়ার পর গত ৮ মার্চ থেকে চলতি সপ্তাহ পর্যন্ত লক্ষাধিক ইয়াবা ট্যাবলেটসহ রাজধানী থেকেই গ্রেপ্তার করা হয় ১ হাজার ৩৭ মাদক কারবারিকে। গত মাসে রাজধানীর বিভিন্ন থানায় ধর্ষণের মামলা হয়েছে ৫৬টি। এছাড়া ডাকাতির ঘটনায় দুটি, বাসায় চুরির ঘটনায় ৫১টি, মোটরসাইকেল ও গাড়িসহ অন্যান্য চুরির ঘটনায় ১১৯টি, দ্রুত বিচার আইনে ১৪টি, প্রতারণার ঘটনায় ৬৭টি ও নারী নির্যাতনের অভিযোগে ১৩২টি মামলা হয়েছে।

গত সোমবার রাজধানীর অভিজাত এলাকা গুলশান-২-এর সিক্স সিজন হোটেলের সামনে এক মাদক কারবারির কাছ থেকে ২৪০ পিস ইয়াবা ট্যাবলেট উদ্ধার করে পুলিশ। এ ঘটনায় নায়েল আলী নামের ওই কারবারিকে গ্রেফতারও করা হয়। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে সে পুলিশকে জানায়, করোনাভাইরাস সংক্রমণের মধ্যে পুলিশের তল্লাশিতে কিছুটা শৈথিল্য এসেছে। এ সুযোগে সে উত্তরা ও টঙ্গী থেকে কৌশলে কয়েক দফায় বেশকিছু ইয়াবা গুলশানে মজুদ করেছে, যা পরবর্তী সময়ে উচ্চমূল্যে বিক্রির পরিকল্পনা ছিল তার।

এদিকে নভেল করোনাভাইরাস মহামারী রূপ ধারণ করায় পুলিশ সদস্যদের স্বাস্থ্য সুরক্ষার বিষয়টি প্রাধান্য দিয়ে চলাফেরা সীমিত রাখার নির্দেশনা দিয়েছেন ডিএমপি কমিশনার মোহা. শফিকুল ইসলাম। নির্দেশনায় তিনি বলেন, চলাচল সীমিত রাখুন। বিশেষ প্রয়োজন ছাড়া বাইরে যাওয়া, আড্ডা দেয়া বন্ধ রাখুন। দায়িত্ব পালনের সময় যথাসম্ভব মানুষের সংস্পর্শ এড়িয়ে চলবেন। তবে কোনোভাবেই আইন-শৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে বিঘ্ন সৃষ্টি করা যাবে না বলে ওই নির্দেশনায় উল্লেখ করেন ডিএমপি কমিশনার।

সম্প্রতি রাজধানীর কলেজ গেট এলাকায় বিল্লাহ ফার্মা নামে একটি ওষুধের দোকানে ডাকাতির ঘটনা ঘটে। রাত সাড়ে ১২টার পর একটি পিকআপ ভ্যানে করে এসে দুই মিনিটেরও কম সময়ের মধ্যে মুখে মাস্ক, মাথায় গামছা বাঁধা তিন দুর্বৃত্ত টাকা ও ল্যাপটপ লুট করে নিয়ে যায়। গত ৩১ মার্চ ভোরে কলাবাগানের সেন্ট্রাল রোডের একটি ফ্ল্যাটের গ্রিল কেটে চুরি হয় স্বর্ণালংকার, টাকা ও ল্যাপটপ।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, করোনাভাইরাস সংক্রমণ এড়াতে সাধারণ মানুষ যখন ঘরবন্দি, ঠিক সেই সময়ে ফাঁকা হয়ে যাওয়া সড়কে অপরাধীদের আনাগোনা বেড়েছে। এ সময়ে তারা ছিনতাই-ডাকাতির মতো ঘটনা ঘটাচ্ছে। পাশাপাশি অন্যান্য সময়ের তুলনায় সাধারণ ছুটির মধ্যে বেড়ে চলেছে গৃহনির্যাতনের ঘটনাও।

নভেল করোনাভাইরাস সংক্রমণের বর্তমান পরিস্থিতিতে চুরি, ছিনতাই ইত্যাদি অপরাধ বেড়ে যাওয়ার শঙ্কা আগেই প্রকাশ করেছিলেন পুলিশের সদ্যবিদায়ী মহাপরিদর্শক (আইজিপি) ড. মোহাম্মদ জাবেদ পাটোয়ারী। সম্প্রতি পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সে অনুষ্ঠিত এক ভিডিও কনফারেন্সে বিভিন্ন পুলিশ ইউনিটের কর্মকর্তাদের উদ্দেশে বক্তব্য প্রদানকালে তিনি এ শঙ্কা প্রকাশ করে সতর্ক থাকার নির্দেশনা দেন। তিনি বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে চুরি, ছিনতাইয়ের মতো অপরাধ বেড়ে যেতে পারে। পাশাপাশি ডমেস্টিক ভায়োলেন্সও বাড়তে পারে। কোনোভাবেই যেন এ ধরনের অপরাধ বাড়তে না পারে, সেজন্য নজরদারি বাড়াতে পুলিশ সদস্যদের নির্দেশ দেন তিনি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. জিয়া রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, অপরাধীরা যেকোনো বিপর্যয়েরই সুযোগ নেয়ার চেষ্টা করে। তবে কভিড-১৯ যেহেতু একটা হিউম্যান ক্রাইসিস, তাই আমরা ভেবেছিলাম এ সময়টায় অন্তত অপরাধীরা অপরাধকর্ম থেকে নিজেদের বিরত রাখবে। কিন্তু এ সংকট দীর্ঘায়িত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অপরাধও বাড়তে শুরু করেছে। নিম্ন আয়ের মানুষের ঘরে খাবার নেই। এই অবস্থায় চুরি, ছিনতাই ডাকাতির মতো ঘটনা ঘটবে। বিশেষ করে সরকারকে তৈরি পোশাক শিল্পের শ্রমিকদের বিষয়টা খুব যত্নের সঙ্গে দেখতে হবে। তারা যদি আর্থিক সংকটে পড়ে, সেক্ষেত্রে এ ধরনের অপরাধের মাত্রা আরো বেড়ে যেতে পারে। তাছাড়া দীর্ঘ ঘরবন্দি জীবনে গৃহনির্যাতনের মতো ঘটনাও বাড়বে। এগুলো দমনে কমিউনিটি পর্যায়ে সচেতনতা তৈরি করতে হবে। শুধু আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দিকে তাকিয়ে থাকলে চলবে না, এখানে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদেরও কার্যকর ভূমিকা রাখতে হবে।